প্রতিবেদন

৮০ লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তারকৃত ডিআইজি প্রিজন্স পার্থ বণিক দুদকের মামলায় কারাগারে

নিজস্ব প্রতিবেদক
কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) পার্থ গোপাল বণিক। চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন হাজার-হাজার বন্দির রক। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে সেই কারাগারেই ঠাঁই হলো তার। তিনি এখন কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। অবৈধ উপায়ে অর্জিত বিপুল অর্থই তার পতনের কারণ।
সিলেট কারাগারের ডিআইজি প্রিজন্স পার্থ গোপাল বণিকের ঢাকার বাসা থেকে সম্প্রতি ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। গত ২৮ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির ভূতের গলিতে তার ফ্যাট থেকে ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এরপরই তাকে আটক এবং মামলা দায়েরের পর গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বিষয়টি সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফ্যাট থেকে ৮০ লাখ টাকা উদ্ধারের পর ডিআইজি প্রিজন্স পার্থ গোপাল বণিকের বিরুদ্ধে গত ২৯ জুলাই দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সালাউদ্দীন আহমেদ একটি মামলা করেন। দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলাটি করা হয়। ঘুষ গ্রহণ ও মানিলন্ডারিং আইনে করা মামলায় বিকেলে তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। জামিন শুনানি শেষে ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ কে এম ইমরুল কায়েস আবেদন নাকচ করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলায় বলা হয়, আসামি পার্থ গোপাল সরকারি চাকরিতে কর্মরত থেকে অর্পিত মতার অপব্যবহার করেন। তিনি বৈধ পারিশ্রমিকের অতিরিক্ত হিসেবে ঘুষ গ্রহণ করে জ্ঞাতআয়বহির্ভূত ৮০ লাখ টাকা অর্জন করে তা পাচারের উদ্দেশ্যে নিজের বাসার কেবিনেটে লুকিয়ে রাখেন, যা দ-বিধির ১৬১ (ঘুষ) ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা এবং ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪ (২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
৩০ এপ্রিল থেকে চট্টগ্রাম কারাগারের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত অন্তত ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত করে আসছে দুদকের পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফের নেতৃত্বে একটি টিম। পার্থ গোপাল চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি থাকার সময় অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছে এমন অভিযোগে ওই টিমের সদস্যরা দুদকের প্রধান কার্যালয়ে ২৮ জুলাই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে ঘুষ ও দুর্নীতির কয়েক লাখ নগদ টাকা বাসায় রয়েছে – এমন তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে নিয়ে রাজধানীর ভূতের গলির বাসায় অভিযান চালাতে যায় দুদক। এ সময় পার্থর স্ত্রী ডা. রতন মনি সাহা গেট না খুলে পাশের ভবনের ছাদে টাকাভর্তি দুটি ব্যাগ ছুড়ে ফেলেন। দুদক কর্মকর্তারা সেই দুটি ব্যাগ উদ্ধার করে ৫০ লাখ টাকা পান। পরে তারা বাসার গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকার কথা বললে পার্থর স্ত্রী গেট খুলে দেন। দুদক বাসার বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালিয়ে আরো ৩০ লাখ টাকা উদ্ধার করে। সেই সঙ্গে একটি প্রাইভেট কার জব্দ করা হয়। তবে এসব দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত নয় বলে দাবি করেন ডিআইজি প্রিজন্স পার্থ বণিক।
পার্থ দেশের বাইরের এক আত্মীয়ের কাছে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচারের পরিকল্পনা করেছিল বলে দুদকের কাছে তথ্য ছিল। সে উদ্দেশ্যেই এত টাকা বাসায় জমা করছিল পার্থ। এজন্যই ব্যাংকে জমানো টাকা নেই বলে দাবি করে সে। দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, যার বাসায় এত টাকা থাকে তিনি কিনা চড়েন বন্ধুর দেয়া গাড়িতে, থাকেন শাশুড়ির বাড়িতে। এছাড়া উত্তরায় মায়ের নামে আছে একটি ফ্যাট, যার মালিকও নন তিনি। পার্থ গোপালই এর প্রকৃত মালিক বলে মনে করছে দুদক।
দুদক সূত্র বলছে, ডিআইজি পার্থ কলাবাগানে যে বাসায় থাকে, সেটি তার শাশুড়ি মঞ্জু সাহার নামে কেনা। তবে ফ্যাট বাড়িটির মালিক দুদককে নিশ্চিত করেছেন, বাড়িটি কিনেছে ডিআইজি নিজেই।
সূত্র জানায়, ডিআইজি প্রিজন্স পার্থর পরিবার যে গাড়িটি ব্যবহার করে, সেটি তাঁর এক বন্ধুর নামে। আর নিকেতনে একটি ফ্যাট আছে পার্থর মায়ের নামে। দুদকের অভিযানের শুরুতে জব্দ করা টাকার মধ্যে ৩০ লাখ টাকাও তাঁর শাশুড়ির বলে দাবি করেছিলেন ডিআইজি পার্থ। ব্যাংক থেকে উঠিয়ে সেগুলো বাসায় রাখা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও এর কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, একটি জেলার কারাগারের গুরুত্বপূর্ণ সব নির্দেশই ডিআইজি দিয়ে থাকেন। কারাগারে বন্দিদের খাবার থেকে শুরু করে কোন সেলে কাকে রাখতে হবে তার নির্দেশ দিয়ে থাকেন। কারা অভ্যন্তরে কিছু হলে তিনিই দ্রুত হস্তপে করেন। তার অধীনে জেলা কারাগারের জেল সুপার, জেলার, ডেপুটি জেলার এমনকি শত শত কারারী কাজ করেন। বলা যায়, একটি কারাগারের গুরুত্বপূর্ণ পদ বা ব্যক্তিই হলেন ডিআইজি। সে সুবাদে কারা অভ্যন্তরে সরকারি ক্রয়, বন্দিদের কাছে অতিরিক্ত মূল্যে খাবার বিক্রি এমনকি সিট বিক্রি করেও সে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে।

