অর্থনীতি

ব্যাংকের সুদহার কমা-না-কমার নেপথ্যে

নিজস্ব প্রতিবেদক
গত বছরের (২০১৮) জুলাই থেকে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা ঋণে সর্বোচ্চ ৯ এবং আমানতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ (নয়-ছয়) সুদ কার্যকরের ঘোষণা দেন। কিন্তু এক বছরেও সেই প্রতিশ্রুতি রা করেননি তারা। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামেনি এবং আমানতের সুদহার ডাবল ডিজিটে ওঠেনি। এর পরিপ্রেেিত গত ৪ আগস্ট বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে বেসরকারি ৪০টি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডি উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘নয়-ছয়’ সুদহার বাস্তবায়নে শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বলছে, ‘নয়-ছয়’ সুদহার বাস্তবায়নে আপাতত সার্কুলার জারি করা হচ্ছে না। চিঠি পাঠিয়ে এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
প্রকৃত সুদহার নির্ণয় করা হয় নমিনাল সুদহার থেকে মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে। গত জুনে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ঋণের নমিনাল গড় সুদহার ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ আর আমানতের গড় সুদহার ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। জুনে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ জুনে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ঋণের গড় প্রকৃত সুদহার ৪ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। আমানত গড় প্রকৃত সুদহার নেগেটিভ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ক্রয়মতার বিপরীতে আমানতকারীরা যে পরিমাণ অর্থ জমা রাখছেন তার চেয়েও কম অর্থ ফেরত পাচ্ছেন। জমা রেখে লাভ দূরের কথা, আসল টাকাই য়ে যাচ্ছে আমানতকারীদের।
আমানতের বিপরীতের টাকা য়ে যাওয়া শুরু হয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। এর পর থেকেই নেতিবাচক ধারার কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন আমানতকারীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে সুদহার এত কম হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানোর জন্য দফায় দফায় নির্দেশনা দিচ্ছেন। এ জন্য তারা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকও করেছেন। সুদহার কমানোর জন্য ব্যাংকের মালিকদের দাবির পরিপ্রেেিত নানা সুবিধাও দেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে।
ঈদুল আজহার আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে উচ্চ সুদহার নিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ১৪, ১৫, ১৬ শতাংশ সুদহার হিসাব করে কী লাভ, দিতে পারবে না; এতে শুধু খেলাপি ঋণই বাড়বে। শিগগিরই আমানতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ এবং ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ বেঁধে দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া চক্রবৃদ্ধি সুদহার পরিহার করে সরল সুদ পদ্ধতি ব্যবহারের নির্দেশ দেন অর্থমন্ত্রী।
চক্রবৃদ্ধি সুদহারের ক্ষেত্রে ঋণ বিষয়ে ব্যাংকগুলো যতটা আন্তরিক, আমানতের চক্রবৃদ্ধি সুদের ক্ষেত্রে ততটাই কৃপণ। ব্যাংকগুলোর এ ধরনের মনোভাবের কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি আমানতকারীরা হন বঞ্চিত। এ কারণে অনেক অর্থনীতিবিদের মতে ঋণ ও আমানতের সুদহার এক হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে তারা ঋণ ও আমানতে ৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম এ বিষয়ে বলেন, ব্যাংকঋণের সুদহার এক অঙ্কে নেমে আসেনি। ফলে অনেকেই ঋণ নিচ্ছেন না। যারা নিচ্ছেন তারাও খেলাপি হওয়ার মানসিকতা নিয়েই ঋণ নিচ্ছেন। তার মতে, ঋণের সুদহার সিঙ্গল ডিজিটে নামিয়ে না আনলে খেলাপি ঋণ কালচারে পরিণত হয়ে যাবে। তাই ঋণের সুদহার অবশ্যই কমিয়ে আনতে হবে।
পোশাক মালিক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, মুদ্রানীতির ঘোষণায় দেখানো হয়েছে নমিনাল সুদহার ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ। কিন্তু প্রকৃত কার্যকর সুদহার ডাবল ডিজিট। এ উচ্চ সুদহার শিল্প প্রতিষ্ঠান ও পরিচালনার েেত্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম স্বদেশ খবরকে বলেন, ঋণ ও আমানতের সুদহারের ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকরা সরকারের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তাদের আবারও নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ এ প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তারা সরকার থেকে বেশ কিছু সুবিধাও নিয়েছেন। তাই সরকারকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নয়-ছয় সুদহার বাস্তবায়নের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আপাতত কোনো সার্কুলার জারি করা হচ্ছে না।
এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘নয়-ছয় সুদ বাস্তবায়ন নিয়ে সার্কুলার জারি করবে কি করবে না, সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিষয়। তবে ঋণের সুদহার কমানো এবং আমানতের সুদহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে ঈদের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমাদের একটি চিঠি দেয়া হয়েছে।’
জানা যায়, গত ৭ আগস্ট সব বেসরকারি ব্যাংকের এমডিদের বরাবর ওই চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছে, আমানত ও ঋণ বা বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুদহার হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়ে অনতিবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আপনাদের পরামর্শ দেয়া হলো। চিঠিতে ২০১৮ সালের ২ আগস্ট বর্তমান সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সভাপতিত্বে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ঘোষিত ঋণ বা বিনিয়োগের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ এবং তিন মাস বা তার বেশি কিন্তু ছয় মাসের কম মেয়াদি আমানতের সুদহার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ বাস্তবায়নের বিষয়ে যে মতৈক্য হয়েছিল, সেই উদ্ধৃতিও তুলে ধরা হয়।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ শামসুল আলম স্বদেশ খবরকে বলেন, নয়-ছয় সুদহার বাস্তবায়ন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সার্কুলার জারি না করার পেছনে অবশ্যই কারণ রয়েছে। সুদহার যখনই বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করে দেবে, তখন তা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সহজভাবে না নিয়ে এ দেশ থেকে মুখ ফিরিয়েও নিতে পারে। তা ছাড়া এটি জোর করে কমানো বা বাড়ানো সম্ভব নয়। কারণ মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে দেয়া যায় না, চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতেই সুদহার নির্ধারিত হয়। জোগান রেট তথা আমানতের সুদ যদি ৬ শতাংশ হয়, তবে চাহিদা তথা ঋণের সুদহারও ৯ শতাংশ করা সম্ভব। কিন্তু এখন ৬ শতাংশে কেউ আমানত রাখছে না। এমনকি সরকারি আমানতও ৬ শতাংশে পাওয়া যাচ্ছে না।
শামসুল আলম আরো বলেন, ১০০ কোটি টাকার একটি আমানত রাখতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিলামের আয়োজন করে। ওই নিলামে সর্বোচ্চ সুদ প্রদানকারী ব্যাংককেই বেছে নেয়া হচ্ছে। কাজেই আমানতের সুদ যতণ পর্যন্ত সহজলভ্য না হবে ততণ পর্যন্ত ঋণের সুদহারও ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না।