কলাম

যানজটের কারণ ও সমাধান বিষয়ক ভাবনা

মো. নুরুল ইসলাম সোহাগ
বর্তমান সরকারের আন্তরিকতা ও নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও রাজধানী ঢাকা শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা এখন যানজট। ছুটির দিন এবং দুই ঈদের পরের কয়েক দিন রাজধানী ঢাকার যান চলাচল ব্যবস্থাপনা যেমন থাকে, তা যদি সারা বছরই থাকত, তাহলে লাখ লাখ শ্রমঘণ্টা বেঁচে যেত। এতে অর্থনীতি হতো অনেক সমৃদ্ধ।
এ প্রসঙ্গে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় আয়োজিত এক সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যানজটে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই প্রতিদিন নষ্ট হয় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। এতে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৯৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরে এসে রাজধানীর যানজট আরো বেড়েছে। সে হিসাবে কর্মঘণ্টা নষ্ট ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরো বেড়েছে। এ সংক্রান্ত সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও অনুমান করা হয় এর পরিমাণ যথাক্রমে ৪০ লাখ কর্মঘণ্টা ও ১ লাখ কোটি টাকা।
যানজট নিরসনে নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা যে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, এমন নয়। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করার কারণে অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি হচ্ছে না।
প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অনুযায়ী ঢাকায় বসবাসকারী প্রায় সব লোকজন সকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাসাবাড়ি থেকে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হন, আবার বিকেলে সবাই একযোগে বাসাবাড়ির দিকে ছোটেন। রাজধানীর ভয়াবহ যানজটের অন্য অনেক কারণের সঙ্গে এটি একটি বড় কারণ। এটি হয় সব প্রতিষ্ঠান এক সময়ে খোলা ও বন্ধ হওয়ার কারণে। যদি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বা দুই শিফটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হতো তাহলে অবস্থার অনেকটা উন্নতি হতো।
যাই হোক, রাজধানীর ভয়াবহ যানজটের যেমন বহু কারণ আছে, এর সমাধানেরও নানা পথ আছে। প্রয়োজন সদিচ্ছা ও সমন্বিত পরিকল্পনার।
যানজটের কারণ ও সমাধান বিষয়ক অনেকের অনেক ভাবনা থাকতে পারে, তবে আমি কিছু কারণ ও সমাধানের পথ উল্লেখ করলাম। সংশ্লিষ্টরা যদি এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তাহলে আশা করা যায় যানজট পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে, লাখ লাখ শ্রমঘণ্টা বেঁচে যাবে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ অনেকটাই সুগম হবে।

যানজটের কারণ
ক্স রাস্তার স্বল্পতা।
ক্স প্রতিদিন অসংখ্য গাড়ি ও মানুষের চলাচল।
ক্স অপরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থা।
ক্স ট্র্যাফিক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের অভাব।
ক্স হকার ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা আনয়নে যথাযথ পদপে গ্রহণের অভাব।
ক্স শহর এলাকার অভ্যন্তরে আন্তঃজেলা বাসের প্রবেশ ও বহির্গমন।
ক্স অফিস সময়ে সীমিত রাস্তায় প্রচুর গাড়ির চলাচল।
ক্স সারাদিন বিরামহীনভাবে প্রচুর লোকজনের চলাচল।

যানজট নিরসনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ
পদপে বা ভাবনা
উপরোক্ত সমস্যাবলির স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রক্রিয়া সরকারের প থেকে বিদ্যমান আছে। কিন্তু বিষয়টি যেহেতু সময়সাপে সুতরাং নিম্নবর্ণিত পদপে গ্রহণ করলে ব্যাপক হারে যানজটের বিড়ম্বনা থেকে উত্তরণ সম্ভব।

মূল পরিকল্পনা
অফিস বা বাণিজ্যিক কার্যাবলির সময়সূচি দুই শিফটে চালু। প্রথম শিফট সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা। দ্বিতীয় শিফট সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা।
প্রথম শিফটে থাকবে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট ইত্যাদি। দ্বিতীয় শিফটে থাকবে বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক, বীমা ও মার্কেট। মার্কেট রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

রমজানের সময়সূচি
প্রথম শিফট সকাল ৮টা থেকে ২টা পর্যন্ত। দ্বিতীয় শিফট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত।
রমজানে সকল শিাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।

মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিম্নবর্ণিত
সহায়ক পদপে গ্রহণ করা প্রয়োজন
ক্স অফিস টাইম কড়াকড়িভাবে পালন করার নিমিত্তে কেনো ওভারটাইমের সুযোগ থাকবে না এবং এেেত্র বিদ্যুৎ সংযোগ সকল প্রতিষ্ঠানের ৪টা এবং ৭টার পর বন্ধ হয়ে যাবে।
ক্স প্রত্যেক এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল এবং ট্রাফিক নিয়ম পালন করার েেত্র যথাযথ শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি বাধ্য করা যেতে পারে।
ক্স আন্তঃজেলা বাস স্টেশন কাঁচপুর, টঙ্গী ও বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জে প্রতিস্থাপিত হবে। শহর এলাকায় কোনো আন্তঃজেলা বাস প্রবেশ ও বের হতে পারবে না। দূরের জেলার যাত্রীরা টঙ্গী, কাঁচপুর ও কেরানীগঞ্জ থেকে সিটি বাস, উবার, ব্যক্তিগত গাড়ি, টেক্সি, সিএনজি, বিআরটিসি ইত্যাদির মাধ্যমে শহর এলাকা থেকে বহির্গমন ও প্রবেশ করবে।
ক্স এেেত্র সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যা ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে তা বিদ্যমান থাকবে।
ক্স ভূ-গর্ভস্থ পার্কিং ব্যবস্থা শহরের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
ক্স হকারদের জন্য বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে ছুটির দিনে বা প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বসার ব্যবস্থা করার অনুমতি দেয়া যেতে পারে। তবে কোনোক্রমে ফুটপাতে নয়।

সুফল
ক্স দুই শিফটের কারণে ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে অর্ধেকের বেশি কমে যাবে এবং সাথে সাথে মানুষের চলাচলও সীমিত হয়ে আসবে। অর্থাৎ ৩ ঘণ্টার ব্যবধান যানজট পরিস্থিতিকে বিভাজিত (ঝঢ়ষরঃ) করবে।
ক্স মানুষ নিত্য দিনের অফিসের কাজ ব্যতিত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজ করার সময় পাবে। যেমন সকালের শিফটের মানুষ বিকেলে এবং বিকেলের শিফটের মানুষ সকালে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজ সম্পন্ন করে অফিসে যেতে পারবে।
ক্স অতিরিক্ত সময় অফিসে ব্যয় না করার কারণে (ওভার টাইম নিষিদ্ধ) বিদ্যুতের খরচ কম হবে।
ক্স নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করার তাগিদে কর্মদতা ও শৃঙ্খলাবোধ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।
ক্স পরিবার যেহেতু সকল কর্মপ্রেরণার উৎস সে কারণে মানুষ এই প্রক্রিয়ায় পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারবে। হাজার হাজার শ্রমঘণ্টা সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি তেলও সাশ্রয় হবে।
ক্স ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বর্তমানে যে হিমশিম খাওয়ার মতো অবস্থা তা অনেকংশে লাঘব হবে।
ক্স স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অনেক সৃষ্টিশীল কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারবে।
ক্স দূরবর্তী জেলার যাত্রীদের কিছুটা সমস্যা হবে কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে এবং শহর এলাকায় কিছু বিআরটিসি ও অন্যান্য উন্নত বাস সার্ভিস চালু করলে এ অবস্থা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে।
ক্স অফিস সময় দুই শিফটে ১ ঘণ্টা আগে (বর্তমান ৯টার পরিবর্তে ৮টা) ও ১ ঘণ্টা পরে (বর্তমানে ১০টার পরিবর্তে ১১টা) করা হলে জনমনে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না; বরং এর ইতিবাচক প্রভাব বা সুফল হবে ব্যাপক।
ক্স একটি সিষ্টেম (প্রস্তাবিত দুটি অফিস টাইম) চালু করার এবং সহায়ক পদপেগুলো কঠোরভাবে পালনের মাধ্যমে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী দ্বারা এই সমস্যার সার্বিক সমাধান সম্ভব নয়।

শেষ কথা
উপরোক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, যানজট সমস্যার সমাধান করতে হলে সরকারের গৃহীত চলমান প্রকল্প যেমন ফুটপাতের উন্নয়ন, রাস্তা সংস্কার ও উন্নয়ন এবং ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ ও সংস্কার, মেট্রোরেল, ফাইওভার ও ওভারপাস নির্মাণসহ বর্তমান উন্নয়নমূলক কর্মকা- সচল রাখতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততার বাইরে গিয়ে অবিলম্বে দুই শিফটে অফিস সময় চালুর সাথে সাথে সহায়ক পদপেগুলোর বাস্তব প্রয়োগের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদপে গ্রহণ করলেই কেবল বর্তমান যানজট পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।
আশা করি, দেশ ও জাতির কল্যাণে যানজট সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সরকার ও সরকার সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখবেন।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট