কলাম

জাতির পিতার হত্যাকা-ের নীলনকশা প্রণয়নকারীদের শ্বেতপত্র প্রকাশ করুন

ড. এম এ মাননান
আগস্টের সে দিনটি বাংলাদেশের রাজধানীতে নামিয়ে এনেছিল চাঁদের কলঙ্ক। কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পায়নি রাজধানীবাসী। হঠাৎ বেতারে ভেসে এলো আতঙ্কজনক অভাবিত একটি দুঃসংবাদ; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার খবর।
বেতারের খবর শোনামাত্রই হতভম্ব আমরা কয়েকজন বাড়ি থেকে বের হয়ে পশ্চিম রাজাবাজারের রাস্তায় এলাম। দেখি, অনেক লোকজনের ভীতসন্ত্রস্ত পদচারণা। এগিয়ে গেলাম শুক্রাবাদের দিকে। মিরপুর রোডে ওঠামাত্রই চোখে পড়ে আর্মিবেষ্টিত ট্যাংকের বহর, ৩২ নম্বর রোডের মাথায়। ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে মূল রাস্তায়। চলে গেলাম পাশ দিয়ে হেঁটে কলাবাগানের দিকে, দাঁড়ালাম কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারের সামনের রাস্তায়, মিরপুর রোডে, অনেক লোকের সঙ্গে। কাউকে চিনি না। হাজারো মানুষ সারা রাস্তায়। সবার চোখে-মুখে আতঙ্ক, মেঘের ছায়া চেহারায়। টু শব্দটি নেই কারও মুখে। এত লোকের সমাগম অথচ কোনো শব্দ নেই। ভাবা যায় না। কেউ কেউ ফিসফিস করে পাশের জনের সঙ্গে কথা বলছে আবার আশপাশে ভীত নয়নে তাকিয়ে দেখছে। দুপুরবেলা পর্যন্ত থেকে চলে গেলাম বাসায়। আমার যাওয়ার কথা ছিল টিএসসিতে, যেখানে যাওয়ার কথা ছিল বঙ্গবন্ধুর। আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল তিনি সেদিন সকাল ৯টার দিকে টিএসসিতে ভাষণ দেবেন; বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে ঘোষণা দেবেন, দেবেন বিশেষ মর্যাদা। এমনটাই শোনা যাচ্ছিল কয়েকদিন ধরে ক্যাম্পাসে। অথচ হঠাৎ আকাশ ভেঙে পড়ল ঢাকার বুকে। বিকেলের দিকে রাস্তায় নেমে পড়ল ট্যাংকবহর নিয়ে সেনারা।
বাসায় এসে ভাবছিলাম, কারা এ হত্যাকা-টি ঘটাল। কেন ঘটাল? কারা এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করল? যে মানুষটি মৃত্যুর গহ্বর থেকে ফিরে এসে শক্ত হাতে দেশের বৈঠা ধরেছেন, তাকে কেন সপরিবার নিঃশেষ করে দিল? কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না।
কয়েক মাস ধরেই রাজনীতির মাঠে টালমাটাল একটা ভাব দেখা যাচ্ছিল। ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার পর বঙ্গবন্ধু মাত্র সময় পেয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ দিন। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ভেঙে দু’ভাগ হয়ে গেল Ñ একটি গ্রুপ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নাম ধারণ করল। এই সেই জাসদ, যার সক্রিয় উদ্যোক্তা সদস্যরা সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা শুরু করে দিল। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের চারু মজুমদারের কর্মকা-ের আদলে সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশে তথাকথিত সর্বহারা দলের নামে শুরু হয় অরাজকতা, নাশকতা, লুটপাট আর সন্ত্রাসী কর্মকা-। বিদেশ থেকে প্রাপ্ত রিলিফের খাদ্যসামগ্রী গুদামজাত করে দেশবিরোধী অপশক্তি তৈরী করে কৃত্রিম আকাল। ফলে মারা যায় অনেক মানুষ। তারা চাচ্ছিল মানুষ মারা যাক, দুর্ভি শিকড় গেড়ে বসুক, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাক বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনিক সাম্রাজ্য। তখনকার খাদ্য সচিব আবদুল মোমেন খান (আগাগোড়া পাকিস্তানদরদি) নেপথ্যের নায়ক হিসেবে কাজ করে। শুনেছি তার চক্রান্তে আমেরিকা থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে আসা জাহাজ মাঝপথে এসে ফিরে যায়। নারীরা লজ্জা নিবারণ করার কাপড়ও পাচ্ছে না এমন ধারণা দিয়ে সরকারের সুনাম বিনষ্ট করার ল্েয রংপুরের একজন বাকপ্রতিবন্ধী নারীর গায়ে মাছ ধরার জাল জড়িয়ে দিয়ে তৈরি করা হয় ‘জাল-বাসন্তী’, অপপ্রচার করা হয় জার্মানির হিটলারের কুখ্যাত প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলসের