প্রতিবেদন

ঈদকেন্দ্রিক সক্রিয় জাল নোটের কারবারিরা : প্রতিরোধে তৎপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

বিশেষ প্রতিবেদক
ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর হাটকে টার্গেট করে প্রতি বছরের মতো এবারও সক্রিয় হচ্ছে জাল নোট কারবারি চক্র। এসব চক্র তৈরি করছে বিভিন্ন মানের জাল নোট। ওরা বিদেশি টাকাও তৈরি করছে। ঈদ উপলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন টাকার পাশাপাশি এসব জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দেয়ার পাঁয়তারা করছে তারা। গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে এই চক্রগুলোকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আর পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তকরণে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, কোরবানির পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ স্থাপন করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া দেশের অনুমোদিত কোরবানির পশুর হাটগুলোতে জাল টাকা বা জাল নোট চক্রের অপতৎপরতা রোধ করার জন্য ঢাকাসহ সব এলাকায় অবস্থিত তফসিলি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেশকিছু পদপে নিতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ৩০ জুলাই এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাছে পাঠানো হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, নতুন-পুরাতন মিলিয়ে জাল নোট চক্রের সঙ্গে সারাদেশে শতাধিক চক্র জড়িত রয়েছে। শুধু ঢাকাতেই ২০ থেকে ২৫টি চক্র রয়েছে। এদের অনেকেই বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল। জামিনে বের হয়ে তারা একই কাজে লিপ্ত হয়েছে। গত ১ আগস্ট ভারতীয় রূপি জালকারী একটি চক্র ধরা পড়েছে।
সূত্র বলছে, বাজারে জাল নোটের ছড়িয়ে পড়া রুখতে পশুর হাটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর আছে। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার উত্তর বিভাগের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার টিম এরকম একটি চক্রের কয়েকজনকে আটক করেছে। চক্রটি ঢাকার রামপুরায় পলাশবাগ মোড়ের একটি ফ্যাটে বসে জাল রুপি তৈরি করে আসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশের ওই টিম ৫০০ ও ১০০০ হাজারে মোট ২১ লাখ রুপি, জাল রুপি তৈরির কাজে ১টি প্রিন্টার, ১টি ল্যাপটপ, ১টি লেমিনেটিং মেশিন, রুপি তৈরির কাগজ, প্রিন্টারে ব্যবহৃত কালি, সিকিউরিটি সিলসংবলিত স্ক্রিন বোর্ড, গাম ও ফয়েল পেপার উদ্ধার করে। এই চক্রটি জাল নোট তৈরি করে ভারতে পাচার করার পাশাপাশি জাল রুপি চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোরসহ সীমান্তবর্তী অন্য এলাকার ব্যবসায়ীদের সরবরাহ করত।
একইভাবে গত ঈদের সময় ঢাকার কামরাঙ্গীচর ও চকবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৫ লাখ ৬৮ হাজার জাল টাকা ও তৈরির সরঞ্জামসহ একটি চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ। আটকের পর চক্রের সদস্য সবুজ, জামাল ও বাবু গোয়েন্দাদের জানিয়েছিল ঈদকে ঘিরেই তারা জাল নোট তৈরি করে। এসব জাল নোট খালি চোখে এবং ভালোভাবে না দেখলে জাল বলে চেনার কোনো উপায় নেই। আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, জাল নোট চক্রের তৎপরতা কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে পদপে নেয়া। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, জাল টাকা প্রতিরোধে আইন সংশোধনের চেষ্টা চলছে।
জাল নোট তৈরি রুখতে পৃথক আইন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১১ সালে। এর মধ্যে ৩ দফায় খসড়া করা হয়েছে। সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ- থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়েছে। কিন্তু ৮ বছরেও চূড়ান্ত হয়নি আইনটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় জাল নোটের কারবারিরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। বিশেষ মতা আইন ও দ-বিধি অনুযায়ী জাল নোট চক্রের বিচার করা হয়। কিন্তু এই আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে তারা খুব সহজেই ছাড়া পেয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রতিটি পশুর হাটে (উপজেলা পযন্ত) জাল নোট ধরতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। ব্যাংক কর্মকর্তারা পশু ব্যবসায়ীদের নোট যাচাই সংক্রান্ত সেবা দেবেন। কোরবানির হাট শুরুর দিন থেকে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে পশু ব্যবসায়ীদের বিনা খরচে নোট যাচাই সংক্রান্ত এই সেবা দিতে হবে। ৬ আগস্টের মধ্যে হাটের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নাম, পদবি, মোবাইল ফোন নম্বরসহ প্রতিটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকারী একজন উপযুক্ত কর্মকর্তার নাম, পদবি ও মোবাইল ফোন নম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা হাটে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের কার্যক্রম মনিটর (পরিবীণ) করবেন। এছাড়া ঢাকার বাইরে যেসব জেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিস রয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার অনুমোদিত পশুর হাটগুলোতে স্থানীয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে একই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যাংকগুলোর আঞ্চলিক কার্যালয় বা প্রধান শাখাগুলোকেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিস নেই এমন জেলাগুলোয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও থানা বা উপজেলার অনুমোদিত পশুর হাটে বিভিন্ন ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত দায়িত্ব বণ্টনের জন্য সোনালী ব্যাংকের চেস্ট (কোষাগার) শাখাগুলোকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ স্থাপনের জন্য সিটি করপোরেশন, জেলা মিউনিসিপ্যালিটি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভা কর্তৃপরে সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। এছাড়া সার্বিক নিরাপত্তার জন্য পুলিশ, র‌্যাব ও আনসারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে।
বুথে যাচাইয়ে কোনো জাল নোট ধরা পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে প্রজ্ঞাপনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ব্যাংকের নাম ও তার সঙ্গে ‘জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ’ উল্লেখপূর্বক ব্যানার ও নোটিশ প্রদর্শন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিসংবলিত ১০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসংবলিত পোস্টারটি প্রদর্শন করতে হবে। আসল ব্যাংক নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সংবলিত ভিডিও চিত্র ব্যাংকের শাখায় ঈদের আগে ৫ কর্মদিবসে গ্রাহকদের জন্য স্থাপিত টিভি মনিটরগুলোতে পুরো ব্যাংকিং সময়ে প্রদর্শন করতে হবে।

