প্রতিবেদন

বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার

বিশেষ প্রতিবেদক
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী কর্মকর্তা ও সৈনিকের হাতে সপরিবার হত্যার শিকার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ওই সময় দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ঘটনায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে ২০১০ সালে ২৭ জানুয়ারি ৫ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়। ২০০২ সালে পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে মারা যান খুনি আজিজ পাশা। বাকি ৬ জন দেশের বাইরে পলাতক। এই ৬ জনের মধ্যে ২ জনের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। বাকি ৪ জনের অবস্থান স্পষ্ট নয়। তবে বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিতে আইন, বিচার ও সংসদ, পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত এক খুনিকে ফেরত আনার জন্য ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি দিয়েছেন।
জানা গেছে, সারাদেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনের আগে পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে এনে শাস্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে সরকার। এ লক্ষ্যেই গঠিত হয় একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে খুনিদের ফেরানোর চেষ্টার বিষয়টি তুলে ধরেন। সরকারি দলের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের তারকা চিহ্নিত এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিতে আইন, বিচার ও সংসদ, পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর ১৯৭৫ সালে রাশেদ চৌধুরীর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয় এবং তার প্রথম পোস্টিং ছিল জেদ্দায়। ১৯৯৬ সালে তার চাকরি ডিসমিস করা হয়। এরপর দেশে ফিরে আসতে বললে রাশেদ চৌধুরী ব্রাসিলিয়া থেকে সান ফ্রান্সিসকোতে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালের জুলাই থেকে বিভিন্ন সময়ে তাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করলেও সে দেশের সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সাড়া দেয়নি।
তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সর্বশেষ জানানো হয়েছে যে, দেশটির স্টেট ডিপার্টমেন্ট রাশেদ চৌধুরীর বিষয়টি তাদের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের কাছে পাঠিয়েছে। প্রত্যাবাসনের বিষয়টি একটি আইনি প্রক্রিয়া, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট দেখাশোনা করে।
কানাডায় অবস্থানরত নুর চৌধুরীর
ফেরতের সিদ্ধান্ত সেপ্টেম্বরে!
বর্তমানে কানাডায় বসবাসকারী বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি নুর চৌধুরীর প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত মামলার রায় আগামী সেপ্টেম্বরে হতে পারে। ওই রায়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে কানাডা সরকার নুর চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে কি না অথবা কবে নাগাদ ফেরত পাঠাবে।
জানা যায়, ১৯৭৬ সালে নুর চৌধুরীর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। তার প্রথম পোস্টিং ছিল ব্রাসিলিয়ায়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ওই বছরের ৫ জুলাই বঙ্গবন্ধুর খুনি নুর চৌধুরী তার স্ত্রীসহ কানাডায় প্রবেশ করেন। সরকারে শেখ হাসিনার এই মেয়াদকালে (১৯৯৬ থেকে ২০০১) নুর চৌধুরী ও তার স্ত্রী কানাডায় উদ্বাস্তু হিসেবে বসবাসের জন্য দেশটির সরকারের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু ২০০২ সালের ১ আগস্ট তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে কানাডার ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড। এর বিরুদ্ধে অটোয়াতে ফেডারেল কোর্টে আপিল করলে ২০০৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর তাদের আপিল ডিসমিস করে দেয় আদালত। ডিসমিস আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন নুর চৌধুরী। সেটিও খারিজ হয়ে যায়। এরপর ২০০৬ সালে তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য কানাডা সরকার বাংলাদেশকে চিঠি দেয়। কিন্তু তৎকালীন সরকারের অনাগ্রহের কারণে তখন নুর চৌধুরীকে দেশে ফেরত আনার সুযোগ হাতছাড়া হয়। ২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার মতায় আসার পর নুর চৌধুরী কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে একটি প্রি-রিম্যুভাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট দরখাস্ত করে জানান, তাকে যদি ওই দেশ থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়, তবে তাকে ফাঁসি দেয়া হবে।
এরপর গত ১০ বছরে কানাডার সরকার এই দরখাস্তটি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না করে বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে। ২০১৮ সালের জুন মাসে কানাডার ফেডারেল কোর্টে বাংলাদেশ এ বিষয়ে একটি রিট অব ম্যানডামাস দাখিল করে। কোর্টের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত চেয়ে নুর চৌধুরী কানাডায় কিভাবে অবস্থান করছেন (স্ট্যাটাস) সেটিও জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কানাডার আদালতে এ বছরের মার্চে এ বিষয়ে একটি শুনানি হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী মাসে এ বিষয়ে রায় দেবে আদালত।

বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিরা কে কোথায়
বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ঘটনায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে ২০১০ সালে ৫ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বাকিদের ১ জন জিম্বাবুয়েতে মারা যান এবং ৬ জন পলাতক। পলাতকরা হলেন আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এম রাশেদ চৌধুরী, এসএইচএমবি নুর চৌধুরী, আব্দুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। এদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রাশেদ চৌধুরী। কানাডায় নুর চৌধুরী। ২ জনের সম্ভাব্য অবস্থান হলো মোসলেম উদ্দিন জার্মানিতে ও শরিফুল হক ডালিম স্পেনে। অবশ্য এই ৪ জনের অবস্থানই ‘সম্ভাব্য’ বলে জানিয়েছে ইন্টারপোলের বাংলাদেশ শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। তাদের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড অ্যালার্ট জারি করা আছে।