ফিচার

রোগব্যাধির প্রকোপ: ইসলাম কী বলে

আতাউর রহমান খসরু
ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপে কাঁপছে দেশ। রাজধানী ঢাকার পর এখন তা দেশের অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে।
অবশ্য শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র দণি এশিয়ায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে মিডিয়াগুলো আন্তরিকভাবে কাজ করছে। সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোও আন্তরিকভাবে সেবা দিচ্ছে। কোনো কোনো চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান কর্মীদের ছুটিও বাতিল করেছে।
সামগ্রিক এই প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। তবে ডেঙ্গুর মতো ব্যাধি কেন বারবার চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে, সে বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।
অবশ্য রোগব্যাধির বিস্তার এবং তা মহামারিতে রূপ নেয়ার পেছনে ইসলামের ব্যাখ্যা একটু ভিন্ন। ইসলাম মনে করে, রোগব্যাধি বিস্তারের পেছনে বস্তুগত বিষয় ও কার্যকারণসমূহ যেমন ক্রিয়াশীল, তেমনি ব্যক্তি ও সমাজের আমল ও প্রবণতাও এ জন্য দায়ী; তবে এর পেছনে মহান স্রষ্টার ইচ্ছা আরো বেশি ক্রিয়াশীল। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ (সা.) যেমন রোগব্যাধি থেকে আত্মরার জন্য সচেতন হওয়ার শিা দিয়েছেন, তেমনি বিপদগ্রস্ত হলে আল্লাহমুখী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনেও সামাজিক সংকট ও বিপদসমূহের পেছনে দুই ধরনের কারণই উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা যে বিপদে আক্রান্ত হও, তা তোমাদের হাতের কামাই এবং তিনি অনেককে মা করে দেন।’ (সুরা: আশ শুরা, আয়াত: ৩০) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি তাদের ভালো ও মন্দের মাধ্যমে পরীা করি, যেন তারা ফিরে আসে।’ (সুরা: আরাফ, আয়াত ১৬৮)
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.)সহ কোরআনের একাধিক ব্যাখ্যাকার আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যায় বলেছেন, কোনো সমাজে অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, অসততা, অশ্লীলতা ও মানুষের অধিকার হরণের মতো অপরাধ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলে আল্লাহতাআলা সেখানে রোগব্যাধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি করেন, যেন তারা আল্লাহর পথে ফিরে আসে। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে এবং তা প্রকাশ্য রূপ নেয়, তখন তাদের মধ্যে এমন প্লেগ (মহামারি) ও ক্ষুধা (দারিদ্র্য) ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের পূর্বপুরুষরা দেখেনি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০১৯)
সুতরাং মুসলিম সমাজে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে এবং তা মহামারিতে রূপ নিলে তারা যেমন বস্তুগত বিষয়ে তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করবে, তেমনি কৃতকর্মের জন্য মহান রবের দরবারে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে। তাঁর কাছে আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করবে।
রোগব্যাধির ব্যাপারে ইসলামের সামগ্রিক নির্দেশনা পর্যালোচনা করলে দুটি দিক পাওয়া যায় Ñ ১. রোগ থেকে আত্মরার ব্যাপারে করণীয়, ২. কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে করণীয়।
ইসলামের শিা হলো মানুষ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় রোগব্যাধি থেকে আত্মরার জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের বক্তব্য হলো বেশিরভাগ রোগের পেছনে অপরিচ্ছন্নতা দায়ী। রাসূলুল্লাহ (সা.) পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অঙ্গ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বাড়িঘর ও তার আঙিনা পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য পানিবাহিত রোগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। রাসূলুল্লাহ (সা.) ব্যবহার্য পানির পরিচ্ছন্নতা রার জন্য তাতে মলমূত্র ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন স্থির পানিতে প্রস্রাব না করে। অতঃপর সে তাতে গোসল করে। (সহিহ বুখারি) অর্থাৎ ব্যবহার্য পানি পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখতে এবং কোনো পানি ব্যবহারের পূর্বে তা ব্যবহারউপযোগী কি না, তা-ও যাচাই করতে হবে। অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা পাত্র ঢেকে রাখো এবং মশকে (চামড়ার তৈরি পানির পাত্র) গিঁট দাও। কেননা প্রতি বছর এক রাতে পৃথিবীতে রোগব্যাধি নেমে আসে। যে পাত্রের মুখে ঢাকনা থাকে না, যে মশকের মুখ বন্ধ থাকে না তাতে রোগ প্রবেশ করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০১৪)
একইভাবে মহানবী (সা.) ধূলাবালি থেকে বেঁচে থাকা, খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধোয়া, প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের পর মাটি দিয়ে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করা, কোনো কিছু পান করার সময় পাত্রের মধ্যে নিঃশ্বাস ত্যাগ না করার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, এতে রোগব্যাধির বিস্তার ঘটে। পাশাপাশি রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব থেকে রা পাওয়ার জন্য আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ারও শিা দিয়েছেন মহানবী (সা.)।
সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করার পরও যদি রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে তাহলে ইসলামের শিা হলো ভয় না পেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আরোগ্যহীন কোনো রোগ আল্লাহ পৃথিবীতে পাঠাননি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫৪)
হাদিসের নির্দেশ হলো, যে এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় সেখানে প্রবেশ করবে না, যেন সে আক্রান্ত না হয় এবং কেউ সেখানে অবস্থান করলে তা ত্যাগ করবে না, যেন রোগের জীবাণু ছড়িয়ে না পড়ে। ব্যাপক হারে এলাকা ত্যাগ করলে যেন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে না পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্লেগ বনি ইসরাঈলের এক দলের ওপর অবতীর্ণ শাস্তির অবশিষ্টাংশ। যদি কোনো এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়ে এবং তোমরা সেখানে থাকো তাহলে সেখান থেকে বের হয়ো না। যদি কোনো এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়ে এবং তোমরা সেখানে না থাকো তাহলে সেখানে প্রবেশ কোরো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৬৫)
আত্মরা ও চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষকে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে। আল্লাহর দরবারে মা প্রার্থনা করবে। বিপদ থেকে আশ্রয় চাইবে। আল্লাহতাআলা বলেন, ‘যখন তাদের ওপর আমার শাস্তি, তখন তারা কেন বিনীত হয়ে কান্না করল না? বরং তাদের অন্তর কঠোর হয়ে গেছে। আর শয়তান তাদের কাজকে সুশোভিত করে তুলেছে।’ (সুরা: আনআম, আয়াত: ৪৩)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকট মা চাও এবং তাঁর নিকট ফিরে আসো তাহলে তিনি তোমাদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উত্তম জীবিকা দান করবেন। প্রত্যেক মর্যাদাবানকে মর্যাদা দান করবেন। আর যদি তোমরা বিমুখ হও তাহলে আমি তোমাদের ব্যাপারে মহাদিবসের শাস্তির আশঙ্কা করছি।’ (সুরা: হুদ, আয়াত: ৩)
সর্বোপরি রোগব্যাধির মহামারি থেকে আত্মরার জন্য ব্যক্তিগত ও সম্মিলিতভাবে দোয়া করা আবশ্যক। কেননা আল্লাহই পারেন বান্দাকে সব ধরনের বিপদের হাত থেকে রা করতে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনা অঞ্চলের জ্বরের প্রাদুর্ভাব দূর করার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৩০)