প্রতিবেদন

গরু থেকে কসাই, সব সেবাই অনলাইনে: প্রতারণা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি জরুরি

বিশেষ প্রতিবেদক
দেশে ইন্টারনেটের গতি ও পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় হচ্ছে ই-কমার্স। ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষ ঘরে বসেই পেয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অনলাইনে কেনাবেচার আগ্রহ বেশি। এখন এক কিকের মাধ্যমেই পছন্দের জিনিস অনলাইন থেকে কেনা যায়। ফলে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে অনলাইন মার্কেট। দেশের অর্থনীতিতেও ই-কমার্স উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অবদান রাখতে শুরু করেছে ।
অন্যান্য পণ্যের মতো গত কয়েক বছরে অনলাইনে ঈদুল আজহার কোরবানির পশু কেনাবেচাও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এখন হাটে নয়, ঘরে বসেই পছন্দের গরু কেনা যাচ্ছে। দেশের নানা অনলাইন মার্কেট কুরবানির পশুর পসরা সাজিয়ে রেখেছে। অর্ডার করলে সোজা চলে আসবে বাড়িতে! কয়েক বছর ধরে এখন এ ভার্চুয়াল হাট বেশ জনপ্রিয়। তবে অনলাইনে কেনাকাটা নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন অভিযোগ শোনা যায়। অনলাইনে বিভিন্ন পণ্য কিনে অনেকে প্রতারণার শিকার হয়েছে। এমনকি কোরবানির পশু কেনাকাটা করেও প্রতারিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ই-কমার্স সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দু’একজন এসব করে ফায়দা নিতে পারে, তবে সার্বিকভাবে এটি জীবনকে সহজ করেছে। এসব প্রতারণা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঝুটঝামেলা এড়াতে ও সময় বাঁচাতে দিন দিন অনলাইনে কেনাকাটার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। অনলাইনে খাবার থেকে সাজসজ্জা সবই মিলছে এখন। গত কয়েক বছর ধরে ঈদুল আজহার কোরবানির পশুও বিভিন্ন সাইটে পাওয়া যাচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেন এক বিরাট কোরবানির হাট, যেখানে গরুর পাশাপাশি কসাই ও অন্যান্য সরঞ্জামও মেলে।
ক্রমবর্ধমান এই প্লাটফর্মের স্বার্থে অনলাইনে প্রতারণা বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এজন্য সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, গ্রামাঞ্চলে ইতোমধ্যে কোরবানির পশুর জমজমাট হাট শুরু হয়েছে। রাজধানী বা অন্যান্য বড় শহরে ঈদের কয়েক দিন আগে হাট জমজমাট হয়ে উঠবে। রাজধানীতে ঈদের ৫ দিন আগে বসবে কোরবানির হাট। তবে দৃশ্যমান হাট না বসলেও অনলাইনে কোরবানির হাটের বেচাকেনা প্রায় শেষের পথে! যদিও পশু থাকাসাপেে ঈদের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্তই অনলাইনে কেনাকাটা চলবে বলে জানা গেছে। সময় বাঁচানো এবং হাটের ঝক্কিঝামেলা এড়াতে অনেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে কোরবানির পশু কিনছেন।
দেশের অন্যতম অনলাইন শপ ‘দারাজ’, ‘বিক্রয় ডটকম’, ‘বেঙ্গল মিট’, ‘আমারদেশ ই-শপ ডটকম’-সহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রি করছে।
অনলাইনে কোরবানির হাট বিষয়ে জানা গেছে, কোরবানির আগের এই সময় যথারীতি হাটে-ঘাটে-মাঠে থাকে যানজট আর জনজট। এর ওপর দালালদের খপ্পর, ছিনতাইয়ের ভয়, জাল টাকা ইত্যাদি নানা ঝামেলা তো আছেই। সে সব ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে ঢাকাসহ দেশের বাইরে থেকেও ক্রেতারা এখন ভিড় করছেন ভার্চুয়াল হাটে। কেননা কোরবানির পশু কেনা ও জবাই করার কাজকে আরও সহজ করে দিয়েছে প্রযুক্তি।
ঈদের কয়েকদিন আগে কিংবা ক্রেতার পছন্দমতো সময়ে কোরবানির পশু বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিয়ে অনলাইনে হাট বসিয়েছে ই-কমার্স সাইটগুলোতে। ক্রেতা আকর্ষণের জন্য কোরবানির পশুর নানা ভঙ্গিও ছবি জুম ইন, জুম আউট করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে অধিকাংশ সাইটে। ক্রেতাদের সুবিধার জন্য পশুর বয়স, দাঁতের সংখ্যা, ওজন, চামড়ার রং, জাত, জন্মস্থান এবং প্রাপ্তিস্থানও দেয়া থাকছে। ক্রেতারা চাইলে স্বচে পশু দেখতে যেতে পারেন। আর ছবি দেখেই ক্রয় করতে চাইলে বিক্রেতা সেই পশু পৌঁছে দেন ক্রেতার ঘরে। শুধু ওয়েবসাইট নয়, পাশাপাশি বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ এবং পেজেও চলছে কোরবানির পশু কেনাবেচা।
জানা গেছে, অনলাইনে বিভিন্ন পশুর ছবি এবং তার পাশে মূল্যও দেয়া থাকে। তাই দামাদামি না করে পছন্দ হলে কোরবানির পশু চলে আসবে বাসায়। তখন মূল্য পরিশোধ করতে হয়। কিছু কিছু সাইটের পশু কিনতে গেলে অগ্রিম কিছু টাকা দিতে হয়।
দেশের বাজারে দীর্ঘদিন থেকেই গরুর মাংস প্রক্রিয়াজাত করে অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করে আসছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল মিট। প্রতিষ্ঠানটি কোরবানির ঈদ সামনে রেখে অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রি করে।
বেঙ্গল মিট-এর হেড অব মার্কেটিং রেজওয়ানউল্লা খান স্বদেশ খবরকে বলেন, আমরা প্রায় ৮শ’ গরু অনলাইনে বিক্রি করব। প্রায় ২শ’ গরু ইতোমধ্যে বিক্রি হয়েছে। বন্যা, ডেঙ্গুসহ নানা কারণে ঈদের দিকে এখনও মানুষ মনযোগী হয়নি। আশা করছি, আমাদের হাতে থাকা অবশিষ্ট গরু দ্রুতই বিক্রি শেষ হবে।

