প্রতিবেদন

রোহিঙ্গা গণহত্যা ও বিতাড়নে ৪৫ সংস্থার এক কোটি ডলার বিনিয়োগ!

স্বদেশ খবর ডেস্ক
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে হত্যা ও বিতাড়নের মাধ্যমে এথনিক কিনজিং (জাতি নির্মূল) সম্পন্ন করতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে অন্তত এক কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার দিয়েছিল ৪৫টি কোম্পানি ও সংস্থা। ওই কোম্পানি ও সংস্থাগুলোই পরে রাখাইন রাজ্য পুনর্গঠনের কাজ পেয়েছে এবং বুলডোজার দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরসহ নাম-নিশানা নিশ্চিহ্ন করতে ভূমিকা রেখেছে।
মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সত্যানুসন্ধানী মিশন গত ৫ আগস্ট জেনেভায় ১১১ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য দিয়েছে।
জাতিসংঘের ওই মিশনের প্রতিবেদন আগামী মাসে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে উত্থাপন করা হবে। প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো মিয়ানমার বাহিনীর সঙ্গে প্রত্য ও পরোভাবে সম্পৃক্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত করে বৈশ্বিকভাবে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের কথা জেনেও ভারত, ইসরাইলসহ অন্তত ৭টি দেশ ও ১৪টি বিদেশি ফার্মের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়টি চিহ্নিত করেছে সত্যানুসন্ধানী মিশন। ওসব প্রতিষ্ঠান ও দেশের সহায়তায় মিয়ানমার বাহিনী কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ছাড়াই আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে।
মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক সত্যানুসন্ধানী মিশন বলেছে, নিরাপত্তা পরিষদ ও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উচিত, অবিলম্বে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী পরিচালিত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। ৭টি দেশের অন্তত ১৪টি প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সাল থেকে মিয়ানমারকে যুদ্ধবিমান, সাঁজোয়া যান, যুদ্ধজাহাজ, পেণাস্ত্র ও পেণাস্ত্র নিক্ষেপের সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে বলে উল্লেখ করে জাতিসংঘ নিযুক্ত মিশন তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আহ্বান জানিয়েছে।
মিয়ানমার বাহিনীর হাতে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম তুলে দেয়া ১৪টি ফার্মের মধ্যে ৫টিই চীনের। এ ছাড়া রাশিয়া ও ভারতের দুটি করে ফার্ম এবং উত্তর কোরিয়া, ফিলিপাইন, ইসরাইল ও ইউক্রেনের একটি করে ফার্ম মিয়ানমার বাহিনীকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।
জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী মিশন বলেছে, ওই ৭টি দেশ যখন মিয়ানমারকে অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে, তখন মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যে বেসামরিক লোকজনের ওপর ধারাবাহিকভাবে ও ব্যাপক মাত্রায় মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটিয়েছে। ২০১৬ সালের ২৫ আগস্টের পর ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করা সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
জাতিসংঘের ওই মিশনের প্রধান মারজুকি দারুসমান বলেন, এই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হলে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অর্থনৈতিক ভিত্তির দুর্বলতা ও সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতিবন্ধকতা দূর হবে। এছাড়া এটি কোনো ধরনের নজরদারি ছাড়াই সামরিক অভিযান চালানোর সমতা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি কমাবে এবং স্বল্প মেয়াদে জবাবদিহিতায় কাজে আসবে।
জাতিসংঘ মিশনের প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সবচেয়ে অস্বচ্ছ দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মিয়ানমার ইকোনমিক হোল্ডিংস লিমিটেড (এমইএইচএল) ও মিয়ানমার ইকোনমিক কো-অপারেশনকে (এমইসি) চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক মিয়ানমারের জ্যেষ্ঠ সামরিক অধিনায়ক ও সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সিনিয়র জেনারেল মিন অং হাইং ও উপসর্বাধিনায়ক ভাইস সিনিয়র জেনারেল সোয়ে উইন। জাতিসংঘের ওই মিশন গত বছরই ওই সামরিক অধিনায়কের বিরুদ্ধে জেনোসাইড, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারের সুপারিশ করেছে।
জাতিসংঘ মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের সহযোগী এমইএইচএল ও এমইসি ওষুধ, ইনস্যুরেন্স, পর্যটন, ব্যাংকিংসহ অন্তত ১২০ ধরনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের অধীনে অন্তত ২৬টি প্রতিষ্ঠান কাচিন ও শান রাজ্যে জেড ও রুবির খনি খননের কাজ পেয়েছে। মিয়ানমার বাহিনীর সঙ্গে প্রত্য ও পরোভাবে সম্পৃক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, জোরপূর্বক শ্রম দিতে বাধ্য করা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে।
মিশনের বিশেষজ্ঞ রাধিকা কুমারাস্বামী বলেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতাদের নিশ্চিত করা উচিত যে তারা মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন ও প্রভাবিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জেড ও রুবি কিনছেন না।
যে ৪৫টি কোম্পানি ও সংস্থা মিয়ানমার বাহিনীকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযানে অর্থায়ন করেছে তাদের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার সিডোটি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধসহ অন্যান্য অপরাধ সংঘটনে প্রত্য ও পরো ভূমিকা রাখার কথা মাথায় রেখেই তাদের ব্যাপারে তদন্ত হওয়া উচিত।
প্রতিবেদনে কেবিজেড গ্রুপ ও ম্যাক্স মিয়ানমার নামের দুটি কোম্পানির নাম এসেছে। রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ বাড়ানোর ল্েয বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার সীমান্তে বেড়া নির্মাণে ওই কোম্পানিগুলো অর্থায়ন করেছে। মিয়ানমার বাহিনীর সঙ্গে যৌথ অংশীদারির কাজ করছে এমন অন্তত ১৫টি কোম্পানিকে এবং কিছু না কিছু যোগাযোগ আছে এমন ৪৪টি কোম্পানিকে প্রতিবেদনে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জাতিসংঘ মিশন বলেছে, ওই কোম্পানিগুলো মিয়ানমার বাহিনীর আর্থিক সমতা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। মিয়ানমার থেকে পণ্য কেনা কোম্পানিগুলোর চিন্তা করা উচিত, তারা মিয়ানমার বাহিনীর অপকর্মে প্রকারান্তরে ভূমিকাই রাখছে।