রাজনীতি

খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে সমঝোতার পথ খুঁজছে বিএনপি?

বিশেষ প্রতিবেদক
দুর্নীতির মামলায় সাজা মাথায় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কারাবন্দি আছেন দেড় বছর। তার মুক্তির দাবিতে রাজপথের আন্দোলন থেকে শুরু করে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি। দলীয় প্রধানকে মুক্ত করার চেষ্টার অংশ হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন দলীয় সরকারের অধীনে অংশ নেয় বিএনপি। দলটির সর্বশেষ বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশগুলোতেও প্রধান দাবি ছিল দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি। কিন্তু খালেদা জিয়ার মুক্তি মেলেনি। তাই শেষ চেষ্টা হিসেবে এখন সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জামিন বা প্যারোলে মুক্তির চিন্তা করতে হচ্ছে বিএনপিকে।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্ত করার চেষ্টা আগেও হয়েছিল। বিএনপির বন্ধুপ্রতিম কূটনীতিকদের মধ্যস্থতায় আলোচনা কিছুদূর এগিয়েছিল। কিন্তু লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী অংশের নিরবতায় সে আলোচনার পালে হাওয়া লাগেনি। তবে এবার উপায় না দেখে খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্ত করার আলোচনা চলছে সরকারের সঙ্গে। গোপন এই আলোচনার শর্ত অনুযায়ী, মুক্তি পাওয়ার পর বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেবেন খালেদা জিয়া। এক্ষেত্রে তার সৌদি আরবে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সর্বশেষ গত ৩১ জুলাই উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর চরম হতাশ হয়ে বিএনপি হাইকমান্ড প্যারোলে মুক্তির চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করে।
সূত্র জানিয়েছে, প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আগামী সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবর মাসে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছেন খালেদা জিয়া। সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। প্যারোল পেলে সুবিধাজনক সময়ে খালেদা জিয়া বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাবেন। তিনি এর আগেও সৌদি আরবের হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সব ঠিক থাকলে এবারও তিনি চিকিৎসা নিতে সেখানে যেতে পারেন।
অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার প্যারোলের বিষয়ে সরকার শুরু থেকে আন্তরিক ছিল। রাজনৈতিক লাভ-তির হিসাব করে এ আলোচনায় বিলম্ব করেছে বিএনপি। তবে নিজেদের য়িষ্ণু রাজনৈতিক সমতার ওপর আর ভরসা না রেখে দলীয় প্রধানের উন্নত চিকিৎসার জন্য এবার প্যারোলের আবেদন করতে পারে দলটি।
সাংগঠনিক দুর্বলতা ও দলীয় কোন্দলের কারণে মাঠের রাজনীতিতে সুবিধা করতে না পেরে খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুতে রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে বিএনপিও এখন অনেকটা নমনীয়। তাছাড়া দীর্ঘদিন কারাবাসের কারণে খালেদা জিয়ার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে। তাই এখন যেকোনো কিছুর বিনিময়ে তাঁর মুক্তির কথা ভাবছে দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীরা।
উল্লেখ্য, এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার লন্ডন সফরে বেশ কয়েকবার প্রতিবাদ ও বিােভের মুখে পড়েছিলেন। এর পেছনে ছিল লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এ জন্য প্রতিবারই একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম হতো। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লম্বা সফরে লন্ডন অবস্থান করেছেন। সেখানে ইউরোপের রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে সম্মেলন করেছেন। দেশের কয়েকটি অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়েছেন। তিনি সেখানে চোখের চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু আগের মতো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে তাঁকে পড়তে হয়নি। মূলত মায়ের প্যারোলের জন্যই তারেক রহমান এবার আর ‘ভুল’ পথে যাননি।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনে অবস্থান করছেন। তার নির্দেশেই প্রবাসী বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমনে এর আগে বেশ কয়েকবার প্রতিবাদ করেছেন। কালো পতাকা দেখিয়েছেন। কিন্তু এবার সেখানে কোনো প্রতিবাদ হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারটি চলতি বছরের শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল। বিশেষত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করার পর; যখন বিএনপি পুরোপুরি ধরাশায়ী। দলটি খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে আসছিল। সরকারও রাজি ছিল খালেদা জিয়ার বিদেশ গমনের ব্যাপারে। কিন্তু বাধ সাধে বিএনপির ঢাকা ও লন্ডনের দ্বিমুখী সিদ্ধান্ত। বিষয়টি খালেদা জিয়া নিজেও জানেন। বেশ কিছু দেশের কূটনীতিকরাও খালেদা জিয়ার প্যারোলের বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছেন।