২৬ লাখ ভারতীয় জাল রুপিসহ
তিনজন গ্রেপ্তার
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা উত্তর বিভাগের একটি দল বিশেষ অভিযান চালিয়ে ভারতীয় জাল রুপি, জাল রুপি তৈরির সরঞ্জাম জব্দ এবং চক্রের হোতাসহ তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ১ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকার একটি ভবন থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলো লিয়াকত ওরফে জাকির, শান্তা আক্তার ও মমতাজ বেগম। এ সময় তাদের কাছ থেকে ভারতীয় ২০০০ রুপির নোটের ২৬ লাখ জাল রুপি এবং জাল রুপি তৈরির কাজে ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ, একটি কালার প্রিন্টার, একটি লেমিনেটিং মেশিন, জাল রুপি তৈরির কাগজ, প্রিন্টারে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কালির কার্টিজ, সিকিউরিটি সিলসংবলিত স্ক্রিনবোর্ড, গাম ও জাল রুপি বানানোর জন্য সিল মারা ফয়েল পেপার উদ্ধার করা হয়।
ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কোরবানির ঈদে পোশাক ও গরু আমদানির কাজে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে জাল রুপি পাচার করে। চক্রটির হোতা লিয়াকত ওরফে জাকির। সে বিভিন্ন স্থান থেকে জাল রুপি তৈরির কাঁচামাল এবং জাল রুপি সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করত। শান্তা আক্তার ও মমতাজ বেগম জাল রুপি তৈরির দ কারিগর। প্রায় ১০ বছর ধরে নোট জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত চক্রটি।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, প্রথম দিকে চক্রটি বাংলাদেশি নোট জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সম্প্রতি ভারতীয় রুপি জালিয়াতিতে যুক্ত হয়। তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় জাল নোটসংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ভোগ করে জামিনে বের হয়ে তারা আবার নোট জালিয়াতির কাজে লিপ্ত হয়।