অর্থনীতি

যেভাবে অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনে ঈদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
যেকোনো বড় উৎসবেই বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রাণচাঞ্চল্য লাভ করে। সবচেয়ে বেশি গতিশীলতা ল্য করা যায় বছরের দুই ঈদের সময়টায়। বিশেষত ঈদুল আজহা পালনে অর্থনীতিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন, ব্যবসাবাণিজ্যসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকা-ের প্রসার ঘটে। এ উৎসবে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ লেনদেনসহ বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালিত হয়, গোটা অর্থনীতি তথা দেশজ উৎপাদনব্যবস্থাপনায় যার ইতিবাচক প্রভাব পরিলতি হয়।
ঈদুল আজহায় প্রধানত ৫টি খাতে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনসহ বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালিত হয়, গোটা অর্থনীতি তথা দেশজ উৎপাদনব্যবস্থাপনায় যার শনাক্তযোগ্য প্রভাব পরিলতি হয়।
১. হজ পালন উপলে বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুল অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় দেড় লাখের কাছাকাছি মানুষ হজে যান। প্রতিজন হাজি গড়ে ৩ ল টাকা ব্যয় করলে এ খাতে মোট অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি। বৈদেশিক মুদ্রায় ৪১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। হাজিদের যাতায়াতসহ সৌদির ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রাতেই করতে হয়।
এর সঙ্গে হজের ব্যবস্থাপনা ব্যয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাংলাদেশি টাকা ও বিদেশি মুদ্রা ব্যয়ের সংশ্লেষ রয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরে এ উপলে লেনদেন ও সেবা-সূত্রে ব্যয় বাড়ে। গোটা সৌদি আরবের অর্থনীতি সেই প্রাচীনকাল থেকেই হজ মৌসুমের অর্থনৈতিক কর্মকা- বা ব্যবসাবাণিজ্য ঘিরে বা অবলম্বন করে আবর্তিত হতো এবং বর্তমানেও তার ব্যাপ্তি বাড়ছে বৈ কমছে না।
২. পশু কোরবানি উপলে জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক আর্থিক কর্মকা- পরিচালিত হয়ে থাকে। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৭৮ ল গরু ও খাসি কোরবানি হয়েছিল। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) ধারণা, এবার ৩০ ল গরু ও ৫৫ লাখ খাসি কুরবানি হয়েছে। গরুপ্রতি গড় মূল্য ৫০ হাজার টাকা দাম ধরলে এই ৩০ ল গরু বাবদ লেনদেন হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং ৫৫ ল খাসি (গড়ে ৫০০০ টাকা দরে) সাড়ে ২৭শ’ কোটি টাকা। অর্থাৎ পশু কোরবানিতে প্রায় সাড়ে ৪২ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।
কোরবানির পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় চাঁদা, টোল, বখশিস, চোরাকারবার, ফড়িয়া, দালাল, পশুর হাট ইজারা, চাদিয়া, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি ও বানানো এমনকি পশুর সাজগোজ বাবদও বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়ে থাকে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে ফর্মাল-ইনফর্মাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়।
৩. কোরবানিকৃত পশুর চামড়া আমাদের অর্থনীতিতে রপ্তানি বাণিজ্যে, পাদুকা শিল্পে পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই চামড়া সংরণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের কর্মযোজনা সৃষ্টি হয়। এই চামড়া সংগ্রহ সংরণ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে ১০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ঋণ দিয়ে থাকে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৮০-১০০ কোটি টাকা। এক্ষত্রে চামড়া নিম্ন দামে পাচার হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেটের কবল থেকে চামড়া ব্যবসাকে উদ্ধারের বিকল্প নেই। পত্রিকান্তরে প্রতিবেদনে প্রকাশ, প্রতিবেশী দেশ থেকে বাকিতে গরু সরবরাহ করা হয় কম দামে কাঁচা চামড়া পাচারের প্রত্যাশায়। সেই চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করে বেশি দামে বিদেশে রপ্তানির মুনাফা অর্জন করে তারা।