অনলাইনের অপব্যবহার-প্রতারণা
এদিকে অনলাইনের যথাযথ ব্যবহারের পাশাপাশি এর অপব্যবহারও বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন নামে-বেনামে ফেসবুক পেজ খুলে প্রতারণা করছে অসাধু চক্র। ওই সব পেজে যেসব পণ্যের ছবি পোস্ট করা হয়, ডেলিভারি দেয়া অন্য ধরনের নিম্নমানের পণ্য, যার সাথে প্রকৃত পণ্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি প্রকৃত পণ্যের ধারেকাছেও থাকে না। শুধু তাই নয়, একটি পণ্য অর্ডার দিলে, সেই পণ্যের টাকা নিয়ে ডেলিভারি দেয় আরেকটি পণ্য। সোজা কথায় বলতে গেলে এটা এক ধরনের প্রতারণা; যা একটি অসাধু চক্র জেনেবুঝে পরিকল্পিতভাবে করে যাচ্ছে। অনলাইন বাজারের জনপ্রিয়তার মাঝে এ ধরনের প্রতারণাই এ বাজার সম্প্রসারণে মূল প্রতিবন্ধকতা, যা নিরসনে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে Ñ এমনটিই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার অংশ হিসেবে গত ২৪ জুলাই রাতে অভিযান চালিয়ে একটি প্রতারক চক্রের ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ। এছাড়াও বিভিন্ন সময় প্রতারণার কারণে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগও জমা পড়ছে। ই-কমার্সে জনসচেতনতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তায় অসাধু চক্রের তৎপরতা বন্ধ হলে অনলাইন মার্কেটের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই বাড়তে থাকবে।