কূটনীতিকদের পরামর্শ অনুযায়ীই বিএনপি সংসদে ফিরেছে এবং গঠনমূলক রাজনীতির অংশ হিসেবে বিএনপি মহাসচিব বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ করছেন।
সূত্র বলছে, সমঝোতা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। মেডিকেল বোর্ডে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক; খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ডা. মামুনকেও রাখা হয়েছে। এখান থেকেই আইনি প্রক্রিয়া সেরে মেডিকেল বোর্ডের সার্টিফিকেট ও স্থানান্তরের সুপারিশ নিয়েই খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানো হতে পারে।
জানা গেছে, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই খালেদা জিয়ার চিকিৎসা বিশেষায়িত হাসপাতালে করানোর দাবি করে আসছে। কিন্তু কারাবিধি অনুযায়ী তাকে সরকারি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় হাসপাতালের কেবিনে ভর্তি করা হয়। জানা গেছে, খালেদা জিয়ার দাঁত ও জিহ্বার চিকিৎসা বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে ভালোভাবে সম্পন্ন হলেও তার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এর প্রভাবে তিনি যেকোনো সময় আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন। এ বিষয়টি আমলে নিয়েই বিএনপি খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির দিকে আগাচ্ছে।
সূত্র জানায়, বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ নেয়ার সময় থেকেই খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি সামনে চলে আসে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের ধারণা, আইনি প্রক্রিয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি আরও বিলম্বিত হতে পারে। আর বিএনপির ভঙ্গুর সাংগঠনিক অবস্থায় রাজপথের কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা কঠিন। সরকার প থেকে বারবার বলা হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়াতেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে, আন্দোলন করে মুক্ত করা যাবে না।
সর্বশেষ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন নামঞ্জুর হলে এই ধারণাই পাকাপোক্ত হয় যে, এভাবে মুক্তি মিলবে না।
খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে সরকার প্রথম থেকেই ইতিবাচক – এমন মন্তব্য আওয়ামী লীগ নেতাদের। তাদের ভাষ্যে, বিএনপির সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই খালেদা জিয়ার প্যারোল মেলেনি এখনও। এর আগে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বিএনপি চাইলে বিদেশে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছিলেন, বিএনপি প্যারোলে মুক্তির আবেদন করলে সরকার বিবেচনা করবে।
তখন বিএনপি সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল। এখন তারা আবারও বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
জেলকোড অনুযায়ী প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। সরকার ইচ্ছা করলে কাউকে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্যারোলে মুক্তি দিতে পারে। এর আগে সেনাসমর্থিত সরকারের সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। মুক্তি দেয়ার েেত্র প্রথমে সময় বেঁধে দেয়া হয়। পরে প্রয়োজনে তা বৃদ্ধি করা যায়।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা বলছেন, আন্দোলন করে সরকারের ওপর ন্যূনতম রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এই মুহূর্তে বিএনপির পে অসম্ভব। এটি বিএনপিও জানে। তাই সরকারের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তিতে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য প্যারোলে আবেদন করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। আর বিএনপিও এখন তা মনে করছে এবং খালেদা জিয়ার প্যারোলের বিষয়টি নিয়ে সরকারের সাথে পর্দার অন্তরালে আলাপ-আলোচনা চলছে!