দেশে নিজেদের চামড়া প্রক্রিয়াকরণ এবং উপযুক্ত মূল্যে তা রপ্তানির প্রণোদনা সৃষ্টি করেই এ পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি লাভ ঘটতে পারে।
লবণ চামড়া সংরণের একটি অন্যতম উপাদান। সরকারকে প্রতি বছরই প্রায় ৪০ হাজার টন লবণ শুল্কমুক্ত আমদানির উদ্যোগ নিতে হয়, যাতে সিন্ডিকেট করে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়।
৪. কোরবানির পশুর মাংস আমিষজাতীয় খাদ্যের উপাদান এবং এই মাংসের বিলি-বণ্টন প্রক্রিয়ায় রয়েছে আর্থসামাজিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে বছরের একটি সময়ে সকলে আমিষপ্রধান এই খাদ্যের সন্ধান/সরবরাহ লাভ করে থাকে। মাংস রান্নার কাজে ব্যবহৃত মশলা বাবদ প্রায় ৩০০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে এ সময়ে। মশলার দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়ে ঈদ উদযাপনের ব্যয় ব্যবস্থাপনাকে বিরূপ পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করায়। সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে, ঈদ সামনে রেখে শুধু মিয়ানমার থেকে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার মশলা অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে।
৫. উপরে উল্লিখিত লেনদেনে দেশের ব্যাংকিং খাতে কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে তারল্যসংকটে পড়ে যায় আর্থিক খাত, কল মানি মার্কেট থেকে চড়া সুদে ধার-কর্জে নামে ব্যাংকগুলো।
চামড়া ঋণ থেকে শুরু করে ঈদের বোনাস বাবদ বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়। মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যায়। তাছাড়া গ্রামের লোকও ঈদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নিজেদের সম্পৃক্ত করে থাকে। ফলে ঈদকেন্দ্রিক এ অর্থ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে; যাতে করে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে সর্বত্র।
মোদ্দা কথা, হজ ও কোরবানি উপলে মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থায় যে ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয় ব্যাংকিং খাতে তা তারল্যসংকট সৃষ্টি করে এবং কলমানি মার্কেটে সুদের সূচকের ওঠানামা দেখে তা আঁচ করা যায়। এ সময়ে অবধারিতভাবে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবমতে, রিজার্ভ ১২ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য আমাদের উল্লসিত করে; হজ উপলে সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন সত্ত্বেও।
ঈদ উপলে পরিবহন ব্যবস্থায় বা ব্যবসায় কর্মতৎপরতা বেড়ে যায়। শহরের মানুষ আপনজনের সাথে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামে ছোটে। এক মাস আগে থেকে ট্রেন-বাস-লঞ্চের টিকিট বিক্রির তোড়জোড় দেখে বোঝা যায় এর প্রসার ও প্রকৃতি। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ দামে ফর্মাল টিকিট আর টাউট দালাল ও বিবিধ উপায়ে ইনফর্মাল টিকিট বিক্রির সার্বিক ব্যবস্থা বোঝা যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পরিবহন খাতে সাকুল্যে ২০০০ কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসা বা লেনদেন হয়ে থাকে ঈদ মৌসুমে। এটিও অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
এটি সবারই জানা কথা যে, অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহ, মুদ্রা লেনদেন, আর্থিক কর্মকা-ের প্রসারই অর্থনীতির জন্য আয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মুদ্রা সরবরাহ গতিশীলতা আনয়ন। ঘূর্ণায়মান অর্থনীতির গতিপ্রবাহে যেকোনো ব্যয় অর্থনীতির জন্য আয়। দেশজ উৎপাদনে এর থাকে অনিবার্য অবদান। যেকোনো উৎসব অর্থনেতিক কর্মকা-ে গতিশীলতা আনয়ন করে, মানুষ জেগে ওঠে নানান কর্মকা-ে, সম্পদ বণ্টনব্যবস্থায় একটা স্বতঃপ্রণোদিত আবহ সৃষ্টি হয়।