প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

নদ-নদী সুরক্ষায় দৃশ্যমান হচ্ছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কার্যক্রম : আশার আলো দেখছে মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রতিষ্ঠার পর নদীখেকো ও ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে ‘ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার’ অপবাদ পেলেও দেশের নদ-নদী সুরক্ষায় ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কার্যক্রম। এতে আশার আলো দেখছে নদীমাতৃক বাংলাদেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর কমিশনের বয়স ৬ বছরে পড়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকাকালীন মাঠ পর্যায়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নদ-নদী সুরক্ষায় বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। দেশের নদ-নদী রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ ও জেলা প্রশাসকদের কাছে তিনি বেশকিছু কার্যকর সুপারিশ প্রেরণ এবং সারাদেশ সফর করে নানা কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে এর পক্ষে জনমত তৈরি করেন। ফলে সারাদেশে নদ-নদীর দূষণ ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে, দৃশ্যমান হচ্ছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কার্যক্রম।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ঢাকা জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ নদী রক্ষা কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করায় রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা ৪টি নদী Ñ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা পুরনো পানিপ্রবাহ ফিরে পেতে শুরু করেছে। ভরা ভাদ্রে এই চার নদীর তীর ঘেঁষে চলাচলের সময় অনেকেই এখন মন্তব্য করছেন, ‘মরা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা যেন ক্রমেই প্রমত্তা হয়ে উঠছে।’
চলতি বছর বিআইডব্লিউটিএ’র নেতৃত্বে এই চারটি নদী পুনরুদ্ধারে যে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হয়, তার নেপথ্যে ছিল জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের যুগোপযোগী সুপারিশমালা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, রাজধানীকে ঘিরে থাকা চার নদীই নয়, দেশের প্রায় সব উল্লেখযোগ্য নদ-নদী নিয়েই জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন তাদের কাছে সুপারিশ প্রদান করেছে। সেই সুপারিশের আলোকে বিআইডব্লিউটিএকে দিয়ে দেশের সব নদ-নদী সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকায় নেমেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সুপারিশের আলোকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় যদি রাজধানীকে ঘিরে থাকা চার নদীর মতো দেশের সব নদ-নদী সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নেয়, তাহলে আশা করা যায়, নদীমাতৃক দেশের পুরনো ঐতিহ্যে ফিরে যাবে বাংলাদেশ।
নদী দেখভালকারী নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের নদ-নদী রক্ষায় জাতীয় নদী রা কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নেই এখন তারা কাজ করছে। কমিশন বিভিন্ন নদী পরিদর্শন শেষে যেসব প্রতিবেদন দিয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ দেখেছে, দখল-দূষণের ভারে দেশের প্রায় সব নদীর অবস্থা এখন খুবই করুণ। ছোট নদী তো বটেই, দেশের বড় বড় নদীর দুই তীরও দখলের উন্মত্ততায় নেমেছে দখলদার ও নদীখেকোরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা ও নদী রক্ষা কমিশনের সুপারিশমালা অনুযায়ী সর্বাধিক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছে।
এসব বিষয়ে জাতীয় নদী রা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার স্বদেশ খবরকে বলেন, আমরা ইতোমধ্যে দেশের প্রায় সবগুলো জেলার নদ-নদী পরিদর্শন করেছি। নদ-নদী সুরক্ষায় স্থানীয় কমিটি, যেখানে পানি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে বৈঠক করে নদী দখল ও দূষণ চিহ্নিত করেছি। ইতোমধ্যে দূষণ ও দখলের সাথে জড়িত ৫০ হাজারের বেশি দখলদারের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। কমিশন শিগগিরই দেশের ৬৪ জেলার সব নদ-নদী দখল-দূষণ বিষয়ে একটি মানচিত্র ও পূর্ণাঙ্গ সুপারিশমালা তৈরি করে সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে।
এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় নদী রা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার স্বদেশ খবরকে বলেন, জনবলের স্বল্পতা ও আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে নদ-নদী রক্ষা কার্যক্রমে আমরা সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও আমাদের পরিদর্শন ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন এবং সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালার আলোকে বিআইডব্লিউটিএ এবং জেলা প্রশাসন নদ-নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করছে; যা পরোক্ষভাবে আমাদেরই সাফল্য।
তিনি আরো বলেন, নদ-নদী ও খাল জনগণের সম্পদ। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন না হলে নদী ও খাল আদৌ দখলমুক্ত হতো না। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সদিচ্ছার কারণেই এটি গঠিত হয়েছে এবং তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশনার আলোকেই আমরা এ কঠিন দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হচ্ছি।
ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার কারণে এ কাজে আমরা গণমানুষের সমর্থন ও স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাচ্ছি; যে কারণে প্রভাবশালী দখলদাররা এখন আর আগের মতো উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস পাচ্ছে না। সে কারণে খাল ও নদী দখলমুক্তকরণ ক্রমেই টেকসই হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, দেশের এমন কোনো খাল বা নদী নেই, যা কমবেশি দখল বা দূষণ হয়নি। কমিশনের আইনি সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদ ও নদী নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মমতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নদীদখলের বিরুদ্ধে অসম্ভবকে সম্ভব করে এগিয়ে যাচ্ছি। কমিশন ইতোমধ্যে দখলদারদের বড় একটি ধাক্কা দিয়েছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে কমিশন চেয়ারম্যান ড. হাওলাদার বলেন, কমিশনকে অবশ্যই স্বাধীন ও নিরপেভাবে কাজ করার মতা দিতে হবে। নদী সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কমিশনের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনার মতা থাকতে হবে। নদী সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সব অধিদপ্তরকে। নদী কমিশনের বিভাগীয় অফিস প্রতিষ্ঠাকল্পে জনবল নিয়োগ দিতে হবে। আইনিভাবে নদীর একমাত্র অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে কমিশনকে। প্রায়োগিক মতা ও নদীর সীমানা নির্ধারণে কমিশনের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত হিসেবে মেনে নেয়ার আইনি বিধান রাখতে হবে। উচ্ছেদ অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য নির্বাহী মতা দিতে হবে।
নদী বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সারাদেশে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিশন উন্নয়নের প,ে তবে নদী দখল করে ইকোনমিক জোন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। নদীর ভূমি দখল করে কোনো গুচ্ছগ্রাম বা আদর্শ গ্রাম হতে পারে না। শহরকেন্দ্রিক নদী দখল করছে প্রভাবশালীরা। তাদের তালিকা আমরা চূড়ান্ত করেছি। বুড়িগঙ্গার ৩৩টি ডকইয়ার্ড সরানোর সুপারিশ করেছি।
নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, নদী হচ্ছে দেশের অর্থনীতির প্রাণ ও জীববৈচিত্র্যের আধার। আইন সংশোধন করে কমিশনের মতা বাড়াতে হবে, নদীর সীমানা নির্ধারণে পিলার বসানোর দায়িত্ব দিতে হবে। নদী দখল ও দূষণমুক্ত করা একটি বড় কর্মযজ্ঞ। কমিশন দেশের রাঘববোয়ালদের চিহ্নিত করেছে। এ জন্য কমিশনের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ড. হাওলাদারের মন্তব্যের সূত্র ধরে বলা যায়, সরকার যে আশা নিয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করেছে, সেই সরকারই কমিশনকে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দেয়নি। এটা এজন্য হতে পারে যে, সরকারের সংশ্লিষ্টরা হয়তো চায়নি যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থার উদ্ভব ঘটুক। তাই সরকার নদ-নদী রক্ষায় সুপারিশ প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে। এটা এজন্য হয়েছে যে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ এবং জেলা প্রশাসনের যে লোকবল আছে, নদী রক্ষা কমিশনের সে লোকবল নেই। সীমিত লোকবল নিয়ে নদী রক্ষা কমিশনকে নদ-নদী রক্ষায় সুপারিশ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উভয় দায়িত্বই যদি দেয়া হয়, তাহলে হয়ত দেখা যাবে কোনো দায়িত্বই কমিশন সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। এতে কাজে স্থবিরতা দেখা দেবে এবং সরকারের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
