কলাম

মানসম্পন্ন শিক্ষকের সংকট

সাদেক মাহাবুব চৌধুরী
গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য ভালো শিক্ষকের বিকল্প নেই। তবে আমাদের দেশে সরকারের আন্তরিকতা ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা সত্ত্বেও মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব বেশ প্রকট। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার সকল স্তরেই এ জাতীয় শিক্ষকের অভাব রয়েছে। এর নেপথ্য কারণ সম্পর্কে এ যুগের অনেক শিক্ষার্থী বলেন, তাদের অনেকেই শিক্ষক হতে চান না বা শিক্ষা ক্যাডারে চাকরি করতে চান না। তাদের অনেকেই বিদেশে স্যাটেল হতে চান। আবার কেউবা পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, ফরেন সার্ভিস ও প্রশাসন ক্যাডারে কাজ করতে চান। কারণ তারা সমাজ বা রাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে আগ্রহী। সর্বোপরি তারা সমাজ বা রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক হিসেবে জীবনযাপন করতে চান না।
এর পরের কথা, যারা ওইসব লোভনীয় পদে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না, তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিসিএস শিা ক্যাডার বাদে অন্য শিাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানে তেমন আগ্রহী নন। তাছাড়া অন্য কোথাও পছন্দমতো চাকরি না পেয়ে অনেকেই প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে চাকরিতে যোগদান করেন। এসব জায়গায় নিম্ন বেতন-কাঠামো, দলীয় নিয়োগ, কোচিংবাণিজ্যের আধিপত্য, প্রযুক্তিগত অদতা, প্রশিণের অভাবে মানসম্পন্ন শিকের সংকট তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের শিা খাতজুড়ে অব্যবস্থাপনার চিত্র। শিাব্যবস্থা মুখস্থ ও কোচিংনির্ভর। শিকদের যে বেতন দেয়া হয় তাতে মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী হয় না। নিম্ন বেতন হওয়ায় কাসরুমের চেয়ে কোচিংয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন শিকরা। তাছাড়া শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদানের উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব তো রয়েছে। তাই শিকদের দতা বৃদ্ধিতে প্রশিণের বিষয়ে জোর দিতে হবে। সরকারকে শিা খাতে জোর দিতে হবে, বাজেট বাড়াতে হবে।
শিা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, উচ্চশিাসহ শিার সকল েেত্র তৈরি হয়েছে সংকট। পাঠ্যবই, সিলেবাসে পরিবর্তন আনলেও সে অনুযায়ী প্রশিণের ব্যবস্থা করা হয় না। মাল্টিমিডিয়া কাসরুম চালু হয়েছে অনেক শিাপ্রতিষ্ঠানে। কিন্তু শিকদের খুব কম অংশই নতুন এসব প্রযুক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।
প্রাথমিক-মাধ্যমিকে যখন এ অবস্থা, উচ্চশিা তখন প্রশ্নবিদ্ধ দলীয়করণের বেড়াজালে। শিাব্যবস্থার বেহাল দশার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বেশকিছু কারণ। সমস্যা আরও প্রকট করেছে মানসম্পন্ন শিকের সংকট।

