অর্থনীতি

সরকারের তৎপরতায় খেলাপি ঋণ কমে আসছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
খেলাপি ঋণ নিয়ে নাজুক অবস্থানে রয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে দীর্ঘদিন যাবৎ। এ সংকট উত্তরণের জন্য নানা পরামর্শ ও দিকনির্দেশনাও আসছিলো বিভিন্ন তরফ থেকে। তবে আশার কথা হলো, সরকারের নানামুখী তৎপরতার কারণে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অনেকটা কমে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে সরকার অনেকটা নিরাপদে আছে এবং সরকারি ব্যাংক খাতে কোনো সমস্যা নেই বলেও মনে করেন তারা।
গত ২২ জুলাই রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক এবং বিশেষায়িত ৮ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
এ সংক্রান্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ডিসেম্বর ২০১৭ সালে সোনালী ব্যাংকে ঋণ খেলাপির হার ছিল ৪১.২৩%, ডিসেম্বর ২০১৮ সালে এ হার কমে হয় ৩০.৩৮% এবং মার্চ ২০১৯ সালে এ হার হয় ২৯.৩৫%। অগ্রণী ব্যাংকে ডিসেম্বর ২০১৭ সালে ঋণ খেলাপির হার ছিল ১৯.৩৩%, ডিসেম্বর ২০১৮ সালে এ হার হয় ২০.২৫% এবং মার্চ ২০১৯ সালে এ হার কমে হয় ১৬.৬৫%। রূপালী ব্যাংকে ডিসেম্বর ২০১৭ সালে ঋণ খেলাপির হার ছিল ২২.৯৪%, ডিসেম্বর ২০১৮ সালে এ হার কমে হয় ১৯.২১% এবং মার্চ ২০১৯ সালে এ হার কমে হয় ১৮.১৫%।
বিডিবিএল ব্যাংকে ডিসেম্বর ২০১৭ সালে ঋণ খেলাপির হার ছিল ৫৭.১৯%, ডিসেম্বর ২০১৮ সালে এ হার কমে হয় ৫৬.৫৪% এবং মার্চ ২০১৯ সালে এ হার কমে হয় ৫৬.৩৫%। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ডিসেম্বর ২০১৭ সালে ঋণ খেলাপির হার ছিল ২৩.৫৭%, ডিসেম্বর ২০১৮ সালে এ হার কমে হয় ১৮.৪৬% এবং মার্চ ২০১৯ সালে এ হার ১৮.৪৬% Ñ এসব পরিসংখ্যান থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের যথাযথ পদক্ষেপের কারণে খেলাপি ঋণ ধীরে ধীরে কমে আসছে।
এদিকে খেলাপি ঋণ আদায় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ১০০ কোটি টাকা ও এর বেশি অঙ্কের ঋণখেলাপিদের বিশেষ তদারকির আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করে তা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল এবং বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ, ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বৈঠক ডাকেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সব ব্যাংকই ঋণের সুদহার শতভাগ সিঙ্গেল ডিজিট কার্যকর করেছে। সরকারি ব্যাংক খাতে সমস্যা নেই। খেলাপি ঋণ কমে আসছে। ব্যাংকগুলোর সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ২০১৮ থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০১৯ সালে কমে এসেছে। তারা যে তথ্য দিয়েছেন তাতে দেখা যায়, আমাদের খেলাপি ঋণ আগের থেকে কমেছে। ডিসেম্বরের পর রাকাব ও বিকেবির কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি, কিন্তু উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা ব্যাংকিং খাতকে আরও জোরদার করতে যোগাযোগ অব্যাহত রাখব। যারা ঋণখেলাপির মাধ্যমে ত্রুটি-বিচ্যুতি তৈরি করেছে, তারা টাকা ফেরত দিতে চাইলে সহযোগিতা করা হবে। কিন্তু যারা টাকা দেশের বাইরে নিয়ে গেছে কিংবা নিজের বালিশের নিচে রেখে দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। ফার্মার্স ব্যাংকের মালিকের পরিবারের সদস্যরাও জেলে আছেন। আইন আইনের গতিতে চলে, সেভাবে চলবে।

খেলাপিদের ওপর তদারকি
খেলাপি ঋণ আদায় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ১০০ কোটি টাকা ও এর বেশি অঙ্কের ঋণখেলাপিদের বিশেষ তদারকির আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে গত ২২ জুলাই একটি সার্কুলার জারি করে তা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, প্রতিটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গঠন করতে হবে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল। এ সেল খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায় পরিস্থিতি প্রতি ৩ মাস অন্তর ব্যাংকের পর্ষদ ও বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাবে।
এ প্রক্রিয়ায় বিশেষ তদারকি হলে খেলাপি ঋণ আদায় বাড়বে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাদের মতে, বিশেষ তদারকির ফলে একদিকে খেলাপিরা চাপে পড়বে, অন্যদিকে ব্যাংকাররাও ঋণ আদায়ে বাড়তি চাপের মধ্যে থাকবেন।
খেলাপি ঋণ আদায়ে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে দীর্ঘদিন ধরেই। সরকার ও সংশ্লিষ্টদের কঠোর অবস্থানের পরও এ অনিশ্চয়তা কাটছে না। সম্প্রতি আদালতে পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ও অকার্যকর ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৮০ হাজার কোটি টাকা আদালতের নির্দেশের কারণে খেলাপির তালিকা থেকে বাইরে রাখা হয়েছে, যদিও ব্যাংকের দৃষ্টিতে এ টাকা খেলাপি।
এর বাইরে ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে প্রভিশন ঘাটতিতে পড়ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বস্তুত খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশন ঘাটতি বাড়বে – এটাই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে বাড়বে ঋণ অবলোপনের পরিমাণও। কাজেই খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা অত্যন্ত জরুরি।
বিগত সময়ে দেখা গেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ অবলোপন ইত্যাদির মাধ্যমে ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্ত থেকেছেন। কিন্তু এতে খেলাপি ঋণ সমস্যার স্থায়ী সমাধান আসেনি, বরং তা ঋণ আদায় প্রক্রিয়াকে আরও প্রলম্বিত করেছে।
প্রসঙ্গত, গত ২২ জুন বাংলাদেশের শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপির তালিকা সংসদে দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। একই সঙ্গে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানির কাছ থেকে ৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন, এমন ১৪ হাজার ৬১৭ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্যও দিয়েছেন তিনি।