প্রতিবেদন

স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় গণপিটুনি ও ছেলেধরা আতঙ্ক: জনসচেতনতা ও সতর্কতার তাগিদ

তারেক জোয়ারদার
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার এগারো বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্র আবির হুসাইনের মাথাবিহীন লাশ উদ্ধার করা হয় গত ২৪ জুলাই। উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের একটি আমবাগানে তার মাথাবিহীন দেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে জানায়। এর আগে মাদ্রাসা থেকে নিখোঁজ হয় আবির। তার মাথাবিহীন লাশ উদ্ধারের পর চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ছেলেধরা’ গুজব বাড়তে থাকে। আবিরের মাদ্রাসা থেকে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে বাড়ি নিয়ে যান অভিভাবকরা। পরে পুলিশ জানায়, সাম্প্রতিক সময়ের গুজবের সঙ্গে আবিরের মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার কোনো মিল নেই। প্রকৃত ঘটনা হলো, শিশু আবিরকে বলাৎকারের পর তা ধামাচাপা দিতেই গলা কেটে হত্যা করে কেটে ফেলা মাথা গুম করা হয়েছে। মূলত বলাৎকারের ঘটনা ধামাচাপা দিতে ‘ছেলেধরা’ বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করে ঘাতকরা।
নাটোরের বড়াইগ্রামের ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে কে বা কারা অপহরণ করে গলায় ক্ষুরের আঘাতে কিঞ্চিত জখম করে হাসপাতালের সামনে রেখে যায়। সিহাব নামের শিশুটি উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের রাজাপুর হাফিজিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে। আহত সিহাব জানায়, গত ২৩ জুলাই সন্ধ্যার দিকে মাদ্রাসার সামনে থেকে ৩ জন লোক সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশায় তাকে জোর করে থেকে তুলে নেয়। পরে বনপাড়ার কাছাকাছি এলে তার মুখ ও গলা চেপে ধরে দুর্বৃত্তরা গলায় ক্ষুর দিয়ে আঘাত করে। এ সময় তারা বলে, ‘তোকে মারলাম না। কিন্তু তোর গলা কাটা হয়েছে, এটা সবখানে বলে বেড়াবি। অন্যথায় সত্যি সত্যি তোর গলা কেটে নামিয়ে দেব, তোকে মেরে ফেলব।’ পরণে সিহাবকে দর্বৃত্তরা স্থানীয় পাটোয়ারী জেনারেল হাসপাতালের সামনে নামিয়ে দেয়। সিহাব এ সময় নিজের গলা চেপে ধরে একাই হাসপাতাল গেটে আসে।
ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে গত ২২ জুলাই একজনকে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনি দেয়া হয়। কিন্তু পুলিশ গিয়ে জানতে পারে যে বকেয়া ভাড়া নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে ভাড়াটিয়াকে গণপিটুনি দিয়েছে বাড়িওয়ালা। যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, এক ভাড়াটিয়া, যিনি কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন, তার বাসাভাড়া বকেয়া পড়ে যায়। পরে বাড়িওয়ালা ওই ভাড়াটিয়াকে ছেলেধরা বলে গণপিটুনি দেয়। তিনি জানান, ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার করে ওই ভাড়াটিয়াকে। এ ঘটনায় ভাড়াটিয়া মামলা করলে গ্রেপ্তার করা হয় বাড়িওয়ালাকে।
শুধু চুয়াডাঙ্গা, নাটোর বা ঢাকার ঘটনা নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ছেলেধরা’ গুজবের পেছনে এমন নানা কারণ খুঁজে পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জানা যাচ্ছে, ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে যে ক’টা গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে, এর প্রায় সবগুলোই ঘটেছে সন্দেহ, গুজব অথবা স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ও মহলের যোগসাজশে।
গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে ছেলেধরা অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন দু’জন, যারা সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। শ্রীপুর থানার ওসি লিয়াকত আলী জানান, পুলিশ খবর পায় যে নয়নপুর বাজার এলাকায় গণপিটুনি দেয়া হয়েছে দু’জনকে। ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়। পরে পুলিশ জানতে পারে যে, স্বামীর একাধিক বিয়ে নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে বাক-বিত-ায় জড়ায় ওই স্বামী-স্ত্রী। একপর্যায়ে তারা একে অপরকে ছেলেধরা বলে চিৎকার করতে শুরু করলে স্থানীয় লোকজন তাদের গণপিটুনি দেয়।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে গণপিটুনির শিকার হন কয়েকজন ছাগল ব্যবসায়ী। তাদের অভিযোগ, আগে যাননি এমন একটি গ্রামে গিয়ে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তারা। ওই সময় ছিনতাইকারীরা তাদেরকে ছেলেধরা বলে মারধর শুরু করে এবং পরে কৌশলে পালিয়ে যায়।