সৃজনশীলতা বোঝেন না
১৩ শতাংশ শিক
সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করেছে। তবে এ বিষয়ে শিকদের কোনো প্রশিণ দেয়া হয়নি। এতে শিক ও শিার্থী উভয়েই বাজারের প্রচলিত গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছেন। প্রাথমিকে ৯২ শতাংশ ছাত্রছাত্রী গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ৪৭ শতাংশ শিক পড়ানোর েেত্র গাইড বইয়ের সহায়তা নেন। ২০১৬ সালে ‘রিসার্চ ফর অ্যাডভান্স অব কমপ্লিট এডুকেশন’ (রেস) পরিচালিত গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ছাত্রছাত্রী নয়, প্রাথমিকের ১৩ শতাংশ শিকও সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝেন না। ৪৫ শতাংশ বোঝেন এবং ৪২ শতাংশ অল্পবিস্তর বুঝতে পারেন। সৃজনশীল পদ্ধতিতেও ৬৭ শতাংশ শিার্থীকে গৃহশিকের সহায়তা নিতে হয়। এক-চতুর্থাংশ ছাত্রছাত্রী পরীার হলে প্রশ্নপত্রই বুঝতে পারে না।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নিয়োগ
দলীয় রাজনীতির কারণে এবং উপাচার্যের পছন্দের ব্যক্তিকে শিক নিয়োগ দিতে শিাগত যোগ্যতা শিথিল করার পাশাপাশি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অতিরিক্ত শিক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপরে বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পালাবদলে বদলায় উপাচার্য। প্রতি মেয়াদে নিয়োগ দেয়া হয় পছন্দের ব্যক্তিকে। অভিযোগ রয়েছে, সকল সরকারের আমলেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার পরিবর্তে প্রাধান্য দেয়া হয় রাজনৈতিক দল এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপরে ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন।
শিক নিয়োগে দুর্নীতি বন্ধ করতে এবং অভিন্ন নীতিমালা প্রয়োগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপরে সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। কিন্তু কোনো পদপেই কাজে আসেনি। ফলে দলীয়করণ এবং পরিবারতন্ত্রের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছেন মেধাবীরা।

নন-এমপিওদের আন্দোলনে
কাটে বেশি সময়
বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে কাসরুম ছেড়ে রাজপথে অবস্থান, অনশন ধর্মঘটে নামতে হয় নন-এমপিও শিকদের। চলতি বছরের মার্চেও এমপিওভুক্তির দাবিতে ৫ দিনের অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন নন-এমপিও শিকরা। সুখে নেই এমপিওভুক্ত শিকরা। নামমাত্র বেতনে কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের জীবনযাত্রা। বেতন কাঠামোর এই পরিস্থিতিতে শিকতা পেশায় আসতে চান না মেধাবীরা। যারা আছেন, তারাও জড়িয়ে পড়েন কোচিংবাণিজ্যে। স্কুলে পড়ানোর চেয়ে কোচিংয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন শিকরা। তাই সন্তানের শিা কার্যক্রমকে জোরদার করতে অভিভাবকদের লম্বা লাইন পড়ছে কোচিং সেন্টারগুলোতে।

পরিবর্তন আছে প্রশিণ নেই
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিাব্যবস্থায় পাঠ্যবই বদল হয়েছে ৭ বার। বিভিন্ন পরীা পদ্ধতি বদলেছে ৪ বার, একাদশে ভর্তি পদ্ধতি ১ বার ও খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলেছে ২ বার। এর ফলে বারবার বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে শিার্থী, অভিভাবক ও শিকদের।
জানা যায়, বিভিন্ন পাবলিক পরীায় আগে প্রথম অংশে লিখিত ও পরের অংশে এমসিকিউ পরীা নির্ধারিত ছিল। পরীায় প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে ২০১৫ সালে সচিবালয়ে পাবলিক পরীা পদ্ধতির সংস্কার বিষয়ক সভায় নেয়া হয় নতুন সিদ্ধান্ত। বলা হয়, প্রথমে শিার্থীরা এমসিকিউ ও পরে লিখিত পরীা বা সৃজনশীল অংশের পরীা দেবে। একই সঙ্গে এমসিকিউ পরীার নম্বরও কমিয়ে আনা হয়। সরকারের মন্ত্রী, সচিবরা এমসিকিউ পরীা পদ্ধতি বন্ধের ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছেন, যা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে ফল মূল্যায়নে জিপিএ-৫ এর পরিবর্তে ৪ করার নতুন সিদ্ধান্ত আসছে। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। সেখানে শিকরা মানসম্পন্ন কি না তা জানে না সরকার। অথচ শিার মানোন্নয়নে যোগ্য শিক্ষকের কোনো বিকল্প নেই।