রাজনীতি

রংপুর-৩ আসন নিয়ে জাপাতে গৃহবিবাদ!

বিশেষ প্রতিবেদক
জাপার ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুর। এই জেলার মানুষ জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সদ্যপ্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে নিজেদের সন্তান বলে গর্ব করে। তাদের ভাষায় ‘হামাক ছাওয়াল’ এরশাদ ছিলেন রংপুরের মানুষের অনেক ভালোবাসার পাত্র। যে কারণে সংসদ নির্বাচনে এরশাদ রংপুর থেকে বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সাল থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত তিনি রংপুর-৩ (সদর) আসনের একমাত্র জনপ্রতিনিধি ছিলেন। জাপা চেয়ারম্যানের অবর্তমানে আসনটি ধরে রাখতে আশাবাদী তার দল। তবে এরশাদের পরিবার থেকেই কয়েকজন মনোনয়ন দৌঁড়ে আছেন। জাপা থেকে এই আসনে কে প্রার্থী হচ্ছেন এ নিয়ে পার্টির কেন্দ্র থেকে রংপুরে তৃণমূল পর্যন্ত ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিষয়টি নিয়ে জাপায় নিরব ‘গৃহবিবাদ’ চলছে বলেও গুঞ্জন উঠেছে।
পারিবারিক ও দলীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনে প্রার্থী হতে পারেন এরশাদের বড় ছেলে রাহগীর আলমাদি শাদ এরশাদ। পার্টির কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ চাইছেন শাদ এই আসনের উপ-নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক। কিন্তু রংপুরে শাদের নিয়মিত যাতায়াত না থাকায় তাকে নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না স্থানীয় নেতাকর্মীরা। শাদ ছাড়াও পারিবারিকভাবে প্রার্থিতার আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে এরশাদের ছোট ভাই আমেরিকাপ্রবাসী হুসেইন মুহম্মদ মোর্শেদ আপেল, ভাতিজা হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ, ভাতিজা জাপা প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর খালেদ আখতার (অব.) ও ভাগ্নিজামাই জিয়া উদ্দীন বাবলুর নাম। দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকেও আলোচনায় রেখেছেন অনেকেই। সে েেত্র তিনি প্রার্থী হলে তাঁর নিজের জেতা লালমনিরহাট-৩ আসনটি ছেড়ে দিতে হবে। এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ারের নামও রয়েছে আলোচনায়। এরশাদের এই ভাতিজা রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসন থেকে এর আগে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপো করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন শাহরিয়ার আসিফ। সে সময় তাকে জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর ও মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির। দলটির রংপুরের নেতাকর্মীদের একাংশ চাচ্ছে এরশাদ পরিবারের বাইরের কোনো জনপ্রিয় নেতা রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হোক।
জাতীয় পার্টির রংপুর মহানগরীর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন জানান, রংপুর সিটি মেয়র, মহানগরীর ২৫ ওয়ার্ড ও সদরের দুই ভাইস চেয়ারম্যান সম্মিলিতভাবে এস এম ইয়াসিরকে জাপা থেকে একক প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছেন এবং এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্র তৃণমূলের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিয়ে ইয়াসিরকেই মনোনয়ন দেবে- এমন আশা করছেন তারা।
রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে ‘লাঙল’ প্রতীকে যে-ই প্রার্থী হোক, এলাকার মানুষ তাকেই নির্বাচিত করবেন এমন ধারণা দলে প্রবল। এজন্য আসনটিতে প্রার্থী হতে আগ্রহী এরশাদ পরিবারের লোকজন। তবে প্রার্থী হতে গিয়ে তারা একে-অপরের বিরাগভাজন বা শত্রুতে পরিণত হন কি না তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
রংপুর-৩ আসনে দলীয় প্রার্থী ঠিক করা নিয়ে শেষ পর্যন্ত আগ্রহীদের মধ্যে বনিবনা না হলে জাপায় সত্যিই গৃহবিবাদ দেখা দিতে পারে, যা পার্টি ভাঙার কারণ হতে পারে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, এ ইস্যুতে দল না ভাঙলেও দ্বিধাবিভক্তি তৈরি হবে। কারণ পার্টির চেয়ারম্যান পদ এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার পদ নিয়ে জাপার দুই প্রভাবশালী নেতা রওশন এরশাদ ও গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদেরের মধ্যে ঠা-া যুদ্ধ লক্ষ্য করা গেছে। সম্প্রতি জি এম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণার পর তা প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দেন রওশন এরশাদ। এরশাদ জীবিত থাকাকালেও বিভিন্ন সময় তাদের ঘিরে পার্টিতে অস্থিরতা চলেছে। বেশ কয়েকবার পদ-পদবিতে পরিবর্তনও এসেছে। তবে মৃত্যুর আগে এরশাদ তার ছোট ভাই জি এম কাদেরকে রাজনৈতিক উত্তরসূরি বানিয়ে যান, যা মানতে পারেননি রওশন ও তার অনুসারীরা। ফলে রংপুর-৩ আসনে উপ-নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে তারা স্ব স্ব পক্ষের লোক দেয়ার চেষ্টা করবেন এটাই স্বাভাবিক।
এদিকে রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে গত ২৯ জুলাই স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে রংপুর-৩ আসনের উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান এবং জেলা নেতা রেজাউল ইসলাম রাজুর নাম শোনা যাচ্ছে।
এদিকে রংপুর-৩ উপ-নির্বাচনে জাপার বাইরে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ ছোট দলগুলোও এরশাদের শূন্য আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২২টি আসন পায় এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হন সাবেক এ রাষ্ট্রপতি। বার্ধক্যজনিত কারণে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গত ১৪ জুলাই মারা যান। ১৬ জুলাই তাকে রংপুরে নিজ বাড়ি ‘পল্লী নিবাসে’ দাফন করা হয়। সংসদ সচিবালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) আ ই ম গোলাম কিবরিয়া ১৬ জুলাই আসনটি শূন্য হওয়ার গেজেট প্রকাশ করেন। এেেত্র আগামী ১১ অক্টোবরের মধ্যে ওই আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।