আন্তর্জাতিক

পরমাণু চুক্তি থেকে সরে গেল যুক্তরাষ্ট্র: সংঘাতের দিকে এগুচ্ছে বিশ্ব!

বিশেষ প্রতিবেদক
১৯৮৭ সালে আইএনএফ স্বার করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ। চুক্তিতে ৫০০ থেকে ৫,৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে সব স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার পরমাণু ও অপারমাণবিক পেণাস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রায় ২,৭০০ পেণাস্ত্র ধ্বংস করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। চুক্তির আওতায় দুই দেশ একে অন্যের স্থাপনাও পর্যবেণ করতে পারত।
চলতি বছরের শুরুতেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপ সীমান্তে নতুন ধরনের ক্রুজ মিসাইল মোতায়েনের মাধ্যমে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ আনে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট (ন্যাটো)। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, রাশিয়া বেশকিছু নাইন এম-৭২৯ মিসাইল (যেগুলো ন্যাটোতে এসএসসি-৮ নামে পরিচিত) মোতায়েন করেছে এবং এর প্রমাণ তাদের হাতে আছে।
এরপর ন্যাটোও একই অভিযোগ তোলে, যদিও রাশিয়া এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, রাশিয়া যদি চুক্তিটা মেনে চলতে না চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসবে। এজন্য তিনি ২ আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেন। ট্রাম্পের এমন অবস্থানের পর এেেত্র রাশিয়ার যে আপত্তি নেই সেটিও বুঝিয়ে দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন।
সেই ঘোষণা মোতাবেক ২ আগস্ট আইএনএফ চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এক বিবৃতিতে চুক্তিটির মৃত্যুর জন্য রাশিয়াকেই দায়ী করেছেন। তার দাবি, ন্যাটোর পূর্ণ সমর্থন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত হয়েছে যে, রাশিয়া চুক্তি ভঙ্গ এবং চুক্তির বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে।
ন্যাটো মহাসচিব জেনস স্টোলেনবার্গও এজন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পদেেপ আইএনএফ চুক্তির আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটেছে।

বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ার শঙ্কা
পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে ৩২ বছর আগে করা চুক্তিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর বিশ্বে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাশিয়ান সামরিক বিশ্লেষক পাভেল ফেলগেনহর বলেছেন, চুক্তিটি শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা নতুন নতুন অস্ত্রের উন্নয়ন ও মোতায়েন দেখব। দেখব সেই সব অস্ত্র বসানো হচ্ছে একে অন্যকে তাক করে। রাশিয়া এখনই তার জন্য তৈরি আছে।
মার্কিন কর্মকর্তারাও বলছেন, স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার পেণাস্ত্র তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বাধা নেই। এেেত্র দ্রুত তহবিল বরাদ্দ দেয়া হবে।
এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুটেরেস সতর্ক করে বলেছেন, পরমাণু যুদ্ধের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা সরে গেল। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পদেেপ ব্যালাস্টিক পেণাস্ত্রের হুমকি কমেনি বরং বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজে বের করতে সব পকে সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ন্যাটোর মহাসচিব জেনস স্টোলটেনবার্গ বলেছেন, আইএনএফ চুক্তি গত কয়েক দশক ধরে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের একটি ভিত্তি ছিল এবং এখন আমরা তার মৃত্যু দেখলাম। এজন্য রাশিয়া দায়ী।
তিনি বলেন, রাশিয়া যে পেণাস্ত্র বসিয়েছে সেগুলো পরমাণু অস্ত্র বহন করতে পারে। এক জায়গা থেকে দ্রুত অন্য জায়গায় যেতে পারে। এগুলোর গতিবিধি শনাক্ত করাও কঠিন। এগুলো কয়েক মিনিটের মধ্যে ইউরোপের শহরগুলো গুঁড়িয়ে দিতে পারে। বুঝতেই পারছি, চুক্তির দিন ফুরিয়ে এলো।
তিনি বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় যাবে না ন্যাটো। তবে ইউরোপে রাশিয়ার যেকোনো ধরনের পেণাস্ত্র হামলার যথাযথ জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে ন্যাটো।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মুখোমুখি!
যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় মাঝারি মাত্রার পেণাস্ত্র মোতায়েন করলে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো ওসব পেণাস্ত্র মোতায়েনের অনুমতি দিলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সতর্ক করেছে চীন।
মার্কিন প্রতিরামন্ত্রী মার্ক এসপের গত ৩ আগস্ট জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে এক মাসের মধ্যে মাঝারি মাত্রার ভূমিভিত্তিক পেণাস্ত্র মোতায়েন করতে চায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ৬ আগস্ট চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিভাগের মহাপরিচালক ফু কং এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
পেণাস্ত্র মোতায়েনের প্রতিক্রিয়ায় চীনের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিভাগের মহাপরিচালক ফু কং বলেন, এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পেণাস্ত্র মোতায়েনের দিকে নজর রাখবে চীন এবং চীনের দোরগোড়ায় যুক্তরাষ্ট্র পেণাস্ত্র মোতায়েন করলে চীন পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। এর পরিণামের কথা ভেবে কাজ করতে প্রতিবেশীদের জোর আহ্বান জানাচ্ছি। তারা যেন তাদের ভূখ-ে যুক্তরাষ্ট্রের মাঝারি মাত্রার পেণাস্ত্র মোতায়েন করতে না দেয়।
তিনি জাপান, দণি কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার নাম উল্লেখ করে সতর্ক করে দেন, এতে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ হাসিল হবে না।
মার্কিন প্রতিরামন্ত্রী মার্ক এসপেরসহ ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, চীনের মারমুখী আচরণ ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এশিয়ায় পেণাস্ত্র মোতায়েন ইস্যুতে বাগযুদ্ধ এই অঞ্চলের অস্ত্রদৌড় নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ক্রুজ পেণাস্ত্র পরীা শুরুর আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর নভেম্বরে মাঝারি মাত্রার ব্যালাস্টিক পেণাস্ত্র পরীার ল্য রয়েছে পেন্টাগনের।
এদিকে চীন জ্বালানিসমৃদ্ধ দণি চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ এলাকায় তৈরি কৃত্রিম দ্বীপে বিপুল পরিমাণে মাঝারি মাত্রার পেণাস্ত্র মোতায়েন করেছে এবং সামরিক সরঞ্জাম স্থাপন করেছে। তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পেণাস্ত্র তৈরি করছে। এসব পেণাস্ত্রের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরাব্যবস্থা সীমিত বলে জানিয়েছেন পেন্টাগন কর্মকর্তারা। চীনকে ঠেকাতে তাই নতুন অস্ত্র ও কৌশল নির্ধারণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।