ফিচার

ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বাংলাদেশের পর্যটন খাত

সাদেক মাহাবুব চৌধুরী
পর্যটনকে বলা হয় ‘অদৃশ্য রপ্তানি পণ্য’। এখানে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও আয়ের কোনো সীমা নেই। মেক্সিকো ও ইন্দোনেশিয়ার মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬০ ভাগ আসে পর্যটন খাত থেকে। গত বছর বিশ্বের মোট কর্মসংস্থানের ৯ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল পর্যটন খাত। পর্যটনের বিকাশ ঘটিয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, তিউনিসিয়ার মতো অনেক দেশ বেকারত্ব দূর ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করতে সমর্থ হয়েছে। অথচ বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এ খাতে এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। তাই পর্যটন খাতের উন্নয়ন জরুরি।
বিশ্বের অন্যতম পর্যটনবান্ধব দেশ হয়েও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পে প্রায় তলানিতে পড়ে আছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ভ্রমণ ও পর্যটন প্রতিযোগী সক্ষমতা প্রতিবেদন-২০১৭ অনুযায়ী ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে ২০১০ সালে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড-বিটিবি প্রতিষ্ঠা করা হলেও ৯ বছরে পর্যটন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দিবসে র‌্যালি ও সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) ২০১১ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বের মোট জিডিপির ১০ দশমিক ৪ শতাংশ আসে ভ্রমণ ও পর্যটন খাত থেকে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এ খাতের অবদান ছিল ২ হাজার ৯৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা সমগ্র অর্থনীতির ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। পর্যটনে কর্মসংস্থান ছিল ১৭৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন, যা মোট কর্মসংস্থানের ৯ দশমিক ৩ ভাগ। ৫ বছরে প্রতি ৫টি নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে পর্যটন খাতে। এ অঞ্চলে ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটন খাতে করা খরচ ৫২৯ বিলিয়ন ডলার, যা পুরো রপ্তানি আয়ের ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ৮১ ভাগ ভ্রমণ করেন অবসর কাটাতে, বাকিরা ব্যবসায়িক কাজে।
বাংলাদেশ সম্পর্কে ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে ২০১৭ সালে বৈশ্বিক জিডিপির ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে পর্যটন থেকে, যেখানে বাংলাদেশে এই খাতে অবদান ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ। বিশ্বের মোট কর্মসংস্থানের ৯ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল পর্যটন খাতে। যেখানে বাংলাদেশে ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ।
এদিকে ২০১৭ সালে বিদেশি পর্যটক থেকে থাইল্যান্ড আয় করে ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের আয় ছিল মাত্র দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। বিদেশি পর্যটক থেকে ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের আয়ও ছিল বাংলাদেশের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পর্যটন বোর্ডে পাঠানো হিসাবে গত বছর বিদেশি পর্যটক থেকে বাংলাদেশের আয় দশমিক ০২ শতাংশের মতো বেড়েছে।
এদিকে পর্যটন খাতকে শক্তিশালী করতে ৩ বছর আগে ট্যুরিজম বোর্ড প্রতি বছর পর্যটক সংখ্যা ১৫ শতাংশ হারে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও সংস্থাটির কাছেই নেই বিদেশি পর্যটক আসা-যাওয়ার কোনো পরিসংখ্যান। নেই হোটেল-মোটেলের হিসাব। ঠিক কত মানুষ পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত তাও জানে না সংস্থাটি।
এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটনে অনেক সেক্টর জড়িত। পর্যটক টানতে স্পট, যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সহজ করতে হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
এ খাত সংশ্লিষ্ট অনেকেরই মতে, বাংলাদেশে শুধু পর্যটনের বিকাশ ঘটিয়েই দেশকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির পাশাপাশি অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব। অফুরন্ত সম্ভাবনা থাকার পরও দক্ষ মানবসম্পদ ও পরিকল্পনার অভাবে বাংলাদেশে পর্যটনের বিকাশ হচ্ছে না। এই খাতটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় সঠিকভাবে সামনে এগোতে পারছে না। এখনও পর্যটন নিয়ে কোনো মাস্টার প্ল্যান হয়নি। পর্যটনের উন্নয়নে সঠিক জায়গায় সঠিক লোক নেই। পর্যটন বোর্ড ও পর্যটন করপোরেশন যারা এ নিয়ে কাজ করে, তাদের এই খাতটি নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই, গবেষণাও নেই। পর্যটন নিয়ে যারা পড়াশোনা ও গবেষণা করেছেন তাদের এই খাতে যোগ করতে পারলে ভালো হতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগ থেকে ৬টি ব্যাচ বের হয়েছে, কিন্তু পর্যটন খাতে ক্যারিয়ার প্ল্যান না হওয়ায় তারা এ সেক্টরে ঢুকতে পারছে না, অথচ লাখ টাকা বেতন দিয়ে শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া থেকে লোক এনে এখানে হোটেল চালানো হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন না থাকায় এখানকার ছেলেমেয়েরা সে সুযোগ পাচ্ছে না।
পর্যটন খাতে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। অবিলম্বে এটি প্রণয়ন করা উচিত। অনলাইনে বাংলাদেশকে নিয়ে প্রচার করা উচিত সরকারের। গাইডদের প্রশিক্ষণ জরুরি। বিদেশিদের আকৃষ্ট করার জন্য বিদেশি ভাষা জানাটা জরুরি।
প্রাচীনকালে এই বাংলায় এসেছেন ইবনে বতুতা, হিউয়েন সাং, ফা হিয়েনের মতো বিখ্যাত পর্যটক। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়নের সাথে তাল মিলিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশের পর্যটক খাত বেহাল অবস্থায় আছে। এমতাবস্থায়, এ খাতের উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশের দৃশ্যমান অগ্রগতি হচ্ছে, তাই অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগছে, কেন পিছিয়ে থাকবে এদেশের পর্যটন খাত। উন্নয়নের অন্যান্য সূচকের সাথে সমান তালে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের পর্যটন খাতও Ñ এমনটিই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।