রাজনীতি

আন্ডারগ্রাউন্ড দলে পরিণত হচ্ছে জামায়াত!

বিশেষ প্রতিবেদক
মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত দল জামায়াত এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। ‘নিরব’ আছে দলটির সহযোগী সংগঠন ছাত্রশিবিরও। আদালতের রায়ের কারণে ইসি দলটির নিবন্ধন বাতিল করায় দেশে জামায়াতের রাজনীতির কার্যত বৈধতা নেই। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দলটির শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবারই সাজা কার্যকর হয়েছে। গণমাধ্যমে বিবৃতি দান এবং রাজনৈতিকভাবে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন কিছু কর্মসূচি ছোট পরিসরের পালন করা ছাড়া দলটিকে এখন আর মাঠে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না। তবে দলটি গোপনে গোপনে বড় কোনো পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় নিবন্ধন ও প্রতীক না থাকার কারণে বিএনপির প্রতীকে নির্বাচন করে পুরোপুরি ধরাশায়ী হওয়ার পর অনেকটাই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গেল বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিজেদের দাঁড়িপাল্লার বদলে ২০ দলীয় জোটের প্রধান দল বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জামায়াতের ২২ নেতা। নির্বাচনে বিএনপি জোটভুক্ত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলীয় জোটের অন্যদের মতো জামায়াতেরও ভরাডুবি হয়। ধানের শীষ প্রতীকধারী জামায়াতের ২২ প্রার্থীর কেউই নির্বাচনে পাস করতে পারেননি। এরপর থেকে বলার মতো কোনো রাজনৈতিক কর্মকা- নেই দলটির। এমনকি ২০ দলীয় জোটের প্রধান দল বিএনপির কোনো কর্মসূচিতেও সেভাবে দেখা মেলেনি জামায়াত নেতাকর্মীদের। নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে ‘নতুন দল’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করলেও তাতে সফল হননি জামায়াত নেতারা।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন সম্পর্কিত একটি রুলের রায়ে এই দলের নিবন্ধন অবৈধ এবং একে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করেন। এর পর থেকেই দলীয় রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়া এ দলটি নতুন রূপে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করে।
জামায়াতের একাধিক প স্বদেশ খবরকে জানায়, রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকলেও সাংগঠনিক ও অভ্যন্তরীণ দাওয়াতি কাজে ব্যস্ত রয়েছে জামায়াত। বিশেষ কমিটির সদস্যদের কয়েকজন কারাগারে এবং দেশের বাইরে থাকায় ‘নতুন নাম’ এর বিষয়টি নিয়ে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। এছাড়া অভ্যন্তরীণ কাজে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকায় সময় বেশি লাগছে।
জানা গেছে, নতুন দলের সাংগঠনিক, আদর্শিক, অর্থনৈতিক উৎসসহ নানা বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি জামায়াতের পাঁচ সদস্যের কমিটি। বিশেষ করে নতুন দলটি কি জামায়াতের অঙ্গ হিসেবে থাকবে, নাকি পৃথক বা আলাদা হবে, এ বিষয়েও কোনো সুরাহা হয়নি। দলের আদর্শ ধর্মভিত্তিক নাকি সেক্যুলার হবে, ইসলামিক এজেন্ডা থাকবে কি না, গঠনতন্ত্রের ফরম্যাট কী হবে, নেতৃত্ব কারা দেবে, সংগঠনের অর্থনৈতিক কাঠামো কী হবে, যারা নতুন দলে যুক্ত হবেন, তারা মূল দল জামায়াতের স্বপদে থাকবেন কি না Ñ এসব প্রশ্নে কোনো সমাধানে আসতে পারেননি জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিশেষ কমিটি।
নতুন নামে নতুন দল গড়ে তোলার বিষয়টি গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দলের নেতাকর্মীদের জানিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। ১৬-১৭ ফেব্রুয়ারি দলের দায়িত্বশীলদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতেও এ উদ্যোগের কথা জানানো হয়। এর পর ৬ মাস পার হলেও নতুন দলের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে পারেনি ৫ সদস্য নিয়ে গঠিত বিশেষ কমিটি। নানা বিষয়ে কমিটির সদস্যদের মধ্যেই তৈরি হয়েছে মতদ্বৈধতা।
জামায়াতের কেউ কেউ মনে করেন, নতুন দল সম্পূর্ণ আলাদা, স্বাধীন ও নতুন নেতৃত্বেই গঠিত হবে। তবে অন্য কয়েকজন নেতা জানান, নতুন দলের সদস্যপদের কাঠামো কী হবে, জামায়াতের মতো হবে কি না, তা এখনও প্রশ্নসাপে। এছাড়া কর্মী গঠন প্রক্রিয়ায় জামায়াত-শিবিরের পাঠ্যক্রম বজায় থাকবে নাকি বাতিল হবে, তা নিয়েও কমিটির মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা আছে। এসব কারণে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ বিলম্বিত হচ্ছে।
সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামীর নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে বেশ গোপনে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি ভেবে-চিন্তে কাজ করছে। তারা চূড়ান্ত কোনো সুপারিশমালা তৈরি না করলেও একাধিকবার বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। যদিও দলটির বেশিরভাগ নেতাই মনে করছেন, নতুন কোনো রাজনৈতিক দল গঠনের পরিবেশ বর্তমানে নেই।
নতুন দল গঠন হলে কে হবেন জামায়াতের আমির Ñ তা নিয়েও দলে বিভক্তি রয়েছে। তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এমন কোনো নেতাকে নতুন দলে রাখা হবে না।
সূত্র বলছে, মিয়া গোলাম পরওয়ারেরই নতুন দলের আমির হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তিনি বর্তমানে জামায়াতের নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সংসদ সদস্যও ছিলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এছাড়া আরেক নায়েবে আমির এটিএম মাসুমের নামও আলোচনায় রয়েছে নতুন সংগঠনের ‘আমির’ হিসেবে। সেক্রেটারি হিসেবে আলোচনায় রয়েছে রফিকুল ইসলাম খান ও হামিদুর রহমান আযাদের নাম। তারা দু’জনই ঢাকা মহানগর জামায়াতের শীর্ষ দায়িত্ব পালন করেছেন। শিবিরের সভাপতি হিসেবেও এক সময় দায়িত্ব পালন করেছেন তারা।
চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠক থেকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্যদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রস্তাবনা পাঠানো হয় বিবেচনার জন্য। এরপর শুরা সদস্যদের অভিমতের ভিত্তিতেই নতুন নামে সংগঠন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয় এবং ৫ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়। যদিও এই কমিটি গঠনের বিষয়টি গোপন রাখার অভিযোগ এনে ১৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে অবস্থানকারী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের পদ থেকে ইস্তফা দেন। ১৬ ফেব্রুয়ারি শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এনে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মুজিবুর রহমান মনজুকে। এই মনজুর উদ্যোগেই নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। তাঁর নেতৃত্বে গত ২৭ এপ্রিল ‘জন আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ নামে নতুন রূপে জামায়াতের একটি প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটে। যদিও পরবর্তীতে জন আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ আর বেশি দূর এগোয়নি। জামায়াতের নতুন ও পুরনো দল Ñ উভয়টিই এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। ফলে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের অধিকাংশ নেতাই এখন নিষ্ক্রিয় অথবা দেশ-বিদেশে পলাতক রয়েছেন।
জানা যায়, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করেও নানা প্রতিকূলতার কারণে খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে জামায়াতের যে অবস্থান, সেখান থেকে প্রকাশ্যে মা চাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। সেেেত্র নতুন নামে এলেও এ বিষয়টি থেকে কতটা নিস্তার পাওয়া যাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থাকবে।

বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনায় জামায়াত-শিবির!
ঢাকা ও আশপাশের শহরে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের পরিকল্পনায় বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে তথ্য পেয়েছে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। সম্প্রতি তাদের অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা রিপোর্টে এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়।
সূত্র জানায়, চলতি বছর তিনটি একে-২২ অস্ত্রসহ ৭৫টি বোমা তৈরির ডেটনেটর উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো দিয়ে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলায় হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল জামায়াতের একটি গ্রুপ।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, শিবিরের সদস্যরা আফগানিস্তান ও দণি এশীয় দেশগুলোর বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের জঙ্গিদের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারা যাতে বড় নাশকতা না করতে পারে সেদিকে নজর দেয়া হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা স্বদেশ খবরকে বলেন, যারা দেশে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আনার চেষ্টা করছে, নাশকতার পরিকল্পনা করছে, তাদের বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ব্যবসায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এ বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে।

শেষ কথা
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য করতে রাজাকার, আলবদর, আলশামস্ প্রভৃতি আধা সামরিক বাহিনী গড়ে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, সংখ্যালঘু নির্যাতন, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করার অপকর্মে লিপ্ত ছিল। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ে বড় ভূমিকা রাখে এ দলটি। মানবতাবিরোধী এসব অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়েছে এবং এসব অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীকে মৃত্যুদ-সহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়া উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে নিজ দলীয় পরিচয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকারও হারিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যে দলটি স্বাধীনতার পরে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত ছিল।
মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকার জন্য দেশের জনগণের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে জামায়াত নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করলে ভালো করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামী দল মূল ধারার রাজনীতিতে ভূমিকা রাখলে তা হবে গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গতার জন্য সহায়ক। তবে এর আগে তাদের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। কিন্তু তা না করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা গোপন ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করলে তা দেশের মানুষের ক্ষতির কারণ হবে। সেই সঙ্গে তারা নিজেদের ধ্বংসও ডেকে আনবে।
অনেক রাজনৈতিক সমালোচক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলছেন, জামায়াত-শিবির প্রকাশ্যে রাজনীতি করার জায়গায় না থেকে যদি আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি শুরু করে, তা দেশ ও জাতির জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না।