প্রতিবেদন

জাতীয় শোক দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী : জাতির পিতার রক্তের ঋণ শোধ করতে শেখ হাসিনার অঙ্গীকার

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলে তার রক্তের ঋণ শোধ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, এদেশের মানুষকে মুক্তি, স্বাধীনতা ও উন্নত জীবন দিতে বঙ্গবন্ধু আজীবন কষ্ট করে গেছেন। দেশের মানুষের জন্য নিজের বুকের রক্ত দিয়ে গেছেন। জাতির পিতার এই রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে। আজকের দিনে এই প্রতিজ্ঞাই আমরা করি যে, পিতা (বঙ্গবন্ধু) তোমাকে কথা দিলাম, তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলব। এটাই আমাদের অঙ্গীকার।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলে গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের যোগাযোগ ছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা সাাৎকার দিয়ে বলেছিল যে, তারা জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে ইশারা পেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর অবৈধভাবে মতা দখল করে খুনি মোশতাক প্রথমেই জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করেছিল। তখন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের এমন মনোভাব ছিল যে তাদের কিছুই হবে না। এ থেকে স্পষ্ট যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সঙ্গে জিয়াউর রহমান জড়িত।
স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক নেতারা যদি তৎকালীন পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারতেন, তাহলে হয়ত জাতির জীবনে ১৫ আগস্টের আঘাত আসত না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের বিশাল কর্মযজ্ঞ একদিকে, অপরদিকে একটি দেশ, যে দেশটি ছিল পাকিস্তান নামের একটি দেশের একটা প্রদেশ। একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার কঠিন কাজ মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে তিনি (বঙ্গবন্ধু) করে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রতিশোধ নিতেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেষ কথা বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে বুকের রক্ত দেব’। আর সেই রক্তই তিনি দিয়ে গেছেন। আমাদের সেই রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে তাঁর স্বপ্ন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে।
বঙ্গবন্ধুর খুনিরা অনেকেই জাতির পিতার বাসভবনে যাতায়াত করত উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, দুঃখের বিষয়, এই হত্যাকা-ের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা তো চেনা। দিন-রাত আমাদের বাড়িতেই যারা ঘোরাঘুরি করত, তারাই তো সেই খুনি রূপে এলো।
শেখ হাসিনা বলেন, যারা বাসায় আসত, তাদের অনেকেই এই হত্যাকা-টা চালাল। খুনি মোস্তাক তো মন্ত্রী ছিল। পরবর্তীকালে অনেক চেহারা আপনারা দেখেছেন, যারা বিএনপিতে যোগ দিয়েছে। অনেকে বড় বড় নীতির কথা এখন বক্তৃতায় শোনায়, তারা কী ছিল? তারা কি এই সমস্ত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিল না? তারা ভেবেছিল, এভাবেই বোধহয় মতায় টিকে থাকতে পারবে। তারা মতায় টেকেনি।
তিনি বলেন, খুনি মোস্তাক সংবিধান লঙ্ঘন করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পরপরই জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করল।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, জিয়াউর রহমান কিভাবে খুনি মোশতাকের এত বিশ্বস্ত হলো যে তাকেই (জিয়া) সেনাপ্রধান করল? সেটা খুনি কর্নেল ফারুক-রশীদ বিবিসিতে যে ইন্টারভিউ দিয়েছিল, সেই ইন্টারভিউ থেকেই সবাই জানতে পারেন। খুনিরা যে জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে এবং জিয়ার কাছ থেকে তারা ইশারা পেয়েছে এবং জিয়া যে তাদের আশ্বস্ত করেছে, এগুলো করলে পরে সমর্থন পাবে- সেটা তো আত্মস্বীকৃত খুনিরা নিজেরাই বলে গেছে। এরা কারা ছিল? এরা কি স্বাধীনতা চেয়েছিল? এরা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করত? তারা তা কখনোই করত না বলেই এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সংবিধান ও সামরিক আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে মতা দখল করে জিয়াউর রহমান। বন্দুকের নলের জোরে রাষ্ট্রপতি সায়েমকে সরিয়ে দিয়ে সে মতা দখল করে। অবৈধভাবে মতায় এসে জেনারেল জিয়া হ্যাঁ/না ভোটের আয়োজন করে। এরপর সে রাজনৈতিক দল গঠন করে।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নীতি অনুসরণ করেই দেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। জাতির পিতা বেঁচে থাকলে দেশকে উন্নত করতে এত সময় লাগত না। বঙ্গবন্ধু যদি আর মাত্র ছয়-সাতটি বছর দেশসেবার সুযোগ পেতেন, তবে অনেক আগেই বাংলাদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ হতো, দেশের মানুষকে দীর্ঘ ২১ বছরের হত্যা-ক্যু, ষড়যন্ত্র, হত্যা-নির্যাতনের মতো দুঃশাসন ভোগ করতে হতো না।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের অগ্রযাত্রার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাত্র ১০ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নে সারা বিশ্বই বিস্ময় প্রকাশ করেছে। অকান্ত পরিশ্রম করে আমরা দেশকে একটা সম্মানের জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছি। প্রবৃদ্ধি অর্জনে পৃথিবীর হাতেগোনা যে কয়েকটি দেশ সাফল্য অর্জন করেছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে আজ উল্লেখযোগ্য। মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের হার কমিয়ে এনেছি। দেশের মানুষের আজ খাদ্যের কোনো অভাব নেই। এত অল্প সময়ে বাংলাদেশের এত উন্নয়ন দেখে বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোও বিস্ময় প্রকাশ করেছে। নীতি ও আদর্শ নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করলে দেশের যে উন্নয়ন করা যায়, আমরা তা প্রমাণ করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৫ আগস্টের পর অবৈধভাবে মতা দখলকারীরা বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-কে একটি পরিবারের হত্যাকা- হিসেবে দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা এবং পরবর্তী নানা ঘটনা গোটা বিশ্বের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়, ১৫ আগস্টের হত্যাকা- একটি পরিবারের হত্যাকা- নয়, এই হত্যাকা- বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে ধূলিসাৎ করে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, আবদুল মতিন খসরু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় সদস্য আজমত উল্লাহ খান, ঢাকা মহানগর দণি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, উত্তরের সহসভাপতি শেখ বজলুর রহমান। সভা পরিচালনা করেন দলের প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।
সভার শুরুতে ১৫ আগস্ট শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।