বাঁশখালী থানার ওসি রেজাউল করিম জানান, স্থানীয় লোকজনের কাছে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিন ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করেন তিনি।
এদিকে পদ্মাসেতুতে ‘বাচ্চা ছেলেমেয়ের মাথা লাগবে’ সাম্প্রতিক এই গুজবে আতঙ্কিত দেশের মানুষ। বিশেষত ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে অভিভাবকরা বেশ দুশ্চিন্তায়। গ্রামের স্কুলগুলোতে শিশুদের উপস্থিতি কমে গেছে বলে খবর এসেছে। আবার ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির আতঙ্কও সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। পথেঘাটে সব জায়গায় একই আলোচনা ছেলেধরা এবং গণপিটুনির আতঙ্ক। ২৩ জুলাই পর্যন্ত সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের ১৭ জেলায় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ৭ জন। এদের মধ্যে নারী ও প্রতিবন্ধী রয়েছেন, এমনকি ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে এক মাকে তারই শিশু সন্তানের সামনে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
গণপিটুনিতে আহত হয়েছেন অনেক মানুষ। এ পর্যন্ত থানায় এ সংক্রান্ত ৯টি মামলা হয়েছে। গুজব ছড়িয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১৮০ জন। রাজধানীর বাড্ডায় নারীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত যুবককে আটক করা হয়েছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এক্ষেত্রে সদাতৎপর রয়েছে। তারপরও এ নিয়ে সাধারণ মানুষ বেশ উদ্বিগ্ন।
জানা গেছে, গত ৯ জুলাই থেকে পদ্মাসেতুতে মাথা লাগার গুজবটি ছড়িয়ে পড়ে। গুজব রোধ ও গণপিটুনি ঠেকাতে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। তবুও আতঙ্ক পুরোপুরি কাটছে না। স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের একা ছাড়তে চাচ্ছে না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু কিছু ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সক্ষম হওয়ায় জনমনে কিছুটা হলেও আস্থা ফিরতে শুরু করেছে, কাটছে ভয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্কুলচত্বর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টিরও আহ্বান জানানো হয়েছে। এমনকি দেশের বিভিন্ন থানা পুলিশের উদ্যোগে গুজব ঠেকাতে মাইকিং করা হচ্ছে। স্কুলে স্কুলে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ছেলেধরা গুজবের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে একটি বিবৃতি দেয়া হয়। এ ধরনের গুজবের ঘটনায় সন্দেহভাজন কাউকে ধরে পুলিশের হাতে না দিয়ে পিটিয়ে হতাহত করা আইনের দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ উল্লেখ করে বিবৃতিতে এ ব্যাপারে সবাইকে সাবধান থাকার পরামর্শ দেয়া হয়।
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে বিষয়টি নিয়ে বৈঠক হয় এবং বৈঠক থেকে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পাড়া, মহল্লাগুলোতে মাইকিং করে এবং গণপিটুনির ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশ দেয়া হয়। কাউকে সন্দেহ হলে আইন যেন কেউ নিজের হাতে তুলে না নেয় সেজন্য পুলিশ ৯৯৯ নাম্বারে সহযোগিতার জন্য পরামর্শ দিয়ে প্রচার চালায়।
শিা মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে বলেন, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শিা অফিস থেকে তাদের কাছে তথ্য এসেছে, গ্রাম ও শহরের স্কুলগুলোতে উপস্থিতির হার কমছে। আর অভিভাবকরা প্রায়ই এসে ছেলেধরা গুজবের কথা বলছেন। বেশিরভাগ স্কুলের সামনে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো গণপিটুনি বা ছেলেধরা সন্দেহে বাগবিত-া চলছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে শিা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দেশের সব শিাপ্রতিষ্ঠানে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। সব উপজেলা শিা কর্মকর্তাকে স্কুল পরিদর্শন করে সচেতন করতে বলা হয়েছে। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিা অধিদপ্তর।