তবে এটাও ঠিক যে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষÑ এই মন্ত্রণালয় ও সংস্থার নামের সঙ্গেই পরিবহন শব্দটি জড়িত আছে। অর্থাৎ নদীর ওপর দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী ও পণ্য পরিবহনকারী যানের নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় ও সংস্থা হলো নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ। অপরদিকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নামটির সঙ্গে পরিবহন শব্দটি জড়িত নেই। সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বহমান নদ-নদীগুলোর দেখভালের কর্তৃপক্ষ হিসেবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই কমিশন নদ-নদী রক্ষায় যেমন সুপারিশ প্রণয়ন করবে, আবার সুপারিশ বাস্তবায়নও করবে। নদ-নদী রক্ষার সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ যদি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ করে, তাহলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে পরিবহন শব্দটি এবং বিআইডব্লিউটিএ থেকে টি (ট্রান্সপোর্ট) শব্দটি বাদ দিয়ে মন্ত্রণালয় ও সংস্থার নাম গঠন করা উচিত। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নাম যেহেতু ‘জাতীয় নৌপরিবহন রক্ষা কমিশন’ নয়, সেহেতু দেশের নদ-নদী রক্ষার পূর্ণাঙ্গ অভিভাবকত্ব জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেয়া উচিত।
ড. হাওলাদার দেশের নদ-নদীগুলো দখল ও দূষণের কবল থেকে রক্ষার জন্য যে জেলায় যে নদ-নদী প্রবাহিত, সেখানেই ছুটে যান। নদী পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। তাঁর এ কাজ ইতোমধ্যেই পরিবেশবাদী ও নদীপ্রেমীদের যথেষ্ট প্রশংসা কুড়িয়েছে।
কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার স্পষ্ট করে বলেছেন, নদী-পানি ও পরিবেশ রক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন মোটেও সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, নদীর বিষয়টি টেকসই উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত। নদী-পানি-পরিবেশের উন্নয়ন মানে সভ্যতারই উন্নয়ন। নতুবা জীববৈচিত্র্য রা করা যাবে না। টেকসই উন্নয়ন করতে হলে নদী রা করতে হবে, নদীর উন্নয়ন করতে হবে।

দুই.
জাতীয় নদী রা কমিশন আইনে নদীর স্বার্থে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয়, অবৈধ দখল ও পুনর্দখল রোধ, নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখা, বিলুপ্ত ও মৃতপ্রায় নদী খনন, নদী রায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন, নিয়মিত পরিদর্শন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কাজে সুপারিশ করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কমিশনকে। নদী কমিশনের কাজ হচ্ছে সরেজমিন নদীর পরিস্থিতি দেখবে, এরপর তা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভূমি কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের অবহিত করবে। অবহিত করার পর স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ডিসি ও ইউএনওরা প্রশাসনিক নানা কাজ নিয়ে যতটা আগ্রহী, নদ-নদী রক্ষায় তারা ততটাই অনাগ্রহী। আর এসি ল্যান্ডরা সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকেন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কাজে। সেখানে নদী ও ভূমির কোনো নাম-নিশানা থাকে না। বাল্য বিবাহ ও মাদকদ্রব্য রোধ নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায়ই তাদের যত আগ্রহ।
বিষয়টি স্বীকার করেছেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের এক কর্মকর্তাও। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বদেশ খবরকে বলেন, আমাদের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু তাদের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে। তাদের ১০টি কাজ থাকলে নদী রক্ষা কমিশনের কাজটি ১০ নম্বরে রাখেন। অর্থাৎ তারা অন্য ৯টি কাজ শেষ করে সময় পেলে নদী রক্ষা কমিশনের কাজটি করেন।
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, অতীতের ওই ধারণা এখন পাল্টে গেছে এবং পাল্টে দিতে আমরা বাধ্য করেছি। আমাদের পরামর্শ ও সুপারিশসমূহ সংশ্লিষ্টরা বাস্তবায়ন না করলে ফলোআপের মাধ্যমে এবং চিঠি দিয়ে এক্ষেত্রে আমরা সংশ্লিষ্টদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে অফিসিয়ালি যোগাযোগ করে আমাদের সুপারিশসমূহের বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি।
