রাজনীতি

কাদের-রওশন দ্বন্দ্বে অনিশ্চিত গন্তব্যে জাপা!

বিশেষ প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) ভবিষ্যৎ নিয়ে ফের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অবর্তমানে দলটিতে সৃষ্টি হয়েছে নানামুখী সংকট। দলের মূল নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে এবং সংসদে বিরোধী দলের নেতা কে হবেন এ নিয়ে আছে মতানৈক্য। এরশাদের মৃত্যুর পর পার্টির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তিসহ নানা সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে। এ প্রোপটে জাপায় ফের ভাঙনের সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা অনেকের।
এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর পর জাপার পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে এরশাদের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে ‘ভারমুক্ত’ করা হয়েছে। অর্থাৎ জি এম কাদের এখন জাপার চেয়ারম্যান। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত মেনে নেননি এরশাদের স্ত্রী, পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ। দলটির রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত নেতারাও জি এম কাদেরকে মেনে নেননি। তারা বলছেন, জি এম কাদের এখনো ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যান হতে হলে তাঁকে দলীয় কাউন্সিলে অনুমোদন নিতে হবে।
গত ২২ জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো জাতীয় সংসদের উপনেতার প্যাডে রওশন এরশাদ স্বারিত বিবৃতিতেও জি এম কাদেরকে তারা চেয়ারম্যান মানেন না বলে উল্লেখ করেন।
সংসদে বিরোধী দলের নেতা কে হবেন এ নিয়েও আছে ব্যাপক মতানৈক্য। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এরশাদ নিজেই ছিলেন একাদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। জাতীয় পার্টিতে (জাপা) এখন বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে শীর্ষ নেতাদের দ্বিধাবিভক্তি। দলের একটি অংশ রয়েছে রওশনের সঙ্গে, অপর অংশ জি এম কাদেরের সঙ্গে। দল পরিচালনার কর্তৃত্বসহ বিরোধীদলীয় নেতার আসন দখল নিয়ে এই বিভক্তি কাজ করছে।
জাপা নেতাকর্মীরা বলছেন, এরশাদের ইচ্ছা অনুযায়ী দল পরিচালনা হলে সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। কিন্তু রওশন এরশাদ চেয়ারম্যান হতে চান। বিরোধী দলের নেতার পদও চান তিনি। জিএম কাদেরকে কোনো অবস্থাতেই ছাড় দিতে সম্মত নন তিনি।
দলের একটি সূত্র বলছে, জি এম কাদের যেকোনো মূল্যে পার্টির একতা রক্ষায় বদ্ধপরিকর। তিনি মনে করছেন, রাজনৈতিক ল্য পূরণ করাও কঠিন কোনো বিষয় নয়। তিনি চাচ্ছেন জাতীয় পার্টি আগামী দিনে আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। প্রকৃত অর্থে বিরোধী দলের শক্তি নিয়ে রাজনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
এদিকে রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত সূত্রগুলো দাবি করছে, এরশাদের মৃত্যুর পর চেয়ারম্যান পদ পাওয়া নিয়ে বেঁকে বসলেও দলের স্বার্থে এখন অনেকটাই নমনীয় হওয়ার চেষ্টা করছেন রওশন। জাতীয় পার্টি ভাঙনের মুখে পড়–ক তা চান না তিনি।
জাপার একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও দলীয় সংসদ সদস্য স্বদেশ খবরকে জানান, জি এম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের েেত্র রওশনের পরামর্শ নিতে হবে।
এ বিষয়ে বিরোধীদলের উপনেতার ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম এমপি বলেন, আমরা রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরসহ সবাইকে নিয়ে এগোতে চাই। ম্যাডামের (রওশন) এ বয়সে চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। উনি চান সম্মান। জিএম কাদের তাঁর সঙ্গে পরামর্শক্রমে দল পরিচালনা করবেন – এটাই সবার প্রত্যাশা।
জাপার আরেকটি সূত্র বলছে, পার্টিতে ঐক্য বজার রাখার স্বার্থে জি এম কাদের ও রওশন এরশাদ দুজনই নমনীয় থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বিভক্তি থাকায় তাদের চাপে কখনো কখনো ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ‘জিএম কাদের পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নন’ মর্মে গত ২২ জুলাই গভীর রাতে রওশন এরশাদসহ পার্টির ১০ জন প্রেসিডিয়াম ও এমপির নামে একটি হাতে লেখা বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পায়। সেই বিবৃতিও দেয়ার পে ছিলেন না রওশন এরশাদ।
রওশনপন্থি একজন নেতা স্বদেশ খবরকে বলেন, গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিটি মূলত জি এম কাদেরকে চাপে রাখতে। এরপর আমরা জি এম কাদেরকে ৪টি শর্ত দিয়েছি। শর্তগুলো শুধু আমাদের নয়, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বেশিরভাগ নেতাকর্মীরই।
ওই নেতা বলেন, আমরাও জানি বাস্তবতা হলো জি এম কাদের বাদে এই মুহূর্তে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হওয়ার বা নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্য কেউ নেই। তবে তাকে সমন্বয় করে চলতে হবে। আর এ সমন্বয়ের উদ্যোগ যাতে তিনি নেন, এ জন্যই বিবৃতি আর ৪টি শর্ত।
জানা গেছে, জি এম কাদেরকে রওশনপন্থি নেতাদের দেয়া ৪টি শর্তের মধ্যে রয়েছে, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হবেন রওশন এরশাদ। জাতীয় সংসদের উপনেতা, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব বানাতে হবে এরশাদ পরিবার ও রংপুর বৃত্তের বাইরে থেকে। ওই ৪ শর্ত পূরণ হলে জি এম কাদেরকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে মেনে নেয়া হবে।
তবে জাতীয় পার্টির একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেছেন, রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টি ভাঙতে চান না। জাতীয় পার্টি আঞ্চলিক দল হিসেবে পরিচিতি লাভ করুক বা একটি পরিবারের গ-িতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়–ক, আমরা তা চাই না। বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশই বলছে আগামী দিনে জাতীয় পার্টির সম্ভাবনা আছে। জাতীয় পার্টিকে একটি শক্তিশালী দল হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা শর্তগুলো দিয়েছি। নানা মাধ্যমে শর্তের কথা জি এম কাদেরের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, রওশনপন্থিদের ৪ শর্তের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো জাতীয় পার্টির মহাসচিব পদটিতে এরশাদ পরিবার এবং রংপুরের বাইরের কাউকে বসাতে হবে। সে েেত্র মহাসচিব পদটি পেতে আগ্রহী সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। তবে এ দৌড়ে শক্ত অবস্থানে আছেন কাজী ফিরোজ রশীদও। আর এসব পদে রদবদল হোক বা না হোক, জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান পদে জি এম কাদেরকেই সঠিক মনে করছেন পার্টির অধিকাংশ নেতাকর্মী।
অবশ্য খোদ জি এম কাদেরও বলছেন, জাতীয় পার্টির সবাই গুরুত্বপূর্ণ, পার্টিতে সবাইকে প্রয়োজন। গঠনতন্ত্র অনুসারে দল চলবে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে। রওশন এরশাদের সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ হতে পারে না, ভাবী আমাকে ছোটবেলা থেকে সন্তানের মতো লালন-পালন করেছেন। উনি আমার মাথার ওপর ছায়া, তাঁর দিকনির্দেশনা অনুসারে জাতীয় পার্টি চলবে।