প্রতিবেদন

ডেঙ্গু ঠেকাবে বন্ধ্যা এডিস মশা!

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা বেসরকারি হিসাবে শতাধিক ছাড়িয়েছে। এমতাবস্থায়, ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশা নির্মূলে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। দেশের সকল সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্থা ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে।
এরই মধ্যে ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে কার্যকরী এক পদ্ধতি আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন ঢাকার সাভারে অবস্থিত বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা। তারা স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (এসআইটি) পদ্ধতির প্রায়োগিক বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম শেষ করেছেন, যা বিশ্বে ডেঙ্গু বিস্তার রোধে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত। প্রতিষ্ঠানের খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের কীট জীবপ্রযুক্তি বিভাগের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত এ পদ্ধতি শিগগিরই মাঠপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে। এ পদ্ধতিতে পুরুষ মশাকে বিশেষ পদ্ধতিতে বন্ধ্যা করে ছাড়া হয় প্রকৃতিতে। এ মশার সঙ্গে মিলনের ফলে স্ত্রী মশা ডিম পাড়লেও তা নিষিক্ত হয় না। এভাবে বাহকের সংখ্যা কমায় ডেঙ্গুর ভয়াবহতাও হ্রাস পায়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান গত ৩ আগস্ট সাভার উপজেলার আশুলিয়ার গণকবাড়ী এলাকায় অবস্থিত পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এসআইটি পদ্ধতিটির বিভিন্ন কারিগরি দিক সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। বিজ্ঞানীরা মন্ত্রীকে এসআইটি পদ্ধতির প্রায়োগিক গবেষণা কার্যক্রমের ফলাফল জানান। মন্ত্রী শিগগিরই এ পদ্ধতিটি মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ এবং এ কাজে মন্ত্রণালয়ের প থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা মন্ত্রীকে জানান, স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (এসআইটি) পদ্ধতিতে পুরুষ এডিস মশাকে গামা রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে বন্ধ্যা করা হয়। পরে পুরুষ এডিস মশাকে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব রয়েছে এমন এলাকায় অবমুক্ত করা হলে তা স্ত্রী এডিস মশার সঙ্গে মিলিত হবে, কিন্তু স্ত্রী এডিস মশা যে ডিম/লার্ভা নির্গত করবে তা থেকে এডিস মশার বংশ বিস্তার হবে না। ওই ডিম/লার্ভা নিষিক্ত না হলে মশার সংখ্যা কমে যেতে থাকবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এটি অত্যন্ত কার্যকর এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি বলে জানান বিজ্ঞানীরা। তাছাড়া এটি একটি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। পরিবেশে এর কোনো বিরূপ প্রভাব নেই। এ পদ্ধতিতে শুধু বন্ধ্যা পুরুষ মশাই প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হবে। যেহেতু পুরুষ মশা ডেঙ্গুর জীবাণু বহনে অম, তাই এর মাধ্যমে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটার কোনো আশঙ্কা নেই। এছাড়া পুরুষ এডিস মশা মানুষকে কামড়ায়ও না। তাই এ পদ্ধতিটি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেও আশা প্রকাশ করেন বিজ্ঞানীরা।
প্রতিষ্ঠানের কীট জীবপ্রযুক্তি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজল শেহেলী জানান, গবেষণাটি এখন ল্যাব পর্যায়ে রয়েছে। এটি বড় পরিসরে করার জন্য শিগগিরই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি চীনে এসআইটি পদ্ধতিটি সফলতা পাওয়ায় বাংলাদেশে এটি প্রয়োগ করার প্রস্তাব এলে তারা এসআইটি পদ্ধতির কার্যক্রম হাতে নেন। পর্যাপ্ত সহযোগিতা পেলে আগামী ৩ বা ৫ বছরের মধ্যে এর সুফল পাওয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান প্রতিষ্ঠানের কীট জীবপ্রযুক্তি বিভাগের এসআইটি পদ্ধতির ল্যাব এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি (এনআইবি) ল্যাব পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক, সদস্য অধ্যাপক ড. মো. সানোয়ার হোসেন, পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক ড. এম আজিজুল হক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির (এনআইবি) মহাপরিচালক ড. মো. সলিমুল্লাহ, এইআরইয়ের বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক, বিভিন্ন স্তরের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ।
সব শেষে মন্ত্রী গণকবাড়ী এলাকায় অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি (এনআইবি) ও জাতীয় জিন ব্যাংক স্থাপন প্রকল্প পরিদর্শন করেন এবং এনআইবির সেমিনারকে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে অংশ নেন। প্রেস ব্রিফিংয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।