এ ধরনের একাধিক দৃষ্টান্ত স্বদেশ খবর প্রতিবেদকের সামনে উপস্থাপন করে নদী রক্ষা কমিশন চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, যুগ পাল্টাচ্ছে, অতীত কর্মকা-ের রূপও পাল্টাচ্ছে।
প্রায় একই মত পোষণ করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও বিশিষ্ট পানিবিজ্ঞানী ড. আইনুন নিশাত। তিনি স্বদেশ খবরকে বলেন, কোথায় কারা নদী দখল ও দূষণ করছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন তা চিহ্নিত করে দিলে সরকার সাংবিধানিকভাবে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য। কমিশনের মতা বাড়াতে হলে তারা সরকারের কাছে প্রস্তাব দিতে পারে। ভূমি কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকদের তো আইনি মতা দেয়া আছে। কমিশনের চেয়ারম্যান একসময় ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন, তাই তার তো সবকিছু জানা আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রাণ নদ-নদী রক্ষায় ডিসি, ইউএনও ও এসি ল্যান্ডদের যে উদাসীনতা আছে, তা রোধ করা জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকে সবাই সমস্বরে ‘জ্বী স্যার’ বলল, পরক্ষণেই নদীখেকোদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হলো Ñ এটা হতে পারে না। ডিসি, ইউএনও ও এসি ল্যান্ডদের নদীর প্রতি মমতা বাড়াতে হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন যদি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে এবং মন্ত্রণালয় সেমতে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে ডিসি, ইউএনও ও এসি ল্যান্ডদের নদীর প্রতি উদাসিনতা কমবে এবং মমতা বাড়বে বলেই আশা করা যায়।

শেষ কথা
দীর্ঘদিন ভূমি সচিবের দায়িত্ব পালন করায় দেশের নদ-নদী, খাল-বিল-ঝিল, হাওড়-বাওড়ের কোনটির কী অবস্থা, তা একেবারেই নখদর্পণে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদারের। সে হিসেবে বলা চলে, যোগ্য লোকের হাতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন। আর ড. হাওলাদারও সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে। এজন্য তিনি তাঁর টিম নিয়ে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে চলেছেন।
সাপ্তাহিক স্বদেশ খবর পত্রিকার সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, নদীর প্রতি অসম্ভব মমতার কারণেই মধুমতি নদীর তীরে বেড়ে ওঠা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ঐকান্তিক আগ্রহ থেকে ২০১৪ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করেছেন এবং নদ-নদী সুরক্ষা কার্যক্রমে সর্বোচ্চ সহায়তা দিয়ে আসছেন। তাই এই কমিশনকে আরো কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে তিনি ও তাঁর টিম সর্বোতভাবে চেষ্টা করছেন। তিনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ’র আন্তরিক সহযোগিতা পেলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কাগুজে বাঘ হয়ে থাকবে না, নদীখেকো ও দখলদারদের কাছে সত্যিকারের বাঘরূপে আবির্ভূত হবে।
এক্ষেত্রে আশার কথা হলো, চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি এবং ৩ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের এক রায়ে ১৭টি যুগান্তকারী নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রায়ের ১৭টি নির্দেশনার একটিতে বলা হয়েছে Ñ ‘নদী রক্ষা কমিশন’-কে তুরাগ নদীসহ দেশের সকল নদ-নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নের নিমিত্ত আইনগত অভিভাবক ঘোষণা করা হলো। নদ-নদী সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা, অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় অদ্য ৩১ জানুয়ারি ২০১৯ হতে বাংলাদেশের সকল নদ-নদীর দূষণ ও দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক নৌ চলাচলের উপযোগী করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ, উন্নয়ন, শ্রীবৃদ্ধিসহ যাবতীয় উন্নয়নে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বাধ্য থাকবে। নদ-নদী সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা, অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে সঠিক এবং যথাযথ সাহায্য ও সহযোগিতা দিতে বাধ্য থাকবে।