একটি মহল সারাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল স্বদেশ খবরকে বলেন, কারা এ ছেলেধরার গুজব ছড়াল এবং গণপিটুনির মতো বিষয়ে উসকানি দিচ্ছে তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাড়া-মহল্লায় সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, পদ্মাসেতুর মতো বড় কাজ এবং দেশের উন্নয়ন যারা চায় না তারাই এ ধরনের ঘটনায় উসকানি দিচ্ছে। ইতোমধ্যে গণপিটুনির ঘটনায় বিভিন্ন স্থানে মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। ইন্ধনদাতাদেরও খুঁজে বের করা হবে।

‘ছেলেধরা’ গুজব রোধে
স্কুলে-স্কুলে সতর্কতা জারি
দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ছেলেধরা’ গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনিতে হতাহতের প্রোপটে এ ধরনের ঘটনা বন্ধে এবার দেশের সব মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিা অধিদপ্তর।
গত ২৩ জুলাই মাউশির দেয়া এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ছেলেধরা বিষয়ক গুজবে দেশের বিভিন্ন স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও নিরীহ লোকজনকে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এ ধরনের ঘটনা রোধে সতর্ক থাকতে হবে। নির্দেশনায় বলা হয়, ‘সতর্ক করা যাচ্ছে যে, কোনো অবস্থাতেই শিার্থীদের কেন্দ্র করে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, তার জন্য সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষক-শিার্থীদেরও এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। ছেলেধরা গুজবে শিাপ্রতিষ্ঠানে যাতে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা না ঘটে সে জন্যই এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এই গুজবকে কাজে লাগিয়ে কেউ যাতে অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো শিার্থীকে ব্যবহার করতে না পারে। এরই অংশ হিসেবে শিাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের ওই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’

গুজব ঠেকাতে মাঠে নেমেছেন
আনসারের ৬১ লাখ সদস্য
‘পদ্মাসেতু নির্মাণে মাথা লাগবে’ বলে যে ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে তা প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের ৬১ লাখ আনসার সদস্যকে কাজে লাগানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদ। গত ২৩ জুলাই রাজধানীর খিলগাঁওয়ে বাহিনীর সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ তথ্য জানান।
আনসার ও ভিডিপি প্রধান বলেন, পদ্মাসেতু নির্মাণে মাথা লাগবে বলে যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে তা একটি কুসংস্কার। এই মিথ্যা প্রচার প্রতিরোধে কাজ করছে আনসার ও ভিডিপি। এজন্য মাঠপর্যায়ে থাকা এ বাহিনীর ৬১ লাখ সদস্য জনগণকে সচেতন করার কাজ করছেন।
মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদ বলেন, গুজবে কান না দেয়ার জন্য গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আনসার লিডার যারা আছেন তাদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে বার্তা পাঠানো হয়েছে। এই বার্তা পেয়ে পদ্মাসেতু নিয়ে গুজবে কান না দিতে জনসাধারণকে সচেতন করবেন ৬১ লাখ আনসার সদস্য।

অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই
গুজব ছড়ানো হচ্ছে: আইজিপি
‘পদ্মাসেতুতে মাথা লাগা বা ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যার পেছনে সরকারবিরোধী একটি স্বার্থান্বেষী মহল জড়িত। তারা পরিকল্পিতভাবে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে। এর সঙ্গে যারাই জড়িত তারা কেউ রেহাই পাবে না। তাদের যেকোনো মূল্যে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। ২৪ জুলাই পর্যন্ত গুজবের বলি হওয়া ৮ জনই নিরপরাধ। দেশ-বিদেশ থেকে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। দুবাই থেকে গুজব ছড়ানোর একটি পোস্ট দেয়ার তথ্য মিলেছে।’
বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী এসব কথা বলেছেন।
গত ২৪ জুলাই নিজ কার্যালয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি বলেন, গুজব সংক্রান্ত যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে জাতীয় জরুরি সেবা ট্রিপল নাইনে (৯৯৯) ফোন করলেই সেখানে পুলিশ পৌঁছে যাবে।
সারাদেশে গুজব সংক্রান্ত ৩১টি মামলায় ১০৩ জনকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, গ্রেপ্তারদের অনেকেই সরকারবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