মডেলে। আমরা জানতাম, তখনও বেশিরভাগ রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও পাবলিক প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে আসীন ছিল পাকিস্তানের লেজুড়রা। তারা কেন পাকিস্তানের প্রধান শত্রু বঙ্গবন্ধুকে সাহায্য করবে? এমনি বহু ধরনের চিন্তাভাবনা মাথায় খেলতে লাগল। মনের গহিনে একটা পাথরের মতো বোঝা নিয়ে উঠে পড়লাম। প্রচ- অস্বস্তির মধ্যে রাত নেমে এলো। একসময় বিধ্বস্ত দেহ নিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসছিল না। মনে পড়তে লাগল অনেক কথা, অনেক বিষয়।
রাওয়ালপিন্ডির জল্লাদদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে নিজ ভূমে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব নিলেন একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের, যে দেশের বুকের পাঁজরটা ভেঙে দিয়ে গেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সারাদেশে ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, তুলে ফেলা রেলপথ, পুড়িয়ে দেয়া জাহাজ-নৌকা-লঞ্চ, পাকিস্তানিদের স্থাপিত মাইনের কারণে ব্যবহারের অযোগ্য চট্টগ্রাম আর মোংলা সমুদ্রবন্দর, অকেজো ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর। ফিরে এসেছে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী ১ কোটি শরণার্থী, যাদের পেটে আগ্রাসী ক্ষুধা আর পরনে ছেঁড়া পোশাক, যাদের নেই থাকার গৃহ, সব রাজাকার বাহিনীর আগুনে পুড়ে ছাই। কোটির ওপর আশ্রয়হারা মানুষ আর স্বদেশে মাটি কামড়ে পড়ে থাকা মানুষগুলোকে পুনর্বাসন করাসহ অকল্পনীয় দায়িত্ব মাথায় নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার কাঁধে তুলে নিলেন বঙ্গবন্ধু। আর তাকে কিনা শেষ করে দিল কাপুরুষরা! এরা কারা? তখনকার অবস্থায় বুঝে ওঠা আমার পে সম্ভব ছিল না। বয়স কম। ভারত সীমান্তের কাছাকাছি গ্রাম থেকে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ চুকিয়ে সবে শিক হিসেবে যোগদান করেছি। এমন সময় এমন অকল্পনীয় ঘটনাটি ঘটল।
পরে জেনেছি, এর পেছনে ছিল গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, যার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল দেশীয় কতিপয় মতালোভী পাকিস্তানিদের চর ও স্বাধীনতাবিরোধী। একদিকে জামায়াত নেতা গোলাম আযমের লন্ডনে বসে চক্রান্তের জাল বোনা, আরেক দিকে আগে থেকেই স্বাধীনতার বিপে অবস্থানকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বঙ্গোপসাগরে পাঠানো যুদ্ধজাহাজ ‘সপ্তম নৌবহর’। জাতিসংঘে চীনের একাধিকবার ভেটো যাতে নবসৃষ্ট বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি সদস্যপদ না পায়। চারদিক থেকে হুমকি আর হুমকি। দেশের ভেতরেও ঘরের শত্রু বিভীষণরা সক্রিয়। মুজিবনগর সরকারের আমল থেকেই ধূরন্ধর মোশতাক গং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনসহ বঙ্গবন্ধুর কাছের জনদের দূরে সরিয়ে দিয়ে চলে আসে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে। সঙ্গে সহযোগী ছিল প্রশাসনে থাকা পাকিস্তানি ভাবধারায় বিধৌত উচ্চপর্যায়ের আমলা-প্রশাসকরা। মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)-এর একটি নিবন্ধ থেকে জানতে পারিÑ ‘প্রশাসনে শতকরা নব্বই ভাগ কর্মকর্তা ছিলেন তারাই, যারা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় একই পদে বসে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সব অপকর্মের সহযোগী হয়েছেন। … ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়, তখন রাষ্ট্রের প্রশাসনসহ প্রধান প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পদে কর্মরত ছিলেন ওই সব কর্মকর্তা, যারা ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দালালি করেছেন, আর নয়তো সেই সব কর্মকর্তা যারা পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলেন। সুতরাং যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।’
দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা যে নির্লজ্জ, জঘন্যতম হত্যাকা- ঘটিয়ে সারা ‘উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলের মহানায়ক’ আর মানবকেন্দ্রিক উন্নয়নের সারথিকে সরিয়ে দিয়ে কুলাঙ্গারের কাজটি করেছে, তা দেশকে বিশাল অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাদের সৃষ্ট অনিশ্চয়তা থেকে দেশকে উদ্ধার করেছেন, দেশবাসীকে খাদের কিনারা থেকে সরিয়ে এনে উন্নয়নের রাস্তায় দাঁড় করিয়েছেন, আর একটি উন্নত দেশের স্বপ্ন সৃষ্টি করে সবাইকে নিয়ে একযোগে এগিয়ে যাচ্ছেন। উন্নয়নকে টেকসই করার জন্য এখনও সক্রিয় স্বাধীনতাবিরোধীদের অব্যাহত চক্রান্ত চিরতরে নির্মূল করার প্রয়োজনেই দরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের নেপথ্যের খলনায়কদের, হত্যার নীলনকশা প্রণয়নকারীদের স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। তা করবে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপরে সরকার। এ শ্বেতপত্রে থাকতে হবে কারা এ নির্মম হত্যাকা-ের কুশীলব ছিল; ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে হত্যাকা-ের বিচার করার পথ কেন রুদ্ধ করা হয়েছিল এবং অধ্যাদেশ জারির পেছনে কারা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল; লন্ডনে স্যার টমাস উইলিয়ামসের (যিনি ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিশেষজ্ঞ আইনজীবী ছিলেন) নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের তদন্তের জন্য ‘শেখ মুজিব মার্ডার ইনকোয়ারি’ নামক যে তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছিল, সে কমিটির অগ্রগতি সম্পর্কিত তথ্যাদি; তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে উইলিয়ামস যখন দেখা করেছিলেন, তখন জিয়াউর রহমান তাকে ‘আইন নিজস্ব গতিতে চলবে’ বলার পরও আইন কেন নিজস্ব গতিতে চলতে পারেনি; দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বিচারের পথ কেন রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল; জিয়ার আশ্বাস বাস্তবে পরিণত না হওয়ার পেছনে কী কারণ ছিল; হত্যাকা-ের তদন্ত কমিশনের আরও দুজন সদস্য আইনজীবী অব্রে রোজ ও জেফ্রি টমাসকে কেন ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সফর করার অনুমতি দেয়া হয়নি; কেন টমাস উইলিয়ামসকে বাংলাদেশ সরকার সে সময় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে; ওই তদন্ত কমিশন লন্ডনে বসেই যে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে যে তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়, যেমন ‘আইন ও বিচারকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া হয়নি, আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে না দেয়ার জন্য সরকারই দায়ী এবং দায়মুক্তির বিধান তুলে নিয়ে বিচারের পথ উন্মুক্ত করতে হবে’Ñ এ বিষয়গুলো সম্পর্কিত তথ্যাদি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি।
সপরিবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পেছনে যারা নীলনকশা প্রণয়ন করেছিল, তারা কেন এখনও অধরা, তাদের ব্যাপারে কেন দেশবাসী জানতে পারছে না, তাদের ব্যাপারে কেন সরকার শ্বেতপত্র তৈরি করে জনসমে প্রকাশ করছে না। এ বিষয়গুলোর সুরাহা করার সময় এসেছে। জনগণ হত্যাকা-ের কুশীলবদের সম্পর্কে জানতে চায়। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানোর জন্য, তাদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম, জাতির প্রতি ভালোবাসার বিষয়গুলো সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেয়ার ল্েয জাতি প্রত্যাশা করে একটি বিস্তারিত তথ্যসমৃদ্ধ শ্বেতপত্র। আমরা বঙ্গবন্ধুকন্যার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের কাছ থেকে সেই শ্বেতপত্রের প্রত্যাশায় থাকলাম।
লেখক: উপাচার্য
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়