ওই রায়ের অন্য একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তুরাগ নদীসহ দেশের সকল নদ-নদী খাল বিল জলাশয়ের ক্ষেত্রে নতুন প্রকল্প প্রণয়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনা কমিশন, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, বিএডিসিসহ সকল সংস্থা জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে অবহিত করবেন এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের অনাপত্তিপত্র গ্রহণ করবে।
এ রায়ের এক জায়গায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে একটি কার্যকর স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ অনতিবিলম্বে গ্রহণ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
তাছাড়া পরবর্তী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে মাহামান্য হাইকোর্টের ১৭টি নির্দেশনা সংবলিত এ রায় ও আদেশের অনুলিপি বাংলাদেশের সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান বরাবরে প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
এ রায় ও আদেশের অনুলিপি অধস্তন আদালতের সকল বিচারককে ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানোর জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
রায় ও আদেশের অনুলিপি ঔঁফরপরধষ অফসরহরংঃৎধঃরড়হ ঞৎধরহরহম ওহংঃরঃঁঃব (ঔঅঞও)’তে পাঠানোর জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ প্রদান করা হয়।
রায়ের একটি কপি আইন কমিশনের চেয়ারম্যানকে পাঠানোর জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ প্রদান করা হয়।
রায় ও আদেশের অনুলিপি সকল প্রতিবাদী পক্ষকে, শিক্ষামন্ত্রী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নদী রক্ষা কমিশন, গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক, সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সকল জাতীয় সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পৌর মেয়র, সকল উপজেলা চেয়ারম্যান, সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সকল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নিমিত্তে দ্রুত অবহিত করার জন্য বলা হয়েছে।
রায়ের একটি অনুলিপি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণের নিমিত্তে প্রেরণ করার জন্য বলা হয়েছে, যাতে শেখ হাসিনা তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে তুরাগ নদীসহ দেশের সকল নদ-নদী রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে পারেন। রায়ের সহি মহরী অনুলিপি অতি সত্ত্বর বই আকারে বাঁধাই করে রেজিস্ট্রার জেনারেলকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী সম্মুখে পেশ করার জন্য বলা হয়েছে।
নদীসমূহের বাঁচা-মরার ওপর বাংলাদেশের অস্তিত্ব জড়িত। রায়ের যথাযথ বাস্তবায়ন তাই জাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ দেশাত্মবোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হলে নিশ্চিতভাবে আমাদের এ দেশটি সুখী, সমৃদ্ধ তথা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।

একনজরে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন
জাতীয় নদী রা কমিশন নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। চেয়ারম্যান ও একজন নারী সদস্যসহ পাঁচ সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা তিন বছরের জন্য সরকার কর্তৃক নিযুক্ত। কমিশনের চেয়ারম্যান এবং একজন সদস্য সার্বণিক, অবশিষ্ট তিন সদস্য অবৈতনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার (সাবেক সচিব)। ইতঃপূর্বে তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ চাকরিজীবনে তিনি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আলাউদ্দিন। তিনি দীর্ঘ দিন যাবৎ নদী ব্যবস্থাপনা ও নদী সংশ্লিষ্ট কর্মকা-ে নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়া মো. আলাউদ্দিন জানুয়ারি ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।
উল্লেখ্য, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বাকি অবৈতনিক ৩ সদস্যের একজন হলেন পানি বিশেষজ্ঞ মালিক ফিদা আবদুল্লাহ, দ্বিতীয় জন পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি ব্রতি এনজিও’র নির্বাহী পরিচালক শারমীন সোনিয়া মুর্শিদ এবং তৃতীয় জন হলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মনিরুজ্জামান। এর বাইরে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে ১ জন সচিব, ২ জন পরিচালক, ২ জন উপ-পরিচালক, ২ জন উপ-প্রধান, ৬ জন সহকারী পরিচালক, দ্বিতীয় শ্রেণির ১ জন ও তৃতীয় শ্রেণির ৭ জন, ড্রাইভার ২ জন এবং আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগকৃত চতুর্থ শ্রেণির ১১ জন স্টাফ রয়েছে।