রাজনীতি

খালেদা জিয়ার মুক্তিতে অনিশ্চয়তা: হতাশ বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী

বিশেষ প্রতিবেদক
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন ১৮ মাস। দুর্নীতি মামলায় আদালতের রায়ে সাজা মাথায় নিয়ে কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তার মুক্তির দাবিতে রাজপথের আন্দোলন থেকে শুরু করে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি। সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জামিন বা প্যারোলে মুক্তির চেষ্টাও হয়েছে অনেকবার; কিন্তু মুক্তি মেলেনি খালেদার।
চেয়ারপারসনের মুক্তি চেষ্টার অংশ হিসেবে গেল বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন দলীয় সরকারের অধীনে অংশ নেয় বিএনপি। কিন্তু নির্বাচনে বিএনপি ও এর জোটসঙ্গীদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। এরপর নানা নাটকীয়তা শেষে বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলে খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে ওঠে দলটির নেতাকর্মীরা। মনে করা হচ্ছিল, খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে গোপন সমঝোতার পরই বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। কিন্তু মুক্তি পাননি খালেদা জিয়া। এরপর মনে করা হয়েছিলো খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে আদালতে সরকার পক্ষ বিরোধিতা করবে না এবং আইনি প্রক্রিয়াতেই খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে। কিন্তু না, সে আশায়ও গুড়েবালি বিএনপি নেতাকর্মীদের। সর্বশেষ ৩১ জুলাই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে জামিন দেয়নি হাইকোর্ট। এই মামলায় অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তার জামিন আবেদন সরাসরি খারিজ করে দেয়া হয়। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এসএম কুদ্দুস জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
দেড় বছরেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করতে না পারায় জ্যেষ্ঠ নেতাদের ওপর তীব্র ােভ প্রকাশ করছেন দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা। দলীয় চেয়ারপারসনের জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর তারা অনলাইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ‘কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে’ তীব্র ােভ প্রকাশ করেন।
জাকির হোসেন নামে মহানগর বিএনপির এক নেতা তার ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে ােভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘জামিন দিলো না। ঘুমাও বিএনপি নেতারা। মনে রেখো, মায়ের মুক্তি না হলে তোমাদেরও মুক্তি নাই। লড়াই ছাড়া মুক্তি নাই।’ বশিরুল আলম টিটো নামে একজন ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘বারবার পরাজিত কমান্ডার দিয়া যুদ্ধের নির্দেশনা দিলে পরাজয় ছাড়া আর কী আশা করা যায়? আসেন আমরা তৃণমূলের কর্মীরা ম্যাডামের জন্য স্বেচ্ছায় কারাবরণ কর্মসূচি দেই অথবা জেলখানা অভিমুখে বিােভ মিছিলের কর্মসূচি।’
তাঁতী দলের সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু তার ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে ােভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘জেলে যেতে রাজি নাই, মামলা খেতে রাজি নাই, রাজপথে লড়তে নাই, দুদক থেকে বাঁচতে চাই-দলে বড় পদ চাই? মায়ের মুক্তির দরকার নাই!’
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিনের শুনানির দিন (৩১ জুলাই) সকাল থেকেই কে বা কারা ফেইসবুকে গুজব ছড়ায়, বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন হয়েছে। অথচ বিকেলে দেখা যায়, তার জামিন নামঞ্জুর করেছে আদালত। ফেইসবুকে গুজব ছড়ানোর জন্য এর সঙ্গে জড়িতদের ‘গালমন্দ করে’ স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোটের শরিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম। তিনি তার ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসীদের উদ্দেশে অধমের আকুল নিবেদন। বন্ধুরা, এ সময়ে যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে ফেইসবুক এক বিশাল ভূমিকায় অবতীর্ণ। সুতরাং আমাদের এ মাধ্যম ব্যবহারে অধিকতর সাবধান ও নিশ্চিত হতে হবে। গতকাল ও আজ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে আমরা কী বোঝাতে চাইলাম। যেখানে ৪৮ ঘণ্টায় জামিন হওয়ার কথা সেখানে আজ ১৮ মাস নেত্রী কারাগারে। ধরে নিলাম এখন জামিন হলো, তাহলেও ধিক্কার দিতে হবে, থুতু মারতে হবে। আলহামদুলিল্লাহ বলার কোনো অবকাশ নাই।’ ভিপি শহীদ নামে বিএনপির এক কর্মী ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘৭০ প্লাস বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা কোথায়?’
তৃণমূল নেতাদের এমন ােভের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্বদেশ খবরকে বলেন, তৃণমূল নেতাদের মতো আমরাও হতাশ ও ক্ষুব্ধ। আমাদেরও মন খারাপ। আমাদের সবার প্রত্যাশা ছিল, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জামিন পাবেন। আদালত জামিন নামঞ্জুর করায় আমরাও কষ্ট পেয়েছি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলসহ দলের অনেক নেতা হাইকোর্টে গিয়েছিলেন শুনানিতে। জামিন নামঞ্জুর হওয়ায় তারাও মন খারাপ করে চলে এসেছেন।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মির্জা ফখরুল বলেন, এ অবস্থায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরতে হবে। ােভ প্রকাশ না করে দলের কর্মসূচি দেয়া হলে তাতে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নিতে হবে। তাহলেই কেবল চেয়ারপারসনকে মুক্ত করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ৮ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা দায়ের করে দুদক। মতার অপব্যবহার করে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে। এই মামলায় খালেদা জিয়াসহ চার আসামিকে ৭ বছর করে সশ্রম কারাদ- দেয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন খালেদা জিয়া। ওই আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে হাইকোর্ট। পাশাপাশি নিম্ন আদালতের নথি আসাসাপেে জামিন আবেদনের শুনানি গ্রহণ করা হবে বলে জানায় আদালত। জুন মাসে নথি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ থেকে হাইকোর্টে আসে। এরপরই খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জামিন আবেদন শুনানির জন্য আদালতে আবেদন করেন। ওই আবেদনের প্রেেিত গত ৩০ ও ৩১ জুলাই জামিন আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে হাইকোর্ট জামিন আবেদন খারিজ করে দেয়।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, খালেদা জিয়াকে তার সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বয়স ও অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনার পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন হিসেবে তাঁর জামিন পাওয়ার কথা ছিল।