দুদকের কাছে তথ্য আছে, পার্থ ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট চট্টগ্রাম কারাগারে ডিআইজি হিসেবে যোগ দেয়। ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর নগদ ৪৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ও প্রায় ৫ কোটি টাকার নথিপত্রসহ ভৈরব রেলওয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় চট্টগ্রামের জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস। এরপরই পার্থ গোপালসহ আরো কয়েকজন কারা কর্মকর্তার দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসে।
এদিকে ২৯ জুলাই চট্টগ্রামের সাবেক সিনিয়র জেল সুপার (বর্তমানে বরিশালে কর্মরত) প্রশান্ত কুমার বণিককেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক টিম। দুদকের কাছে তথ্য ছিল, সেও মোটা অংকের ঘুষের টাকা নিজের হেফাজতে রেখেছেন। ২৮ জুলাই পার্থ বণিক গ্রেপ্তারের পর প্রশান্ত কুমার সতর্ক হয়ে যায়। দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে সে বলেছে, তৎকালীন জেলার সোহেল রানা তাদের নাম বলে ফাঁসিয়েছেন। সোহেল রানার সঙ্গে তাদের বিরোধ থাকায় তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করে দেন।
পার্থ বণিকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু
পার্থ বণিকের বাসা থেকে ৮০ লাখ টাকা উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। গত ৩১ জুলাই দুদকের সহকারী পরিচালককে ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়।
পার্থ ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার করছেন বলে নানা মাধ্যম থেকে তথ্য পাচ্ছে দুদক। এসব তথ্য যাচাই করতে পার্থকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম কারাগারের তৎকালীন জেলার সোহেল রানা ও পার্থ বণিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মুখোমুখি করার কথাও ভাবছে দুদক।
পার্থ গত ১০ বছরে কারাগার থেকে অবৈধভাবে কী পরিমাণ টাকা আয় করেছেন সে বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এ মামলা ছাড়াও তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আলাদা একটি অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ফকরুল ইসলাম ওই অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। তবে অনুসন্ধান ফাইলটি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হতে পারে।
দুদকের পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফ বলেন, পার্থ বণিকের অবৈধ সম্পদের সন্ধানে কাজ চলছে। দু’টি টিম এ দায়িত্ব পালন করছে। আশা করি, তদন্তে পার্থ বণিকসহ অনেক কর্মকর্তার বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, আমরা চার দিক থেকে চট্টগ্রাম কারাগারের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির তদন্ত করছি।