প্রতিবেদন

দারিদ্র্যের হার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও কমাতে কাজ করছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ একটা ‘তলাবিহীন ঝুড়িতে’ পরিণত হবে। এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বর্বরতার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছিল দেশটি। সম্প্রতি সেই আমেরিকাকে দারিদ্র্যের একটি সূচকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যথাযথভাবে বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। আমেরিকার নাম উল্লেখ না করলেও দেশটির প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের চেয়ে অন্তত এক শতাংশ হলেও দারিদ্র্য কমাতে হবে, সেটাই আমাদের ল্য।
গত ১৮ আগস্ট শেখ হাসিনা তাঁর অফিসে কর্মরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঈদুল আজহা পরবর্তী ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ উপলক্ষে কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময়কালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প ঠিক করে তা দ্রুত বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়গুলোকে নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যথাযথভাবে বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। আমরা বাজেট দিয়েছি এবং উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছি। কিন্তু তা বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে প্রকল্প অনুযায়ী তাদের কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা একদা বাংলাদেশের স্বাধীনতার শুধু বিরোধিতাই করেনি, তারা বলেছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে একটা বটমলেস বাস্কেট হবে, সেই দেশটির থেকেও আমাদের দারিদ্র্যের হার কমাতে হবে। তাদের চেয়ে অন্তত এক শতাংশ হলেও দারিদ্র্য কমাতে হবে, সেটাই আমাদের ল্য। তারা উন্নত দেশ হতে পারে কিন্তু আমরা যে পারি সেটা আমাদের প্রমাণ করতে হবে।
এর আগে ২৩ জুন এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এই স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেন। রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমিতে ১১০তম, ১১১তম এবং ১১২তম আইন ও প্রশাসন কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও কমিয়ে আনা বর্তমান সরকারের ল্য।
শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে আমরা দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। এটা আরও কমানোর ল্য রয়েছে আমাদের। যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্যের হার ১৭/১৮ শতাংশের মতো। যেকোনো মূল্যে এটা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অন্তত ১ শতাংশ কমাতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১০ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, তখন দেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ৩১ শতাংশ। ২০১৬ সালের জরিপে তা কমে আসে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। ২০১৭ সালে দেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। আর অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ১২ দশমিক ১ শতাংশ।
তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা বিনিময়কালে শেখ হাসিনা বলেন, আমাকে জনগণ ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী করেছে এটা ঠিক, কিন্তু আমি জাতির পিতার কন্যা। কাজেই সেই হিসাবে আমি মনে করি দেশের প্রতি আমার একটা দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। সেখানে প্রটোকলের বাধা আমি কখনও মানি না, মানতেও চাই না। আমি চাই সবার সঙ্গে মিশতে, জানতে এবং কাজ করতে। আমরা সবাই একটা টিম হিসেবে কাজ করব যাতে দেশের উন্নয়নটা ত্বরান্বিত হয়।
দুর্নীতি দমনে সরকারের বিভিন্ন পদেেপর কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে ঘুষ খাবে সে-ই কেবল অপরাধী নয়, যে দেবে সেও সমান অপরাধী। এই বিষয়টা মাথায় রেখেই পদপে নিলে এবং এ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ হলে অনেক কাজ আমরা দ্রুত করতে পারব।
সাম্প্রতিক বন্যার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক নিয়মেই বাংলাদেশে বন্যা হবে এবং এ দেশের মানুষকে প্রকৃতির রুদ্ররূপের সঙ্গেই বসবাস করতে হবে। বন্যার পরই বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজের গতি বাড়াতে হবে যাতে এসব প্রকল্প সঠিক সময়ে সম্পন্ন হয় এবং দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
দেশের প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১ ভাগে উন্নীত করেছে এবং এরপর আরও যত উপরে ওঠার চেষ্টা করা হবে অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী তা দুরূহ হবে।
দারিদ্র্য বিমোচনের েেত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে আরও সক্রিয় হয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেকটি এলাকায় একটু খোঁজ নেয়া দরকার। আমরা সতর্ক করে দিয়েছি, কোনো এলাকায় কেউ গৃহহীন থাকবে না, কেউ ভিা করবে না। যেখানেই গৃহহীন থাকবে তাদের একটা ঘর করে দিতে হবে।
তিনি এ সময় তার ‘ঘরে ফেরা’ কর্মসূচি পুনরায় চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, যারা ঘরে ফিরে যেতে চায় তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ হিসেবে আমরা বস্তিবাসীদের ওপর সার্ভে করেছিলাম। এই কাজগুলো আবার করতে হবে। পাশাপাশি এতিমখানা, বয়োবৃদ্ধদের থাকার জন্য ‘শান্তি নিবাস’ এবং বিত্তশালী বয়োবৃদ্ধদের জন্য ‘অবসর’ কর্মসূচিও পুনরায় চালু করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
নিজের কাজটি নিজেই করার ওপরও গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমা বিশ্বের অনেক কিছুই আমরা অনুকরণ করতে চাই। কিন্তু তারা যেভাবে নিজেদের কাজটা নিজেরা করে তা আমরা অনুসরণ করি না।
তিনি এ প্রসঙ্গে তার কার্যালয়কে (পিএমও) বিষয়টির ওপর ল্য রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘যেহেতু আমাদের একটা ভালো সেটআপ আছে তাই এই দপ্তর থেকেই এই বিষয়টা নিয়ে নজরদারি করা দরকার, যাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তাদের কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করতে পারে, আমাদের অর্জনগুলো আমরা ধরে রাখতে পারি। আর এখন কিন্তু এত দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে না, অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ীই এটা হয়ে থাকে। আর এর থেকে যেন পিছিয়ে না যাই সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।’