অর্থনীতি

যে কারণে পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানো যাচ্ছে না বিনিয়োগকারীদের

বিশেষ প্রতিবেদক
পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। তবুও বড় উত্থান-পতনে অস্বাভাবিক চরিত্র ধারণ করা পুঁজিবাজারে প্রতিদিন পুঁজি হারাচ্ছে বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাদের আস্থা ফেরাতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইন সংস্কার ও নীতি পরিবর্তন করলেও কাজ হচ্ছে না। এখন পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ ক্রমে বেড়েই চলেছে।
সারা বিশ্বেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজার হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গা। কিন্তু বাংলাদেশে ঝুঁকি আর অনাস্থার বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজার। তাই পুঁজিবাজার নিয়ে আতঙ্ক কাটছেই না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে বড় পতনে দিশেহারা অবস্থার মধ্যে পড়েছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। যারা অল্প অল্প করে জমানো অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে বা পেনশন বা এককালীন তহবিলের অর্থ পুঁজিবাজারে এনেছে, লাভের পরিবর্তে তাদের এখন মূলধন হারানোর দশা। এ নিয়ে তাদের মাঝে বিরাজ করছে চরম হতাশা আর অসন্তোষ।
পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগে তারল্য প্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা বা এক্সপোজারে ছাড় দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া বাজেটে একগুচ্ছ প্রণোদনা দেয় সরকার। পুঁজিবাজারকে সহায়তা দিতে ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল পেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। এর বাইরে সরকারি প্রণোদনা স্কিমের ৮৫৬ কোটি টাকার মধ্যে ৭৬১ কোটি বিনিয়োগের জন্য পেয়েছে সংস্থাটি। একই স্কিমের তহবিল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অর্থ জোগানে ৮৫ কোটি টাকা ছাড়ের প্রক্রিয়াও চলছে, যা শিগগিরই হাতে পাবে ২৭টি প্রতিষ্ঠান। তবুও বাজারের উন্নতি হচ্ছে না, পতন চলছেই।
এতে পুঁজিবাজারের কয়েক লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এখন দিশেহারা। অব্যাহত দরপতনের কারণে পুঁজি হারাতে বসেছেন তারা। তাই ক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় বিােভও করেছেন। পুঁজিবাজারে টানা পতনের প্রতিবাদে গেল মাসের (জুলাই) শুরুর দিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বিােভ ও মানববন্ধন করেছেন বিনিয়োগকারীরা। তারা পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যানের অপসারণ চেয়ে বিােভ করেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১৫ দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপিও দেন তারা। তাদের মতে, ২০১০ ও ১৯৯৬ সালে যে চক্র শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সরিয়েছে, তারাই আবার বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দরপতনের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। আস্থাহীনতাই দরপতনের বড়ো কারণ। আর এ আস্থাহীনতার মূল কারণ নীতিনির্ধারকদের আশপাশে প্রশ্নবিদ্ধ ইমেজের কিছু লোকজনের উপস্থিতি। বিনিয়োগকারীরা এদের কারণে ভীতসন্ত্রস্ত। না জানি আবারও বড় ধরনের ধস ঘটিয়ে দেয় এরা। এদের কেউ কেউ আবার ইতঃপূর্বেকার কারসাজির সঙ্গেও যুক্ত ছিল।
বিনিয়োগকারীদের অন্যতম দাবি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেনকে সরিয়ে দেয়া। তাদের মতে, এই চেয়ারম্যানকে রেখে বাজার উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ৭ জুলাই থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হয়েছে ১৩ কার্যদিবস, যার মধ্যে ১০ দিনই মূল্যসূচকের বড় পতন ঘটেছে, তিন দিন বেড়েছে সূচক। বড় পতনে ডিএসইর প্রধান সূচক হ্রাস পেয়েছে ৪৫৬ পয়েন্ট। অন্যদিকে তিনদিনের উত্থানে বেড়েছে ১৫২ পয়েন্ট। এই সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১৪ হাজার ৭৪৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ২২ জুলাই পর্যন্ত ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছিল ২১ হাজার ২৮৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান-উর রশীদ স্বদেশ খবরকে বলেন, ৮-১০টি কোম্পানিতে যে বিনিয়োগ করেছি, সেটা এখন তলানিতে। শুধু আমি একাই নই, আমার মতো লাখো বিনিয়োগকারী পুঁজি হারানোর পথে। বড় বড় বিনিয়োগকারীরা বাজারে সক্রিয় নয়, তারা পাতানো খেলায় মেতেছে। একদিন সক্রিয় হলে বড় উত্থান হয়, কিন্তু না কিনলে বাজার পড়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা রয়েছে, বাজার ভালো করতে হলে বিনিয়োগকারীর আস্থা ফেরাতে হবে। কারণ, বিনিয়োগকারীরা বাজারবিমুখ হয়েছে, অনেকে লোকসান হলেও শেয়ার বিক্রি করে বাজার ছাড়ছেন।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। বাজারের স্বাভাবিক চরিত্র হয়ে গেছে এমন যে ঊর্ধ্বমুখী হলে সবাই শেয়ার কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আর পতন হলে বিক্রি করতেও হুমড়ি খায়। এ কারণে বর্তমানে অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম কমে গেছে। সবার অংশগ্রহণ বাড়লে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে।
২০১০ সালে শেয়ারবাজারে কারসাজির ঘটনায় সরকারগঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, সে সময় কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আমাদের সুপারিশে প্রভাবশালীদের নাম এসেছিল কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা ফিরছে না।
পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণে নতুন নতুন বড় প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসার গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এখনও বাজারে যারা আসছে তারা খুবই দুর্বল প্রতিষ্ঠান। এ বাজারে যতদিন বড় বড় প্রতিষ্ঠানের শেয়ার না নিয়ে আসা যাবে ততদিন বিনিয়োগকারীরাও আস্থা ফিরে পাবে না।