প্রতিবেদন

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শতাধিক দেশে: প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের তাগিদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

স্বদেশ খবর ডেস্ক
বাংলাদেশে এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ পর্যায়ে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু আরো প্রাণঘাতী। তবে শুধু বাংলাদেশই নয়- এশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ মিলিয়ে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হারের দিক থেকে সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতি চলছে ব্রাজিল ও ফিলিপাইনে।
এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা, চিকিৎসা – ডেঙ্গু আক্রান্ত দেশগুলোতে এমন উদ্যোগের খবরই মিলছে। সরকারগুলোও ব্যস্ত ডেঙ্গু প্রতিরোধের কাজে। এর মধ্যে কম্বোডিয়াসহ কয়েকটি দেশে স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক জরুরি অবস্থাও জারি করা হয়েছে। এসব দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও ডেঙ্গু বিষয়ে খুব একটা আলাদা কিছু নেই। শুধু ছোটখাটো কিছু প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনায় নতুনত্বের খবর মিলছে উন্নত দেশগুলো থেকে। ডেঙ্গু পরিস্থিতির নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও নজরদারি রয়েছে তাদের কাঠামোর মধ্য থেকেই। যদিও সেই কাঠামো অনুসারে দেশে দেশে ডেঙ্গুর এমন পরিস্থিতিতে উচ্চতর বিপদের আশঙ্কার কথা এখনও বলছে না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আক্রান্ত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বা তাদের গবেষণার ফল পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় এবং যৌথ উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার তথ্য অনুসারে, এ বছর শুরু থেকেই মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, এমনকি ফ্রান্সের একটি এলাকায়ও ডেঙ্গু জ্বরে মৃতের সংখ্যা উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সিডিসি আটলান্টাসহ আরো একাধিক সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ডেঙ্গু নিয়ে বিশ্বজুড়ে এমন অবস্থা চললেও অন্য অনেক রোগের মতো ডেঙ্গু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল ফোকাসের জায়গায় গুরুত্ব পায়নি। সংস্থাটি শুধু ভেক্টর বর্ন ডিজিজের আওতায় ডেঙ্গুকে তুলে ধরেছে অনেকটা সাধারণ ক্যাটাগরির রোগ হিসেবেই, যদিও তারা ডেঙ্গুর ব্যাপারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ ও নিয়ন্ত্রণে গাইডলাইন করে নিজ নিজ রাষ্ট্রকে নিজেদের মতো করে ব্যবস্থাপনায় নজর দেয়ার তাগিদ দিয়েছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) সাবেক অধ্যাপক ডা. বেনজীর বলেন, ডেঙ্গুর বাহক মশার উপদ্রব বৃদ্ধির পেছনে আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে ট্রপিক্যাল অঞ্চলে এর বিস্তার খুবই বেশি।
তিনি বলেন, শুধু দণি আমেরিকা অঞ্চলই নয়, এবার ইউরোপের কয়েকটি দেশেও ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। দণি-পূর্ব এশিয়ায় এবারের মতো এত ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু আগে দেখা যায়নি।
রোগবিজ্ঞানী ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অন্যতম উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাবলিক হেলথ রেগুলেশন অনুসারে এখন চারটি রোগের েেত্র বেশি নজরদারি রাখা হয়। বিশেষ করে স্মল পক্স, পোলিও, সার্স ও নতুন ধরনের যেকোনো ইনফুয়েঞ্জার দিকেই বেশি নজর দেয়া হয়। অন্যদিকে কোনো রোগ এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়ে ট্রেড বা ট্রাভেলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় কি না, সেটাও বিবেচনায় রাখা হয়। এছাড়া সাধারণত যে রোগ মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় সেই রোগের ভয়াবহতা ও ব্যাপ্তি যখন বেশি হয় তখনই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে হেলথ ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়। যেমন এবোলা কিংবা পোলিওর েেত্র এমনটি হয়েছে। কিন্তু ডেঙ্গু এখন বিশ্বব্যাপী থাকলেও তা প্রতিরোধের উপায় রয়েছে। এ ছাড়া এ রোগ মানুষবাহিতও নয়।
ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সিস অব ইন্টারন্যাশাল কনসার্নের (পিএইচইআইসি) প্রটোকল অনুসারে চারটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটাগরির আওতায় পড়ে না ডেঙ্গু। ফলে বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকলেও তা পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সিস অব ইন্টারন্যাশনাল কনসার্নের আওতায় আসেনি। একই কারণে এটাকে কোনো দেশের জন্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি বলেও ঘোষণা করেনি। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসাব্যবস্থাপনার েেত্র সব সময়ই সব রাষ্ট্রকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সার্বিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফোরা বলেন, আমাদের দেশের মানুষ এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়েœ যৌক্তিকভাবেই বেশি উদ্বিগ। এর সঙ্গে মানুষের মধ্যে আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশও ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা যেমন অন্য দেশগুলোর ব্যবস্থাপনা পর্যবেণ করছি, অন্য অনেক দেশও আমাদের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, উন্নত কিছু দেশে কারিগরি কিছু ব্যবধান ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কাঠামো একই ধরনের। তবে এবার যেহেতু আমাদের দেশে পরিস্থিতি অনেকটা ভিন্ন, ডেঙ্গুর ধরনেও পরিবর্তন এসেছে, তাই আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আরো কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে নিয়মিত পরামর্শ নিচ্ছি। পর্যবেণ চলছে নিবিড়ভাবে। আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কেন্দ্রীয় দপ্তরের একাধিক বিশেষজ্ঞকে ঢাকায় নিয়ে এসেছি, যাঁরা বিভিন্নভাবে আমাদের সহযোগিতা দিচ্ছেন। তিনি ডেঙ্গুকে ‘বৈশ্বিক সংকট’ উল্লেখ করে আক্রান্ত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও সাফল্য বিনিময়ের ওপর জোর দেন।