রাজনীতি

কাদের-রওশন দ্বন্দ্বে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না জাপা

বিশেষ প্রতিবেদক
একাদশ জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে রয়েছে সদ্যপ্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি (জাপা)। এর আগের দশম সংসদেও বিরোধী দলে ছিল দলটি। জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এবং দশম জাতীয় সংসদের পুরো সময় ও একাদশ সংসদের কিছু সময় এরশাদ তার হাতে গড়া দলের সর্বেসর্বা ছিলেন। তাঁর একক সিদ্ধান্তেই দল পরিচালিত হতো। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর দলে এখন রীতিমতো গৃহবিবাদ চলছে। এরশাদের স্ত্রী রওশন এবং ছোট ভাই জি এম কাদেরের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে ঘোরতর সংকটে পড়েছে জাতীয় পার্টি। পার্টির এহেন অবস্থায় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা রয়েছেন চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে। দলে কে কোন নেতার অনুসারী হবেন Ñ এ নিয়ে অনেকের মাঝেই রয়েছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। তাই নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ না করতে অনেকেই এখন দলে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
এ কারণে রাজনীতিসংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক মাঠে বিএনপির নেতৃত্বশূন্যতা ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে জাপার বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এরশাদের ভাই ও পতœীর দ্বন্দ্বে যেকোনো সময় ভাঙনের মুখে পড়তে পারে জাতীয় পার্টি।
বিএনপিবিহীন ৫ জানুয়ারির (২০১৪) নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দলে বসার সুযোগ হয় জাপার। কিন্তু বিতর্ক পিছু ছাড়েনি জাপা এবং দলের শীর্ষ নেতাদের। রাজনৈতিক মঞ্চে নিজেদের শক্ত করার বদলে নানা সংকটে আবর্তিত হয়ে পড়ে এক সময়ের সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের গড়া এই দলটি। আজীবন চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর পরও জাপার সংকট কাটেনি। বরং দলের চেয়ারম্যান নির্বাচন এবং বিরোধী দলীয় নেতা কে হবেন – এই প্রশ্নে দলে সংকট ক্রমেই ঘনিভূত হচ্ছে।
প্রয়াত এরশাদের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, আর পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান এরশাদপতœী রওশন এরশাদ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হবেন – এতদিন এই ধরনের সমঝোতার কথা শোনা গেলেও এখন তা ভেস্তে যেতে বসেছে। রওশন বলয়ের নেতারা যখন প্রকাশ্যে বলেছেন, রওশনই দলের চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হবেন, তখন বিপরীত অবস্থান জানান দিয়েছেন জি এম কাদের বলয়ের নেতারাও। এ নিয়ে রীতিমতো মুখোমুখি অবস্থানে দলের তৃণমূল নেতৃত্ব; কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়।
এমতাবস্থায়, গত ১৭ আগস্ট রাজধানীর বনানীতে জাপা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্যদের যৌথসভায় অংশ নেয়া মোট ৩৫ জনের মধ্যে বক্তব্য রাখা ১৭-১৮ জনের প্রত্যেকেই তাদের বক্তব্যে বলেছেন, ‘জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান আছেন, থাকবেন; তাঁকে আমরা চেয়ারম্যানের পাশাপাশি সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও দেখতে চাই।’
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ গত ১৪ জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) মারা যান। অবশ্য এর আগে গত ৪ মে জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন এরশাদ। এরশাদের এই সিদ্ধান্তে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই অখুশি হন। তবে এ নিয়ে বড় ধরনের কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হয়নি। এরশাদের মৃত্যুর পর গত ১৮ জুলাই রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে জি এম কাদেরকে দলের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। পার্টির প থেকে বলা হয়, দলের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেেিতই জি এম কাদের চেয়ারম্যান হয়েছেন।
দলীয় চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসে জি এম কাদের বলেন, জাতীয় পার্টিতে কোনো দ্বন্দ্ব, মতভেদ ও বিভেদ নেই। জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধ।
পরে জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন হাতে লেখা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দাবি করেন, জি এম কাদের জাপার চেয়ারম্যান নন। রওশনপন্থি শীর্ষ নেতারাও জি এম কাদেরকে না মানার পক্ষে।
এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনে জাপার মনোনয়ন কাকে দেয়া হবে এই ইস্যুতেও জি এম কাদের ও রওশনপন্থিদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। জাপা সূত্রে জানা গেছে, দলের শীর্ষ নেতাদের মতামত নিয়েই বিরোধী দলের নেতা নির্বাচন ও রংপুর-৩ আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করবে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। পাশাপাশি রাজনীতিতে টিকে থাকতে দলকে আরও শক্তিশালী করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। বনানী কার্যালয়ের প্রেসিডিয়াম ও এমপিদের যৌথসভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে যোগ দেয়া জাপার শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগই বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে বিরোধী দলের নেতা বানানোর পে মত দিয়েছেন। কারও কারও বক্তব্য, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধী দলের নেতা চূড়ান্ত করা উচিত, যেন নেতৃত্ব নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলে কোনো বিরোধ বা ভাঙনের সৃষ্টি না হয়।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের। তবে রওশন এরশাদ এবং তার অনুসারী বেশ কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্র স্বদেশ খবরকে জানায়, সভায় মূল আলোচনা হয়েছে এরশাদের চেহলাম পালন ও বিরোধী দলের নেতা নির্বাচন প্রসঙ্গে। রংপুর-৩ আসনের উপ-নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এর বাইরে বিরোধী দল হিসেবে জাপার সাংগঠনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি, দলীয় বিরোধ নিরসনসহ চলমান রাজনৈতিক অবস্থার কথাও তুলে ধরেন কেউ কেউ।
বৈঠকে জিএম কাদের বলেন, জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধ আছে। জনগণের কল্যাণে যে ধরনের কর্মসূচি নেয়া দরকার তা নেয়া হচ্ছে। বন্যা মোকাবিলা, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চামড়া ইস্যুতে আমরা রাজপথে সরব ছিলাম, এখনও আছি। ভবিষ্যতেও মানুষের পাশে থেকে রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করা হবে।
জি এম কাদের আরো বলেন, বিরোধী দলের নেতা কে হবেন সে বিষয়ে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, যাতে পার্টিতে কোনো বিভেদ সৃষ্টি না হয়।
পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, পার্টির গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যানকে সুপ্রিম পাওয়ার দেয়া আছে। দলে কোনো বিরোধ নেই। সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে বিরোধী দলের নেতা নির্বাচন এবং রংপুর-৩ আসনে মনোনয়ন দেয়া হবে।
উল্লেখ্য, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেয়ার কিছুদিন পর রওশন এরশাদ তা প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দেন। এতে জাপা নেতাকর্মীসহ দলটির শুভাকাক্সক্ষীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। দলের চেয়ারম্যান এবং সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ঠিক করার প্রশ্নে জাপায় ফের ভাঙন দেখা দেবে – এমন আশঙ্কাও করেন অনেকে।
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এরশাদের জীবদ্দশাতেই জাতীয় পার্টি ভেঙ্গে তিন টুকরা হয়। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে ছিলেন; দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সকাল-বিকাল সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে রাজনীতির মাঠে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেন। নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলেও শেষ পর্যন্ত এমপি নির্বাচিত হন। তার দল জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে বসে। এরশাদ নিজে হন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এমনকি জাপা নেতাদের পদ-পদবি নিয়ে কম জল ঘোলা করেননি এরশাদ। বিশেষত মহাসচিব পদে কয়েক দফা রদবদল করেন তিনি। কখনো জিয়াউদ্দিন বাবলু, কখনো রুহুল আমিন হাওলাদার, কখনো মশিউর রহমান রাঙ্গাকে বসান মহাসচিবের পদে।
এরশাদ তার ছোট ভাই জি এম কাদের ও স্ত্রী রওশন এরশাদকে নিয়েও নানা সময়ে দোটানায় ভুগেছেন, একাধিকবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। দশম সংসদ নির্বাচনের পর জি এম কাদেরকে জাপার কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। পরে স্ত্রী রওশনের চাপে তাকে করেন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান। একইভাবে সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার পদে স্ত্রী ও ভাইকে বসানো নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতার পরিচয় দিয়েছেন এরশাদ। সমস্যা হয়েছে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন সংসদীয় আসনের দলীয় মনোনয়ন নিয়েও। সর্বশেষ জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা নিয়ে দুই দফা সিদ্ধান্ত বদলান। যদিও শেষ পর্যন্ত ভাই জি এম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রাখেন তিনি; ঘোষণা দেন রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে, যা সহজভাবে নিতে পারেননি রওশন ও তার অনুসারীরা।