আন্তর্জাতিক

কাশ্মির ইস্যুতে উত্তপ্ত উপমহাদেশীয় রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারতীয় কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপ করার পর থেকে এই ইস্যুতে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে উপমহাদেশীয় রাজনীতি। তারই প্রেেিত বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্য চলছে তীব্র উত্তজনা। ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন এ বিষয়ে নাক গলানো শুরু করেছে। কাশ্মিরের পরিস্থিতি বিস্ফোরক ও অত্যন্ত জটিল বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একইসাথে ফের কাশ্মির নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানকে মধ্যস্থতার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে বলেন, খুব জটিল একটা জায়গা কাশ্মির। সেখানে হিন্দু আছে, মুসলিম আছে। তারা একসঙ্গে খুব ভালো আছে, এমনটা আমি বলতে পারবো না। বর্তমানে এটাই পরিস্থিতি।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, ফ্রান্সে আসন্ন জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে তার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হবে। সেই বৈঠকে কাশ্মির নিয়ে আলোচনা করা হবে। এই দুই দেশের মধ্যে প্রচুর সমস্যা রয়েছে। আমি মধ্যস্থতা করে বা অন্য কিছু করে সবদিক দিয়ে চেষ্টা করব। এটা জটিল পরিস্থিতি। ধর্ম নিয়ে অনেক কিছু করার আছে। ধর্ম একটা জটিল বিষয়।
এদিকে কাশ্মির ইস্যু নিয়ে এবার আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি এ কথা জানিয়ে বলেছেন, সব আইনি দিক বিচার করেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, কাশ্মিরে ৩৭০ ধারা বাতিলসহ নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক পদেেপর বিরোধিতা করে এরই মধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি উত্থাপন করেছিল ইসলামাবাদ ও বেইজিং। কিন্তু কাশ্মির যে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়, সে ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদে পাল্টা প্রশ্ন তোলে নয়াদিল্লি। ফলে এ ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদ শেষ পর্যন্ত আর নাক গলাতে রাজি হয়নি। তাতে সন্দেহাতীতভাবেই নাক কাটা গেছে পাকিস্তানের।
ভারতীয় কূটনীতিকদের মতে, নিজেদের মুখ বাঁচাতেই এখন আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার কথা বলছে ইসলামাবাদ। শেষ পর্যন্ত তারা তা করে কি না, তা দেখার অপোয় থাকবে ভারত।
কাশ্মিরে ৩৭০ ধারা বাতিলের পর গত ৬ আগস্ট পাকিস্তানের সংসদের উচ্চ ও নিম্নকক্ষের যৌথ অধিবেশন ডেকেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। সে দিনই তিনি জানিয়েছিলেন, এ ব্যাপারে সব রকম আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাবে ইসলামাবাদ।
তবে ভারতীয় কূটনীতিকরা বলছেন, কাশ্মিরের জন্য ইমরান খানের যত না উদ্বেগ, তার চাইতে বেশি উদ্বেগ নিজের গদি রক্ষা নিয়ে। ঘরোয়া রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য ভারতবিদ্বেষী মনোভাব জাগিয়ে তুলতে চাইছেন তিনি।
অন্যদিকে কাশ্মিরে ৩৭০ ধারা বাতিলের বিরোধিতার পর এবার আকসাই চীন নিয়ে জোর প্রশ্ন তুলেছে চীন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন দাবি করেছে, ৩৭০ ধারা বাতিলের মাধ্যমে চীনের সার্বভৌমত্বে আঘাত হেনেছে ভারত। কারণ লাদাখকে পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
লাদাখের একটি অংশ আকসাই চীন, যা চীন জবরদখল করে আছে বলে অভিযোগ ভারতের। লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার কারণেই আকসাই চীন নিয়ে সিঁদুরে মেঘ দেখছে চীন।
এদিকে চীন আকসাই চীনের প্রসঙ্গ জাতিসংঘে উত্থাপন করায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রানিয়াম জয়শঙ্কর জানান, নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এলওসি বজায় রেখে ভারত তার দেশ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত করার প্রশ্নই ওঠে না। ভারত কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ রেখা লঙ্ঘন করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।
ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের সবচেয়ে বড় শহর শ্রীনগরে সব কিছু নিশ্চুপ হয়ে যায় চলতি বছরের ৫ আগস্ট রাত দেড়টা নাগাদ। ফোন সংযোগ এবং ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রাস্তাঘাটও সুনসান হয়ে পড়ে।
৬ আগস্ট ভোরবেলা রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শহরজুড়ে আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। শ্রীনগর তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে তখনও স্পষ্ট হয়নি কী হতে যাচ্ছে? কেন শহরটি অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, তা নিশ্চিত করার কোনো উপায় ছিল না।
৬ আগস্ট ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ভারতীয় সংবিধানের সাত দশকের পুরনো অনুচ্ছেদ ৩৭০ ধারা বাতিল বলে ঘোষণা করেন, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে অর্ধস্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিল। এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর ভারত সরকার চিন্তিত ছিল যে, বিােভে ভেসে যাবে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির। এর আগে ২০০৮, ২০১০ ও ২০১৬ সালে বিক্ষোভে ভেসে গিয়েছিল শ্রীনগর। ভারতীয় কর্তৃপ আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে কয়েক হাজার পর্যটক ও হিন্দু তীর্থযাত্রীকে সরিয়ে নিয়ে যায়। শ্রীনগরে কারফিউ জারি হয়, মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়।
ভারত সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কাশ্মিরিদের মধ্যে ভীতি প্রকাশ করে যে, এই অঞ্চলের ডেমোগ্রাফি পরিবর্তনের প্রধান প্রচেষ্টা অনুসরণ করা হবে। ভারতশাসিত কাশ্মির ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল। এখন পর্যন্ত শ্রীনগর কার্যত নিরব আর সেখানে ফোনের লাইন এবং ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে বসবাসকারী মানুষ পৃথিবী থেকে এবং একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তারা বন্ধু ও আত্মীয়দের খবরের জন্য অপো করতে শুরু করে।
শ্রীনগরে প্রতি কয়েক শ’ মিটার পরপরই লোকজনকে আটকে দেয়া হচ্ছিল। শ্রীনগরের ঐতিহাসিক চত্বর লাল চক, যেখানে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরু কাশ্মিরী নাগরিকদের বাড়তি সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেখানেও সিলমোহর পড়ে যায়।
প্রতিদিন এখন কাশ্মির একই রকম দেখতে; একই অবরোধ, একই অবস্থা। কারোরই কোনো ইন্টারনেট সংযোগ নেই, ফোনও নেই, আর তাই কোনো উপায় নেই আত্মীয়দের খবর জানার। মৃত্যু আর শোক জানার উপায় নেই। আনন্দ-সুখের মুহূর্তগুলো জানানোর এবং জানার উপায় নেই। কাশ্মিরের এই পরিস্থিতি নিদারুণ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে। এমনকি এখন ধর্মভিত্তিক একটি পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কায় আছে পুরো উপমহাদেশ।