প্রতিবেদন

যথাযোগ্য মর্যাদায় বঙ্গমাতার ৮৯তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বাধীনতার মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী, মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৯তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করা হয়েছে। গত ৮ আগস্ট জাতীয়ভাবে দিনটি উদযাপনের ল্েয মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করে।
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে জাতির পিতার হত্যাকারীদের নিষ্ঠুর, বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়ে স্বামী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিনিও শাহাদতবরণ করেন।
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী উপলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।
এ উপলে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে ছিল সকাল ৮টায় রাজধানীর বনানী কবরস্থানে শহীদ ফজিলাতুন্নেছার সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ শেষে কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগও বনানী কবরস্থানে বেগম ফজিলাতুন্নেছার কবরে শ্রদ্ধা জানায়। এছাড়া দিবসটি উপলে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে। বঙ্গমাতার জন্মদিন উপলে যুবলীগ শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারিতে সংগঠনটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী সম্পাদিত ‘শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণীয় বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব’ গ্রন্থের দিনব্যাপী সংবাদচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে।
এদিকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৯তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কোনো পদ-পদবির অধিকারী না হয়েও বঙ্গমাতা ছিলেন নারীর রাজনৈতিক মতায়নের এক অনন্য প্রতীক। তিনি ছিলেন অসামান্য দৃঢ়তা, আত্মপ্রত্যয়, দৃঢ় মনোবল, সাহস এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
স্পিকার বঙ্গমাতার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করে তাঁর আদর্শ থেকে শিা গ্রহণের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী এই নারী আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেন ও নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের প্রতিটি েেত্র তিনি পরামর্শ, সাহস, অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা দিয়ে গেছেন।
জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার েেত্র মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অনন্যসাধারণ ভূমিকা ছিল বলে তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরার সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি, জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান অধ্যাপক মমতাজ বেগম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি তারানা হালিম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুন নাহার।
স্পিকার বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ প্রোপটে নেপথ্যে থেকে বেগম মুজিব অসামান্য অবদান রেখেছেন। তিনি দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধুকে প্রেরণা জুগিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে জাতির পিতার সঙ্গে বুলেটের নির্মম আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে। মরণেও তিনি স্বামীর সহযাত্রী হয়েছেন।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। কিন্তু বঙ্গমাতা ভেঙে পড়েননি, শক্ত হাতে পরিবারের হাল ধরেছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে পাক সামরিক সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসতে নিষেধ করে বাংলার স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছিলেন বঙ্গমাতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার এ দূরদর্শী চিন্তা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
স্পিকার আরও বলেন, বঙ্গমাতার উৎসাহে বঙ্গবন্ধু কারাগারে আত্মজীবনী লেখেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক অজানা ইতিহাসের সম্ভার। এই আত্মজীবনী সংরণে বঙ্গমাতার ভূমিকা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, মহীয়সী নারী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন প্রচারবিমুখ। পর্দার অন্তরালে থেকে দেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামে নিরন্তর প্রেরণা যুগিয়েছেন। তার ত্যাগ, দেশপ্রেম ও আদর্শ অনন্তকাল আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবন ও কর্মের ওপরে নির্মিত ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়।
উল্লেখ্য, ইতিহাসে বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব কেবল একজন রাষ্ট্রনায়কের সহধর্মিণীই নন, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে অন্যতম এক নেপথ্য অনুপ্রেরণাদাত্রী। বাঙালি জাতির সুদীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি পদেেপ তিনি বঙ্গবন্ধুকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন। ছায়ার মতো অনুসরণ করেছেন স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে। এই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য অবদান রেখেছেন। জীবনে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন, এজন্য অনেক কষ্ট-দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তাঁকে।
বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মাত্র ৩ বছর বয়সে পিতা ও ৫ বছর বয়সে মাতাকে হারান। তাঁর ডাক নাম ছিল ‘রেণু’। পিতার নাম শেখ জহুরুল হক ও মাতার নাম হোসনে আরা বেগম। দাদা শেখ কাসেম চাচাত ভাই শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বেগম ফজিলাতুন্নেছার বিবাহ দেন। তখন থেকে বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে বঙ্গবন্ধুর মাতা সাহেরা খাতুন নিজের সন্তানদের সঙ্গে মাতৃস্নেহে লালন-পালন করেন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে তিনি প্রাথমিক লেখাপড়া করেন। অতঃপর সামাজিক রীতিনীতির কারণে গ্রামে গৃহশিকের কাছে লেখাপড়া করেন।
বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। মনেপ্রাণে একজন আদর্শ বাঙালি নারী ছিলেন তিনি। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা, অসীম ধৈর্য ও সাহস নিয়ে জীবনে যেকোনো পরিস্থিতি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করতেন। তার কোনো বৈষয়িক চাহিদা ও মোহ ছিল না। স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি েেত্র সর্বান্তকরণে সহযোগিতা করেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। অর্থনৈতিক েেত্র পশ্চাৎপদ মানুষকে মুক্তহস্তে দান করতেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের রোগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেয়া এবং পরিবার-পরিজনের যেকোনো সংকটে পাশে দাঁড়াতেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় পালন করায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সকল স্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীর প্রতি ধন্যবাদ জানিয়েছেন।