আইজিপি বলেন, গত ১৮ জুলাই নেত্রকোনায় এক শিশুহত্যার ঘটনা সারাদেশে তুমুল হইচই ফেলে। পরবর্তীতে দেখা গেছে, ঘাতক রবিন মাদকাসক্ত। শিশুটিকে প্রথমে রবিন বলাৎকার করে। বলাৎকারের সময় চিৎকার-চেঁচামেচি করায় রবিন তাকে হত্যা করে। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে দুইবার তাকে মাদকসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল। মাদকাসক্ত হওয়ার করণে একবার সে তার স্ত্রীর গলা কাটার চেষ্টা করেছিল। এরপর তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায়। ঘটনাটিতে তাকে নিছক ছেলেধরা সাজিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বাড্ডাসহ প্রতিটি ঘটনাই ছিল নিছক গুজব। বাড্ডায় গুজব ছড়িয়ে এক নারীকে ছেলেধরা সাজিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। যাত্রাবাড়ীতে বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভাড়াটিয়ার ভাড়া নিয়ে ঝামেলা হওয়ার সূত্র ধরে ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে ভাড়াটিয়াকে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। একইভাবে কেরানীগঞ্জ, সাভার, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করা হয়েছে। তাতে ছেলেধরা সংক্রান্ত কোনো বিষয় ছিল না।
জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতেই পরিকল্পিতভাবে গুজবকে বেছে নিয়েছে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। অতীতে সরকারবিরোধী অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম ব্যর্থ হওয়ার পর গোষ্ঠীটি গুজবকেই দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে। কারণ ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে গুজব ছড়ানো সহজ। আর তাতে কাজও হয়। অতীতে যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাওয়ার গুজবও ছড়ানো হয়েছিল। তখনও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীটি। গুজব সংক্রান্ত একটি পোস্ট দুবাই থেকে আসার তথ্য মিলেছে। দুবাইতে তার সন্ধান চলছে। তাকে পেলে যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্যে দায়েরকৃত মামলায় আসামি দেখিয়ে দেশে আনা হবে। বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ইতোমধ্যেই ৬০টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ২৫টি ইউটিউটব অ্যাকাউন্ট ও ১০টি অনলাইন পোর্টাল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

শেষ কথা
অনেক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিশ্লেষক বলছেন, সমাজ বা রাষ্ট্রে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে সরকারবিরোধী স্বার্থান্বেষী মহল ছেলেধরা আতঙ্ক ও গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনিতে মানুষ হত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটাচ্ছে। সরকারকে অজনপ্রিয় করতে এবং বেকায়দায় ফেলার জন্য সরকারবিরোধীদের প্ররোচনায় এসব ঘটনার সূত্রপাত। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যসূত্রেও এসব ঘটনার আভাস পাওয়া যায়।
সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সূত্র বলছে, গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে যাত্রীবাহী জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মীম ও বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আব্দুল করিম রাজিব নিহত হয়। আহত হয় অন্তত ১৫ শিার্থী। এমন ঘটনার পর আন্দোলনে নামায় চার ছাত্রকে নৃশংসভাবে হত্যার পর লাশ ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে রাখা হয়েছে বলে গুজব ছড়ানো হয়। তারই জেরে সারাদেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থীরা রাস্তায় নেমে বিােভ করে টানা ৮ দিন দেশ একপ্রকার অচল করে রেখেছিল। গুজব ছড়ানোর পর বিভিন্ন জায়গায় শিার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়া, পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এছাড়া কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ছাত্র নিহতের গুজবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবন পুরো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে এসব ঘটনাকে সরকারবিরোধী কর্মকা-ের আলামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এক্ষেত্রে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরো সতর্ক ও কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।