প্রতিবেদন

সফলতার মানদ-ে বঙ্গবন্ধুর শাসনামল

বিশেষ প্রতিবেদক
১৯৬৩ সালে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরু হয়। এ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়নের উদ্যোগ নেন। বাঙালি জাতির ওপর দীর্ঘ বঞ্চনা, বৈষম্য আর শোষণের প্রোপটে রচিত হয় বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা কর্মসূচি; যা ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ হিসেবে আপামর বাঙালির প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়। কেউ কেউ ৬ দফাকে বাঙালি জাতির ‘ম্যাগনাকার্টা’ বলেও আখ্যায়িত করেন।
৬ দফার তাৎক্ষণিক পটভূমি হিসেবে ১৯৬৫ সাল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছিল সম্পূর্ণ অরতি। একই বছর মৌলিক গণতন্ত্রের নামে নির্বাচনি প্রহসন বাঙালিদের ভীষণ ক্ষুব্ধ করে। পরের বছর ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলের জাতীয় কনভেনশন লাহোরে অনুষ্ঠিত হয়। ওই কনভেনশনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৬ দফা কর্মসূচি উত্থাপনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। লাহোরে বাধা পেয়ে তিনি ঢাকার তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে গণমাধ্যমে ৬ দফার বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন।
৬ দফা নিয়ে অগ্রসর হওয়া এত সহজ ছিল না। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই একে সমর্থন করেননি। মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, পাকিস্তান পিপলস পার্টি এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। মওলানা ভাসানী ৬ দফাকে সিআইএর দলিল বলে অভিহিত করেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যদি গৃহযুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তবে দেশের সংহতি ও অখ-তা রার জন্য প্রয়োজন হলে অস্ত্রের মুখে জবাব দেয়া হবে।
এত ভয়ভীতি, হুমকি বঙ্গবন্ধুকে একটুও টলাতে পারেনি। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, ৬ দফার বাস্তবায়ন ছাড়া বাঙালির জাতীয় মুক্তি সম্ভব নয়। তাই এই অকুতোভয় বীর দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পেরেছিলেন, ‘সরাসরি রাজপথে যদি আমাকে একা চলতে হয়, চলব। কেননা ইতিহাস প্রমাণ করবে বাঙালির মুক্তির জন্য এটাই সঠিক পথ।’
আদতে স্বায়ত্তশাসন চাইলেও বঙ্গবন্ধুর মূল লক্ষ্য ছিলো স্বাধীনতা। ৬ দফা আন্দোলনের কারণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রুতে পরিণত হন। ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী মুজিব-ইয়াহিয়া সংলাপ সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ৬ দফা। সত্তরের বিজয়ের পরও শোষকরা বঙ্গবন্ধুকে মতায় বসতে দেয়নি। টালবাহানা চলতে থাকে একের পর এক। এসময় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পূর্ববাংলা পরিচালিত হতে থাকে। একাত্তরের ৩ মার্চ পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। এরপর ৭ মার্চ ল ল মানুষের জনসমুদ্রে বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের মহানায়ক ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণটি দেন। এর পরের ইতিহাস তো সারা বিশ্ব জানে। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ পরিণত হলো বাঙালির মুক্তিসনদে।
অবশেষে যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি বিজয় ছিনিয়ে আনে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। দেশ স্বাধীনের পর ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন বঙ্গবন্ধু। যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশকে পুনর্গঠিত করার কাজে হাত দেন এবং স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেতা, অর্থনৈতিক মুক্তির লে একটি অসাধারণ সংবিধান প্রণয়ন করেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাসহ নানা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন তিনি। সদ্যস্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে ৩ বছর দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। বাস্তবায়ন করেছিলেন অনেক অসাধ্য সাধন কর্মসূচির। একটি দেশ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য, বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর একটি সময়োপযোগী আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সম্ভাব্য সব পদপে গ্রহণ করেছিলেন। একটি রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় এমন কোনো বিষয় নেই, যা তিনি স্পর্শহীন রেখেছেন। বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছেন সব উন্নয়নের শক্ত ভিত হিসেবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বঙ্গবন্ধুর শাসনামল নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি এবং নতুন প্রজন্মের কাছে অনেকটা অন্ধকারেই রয়ে গেছে তার শাসনামল।
১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে কালবিলম্ব না করে রাতে তিনি পাকিস্তানের পিআইএর একটি বিমানে লন্ডন যাত্রা করে ৮ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টায় হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছান। অনেক আনুষ্ঠানিকতা শেষে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর রাজকীয় কমেট বিমানে ৯ জানুয়ারি সকালে দেশের উদ্দেশে রওনা হন বঙ্গবন্ধু। ১০ জানুয়ারি সকালে বঙ্গবন্ধু দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখানে সংপ্তি যাত্রাবিরতিতে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা এবং রাষ্ট্রপতি ভবনে সৌজন্য কথাবার্তার পর ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানেই যাত্রা করেছিলেন ঢাকার উদ্দেশে। ব্রিটিশ কমেট বিমানটি তেজগাঁও বিমানবন্দর স্পর্শ করে বিকেল ৩টায়। সেখান থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ বাঙালির ভালোবাসার পরশ ভেদ করে পৌঁছুতে তাঁর সময় লেগেছিল আড়াই ঘণ্টা। রেসকোর্সে লাখো জনতার মাঝ থেকে বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছেন সন্ধ্যা পৌনে ৬টায়।
এত দীর্ঘ পথযাত্রা, দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা, জনসভা, আবেগ- উচ্ছাস-কান্না বিনিময়ের পর ১১ জানুয়ারি থেকে বঙ্গবন্ধু সব কান্তি-ভাবাবেগ উপো করে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে দেশ পরিচালনার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেদিনই মন্ত্রিসভার সঙ্গে দু’দফা বৈঠক করেন এবং বৈঠকে সংবিধান প্রণয়নসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু অস্থায়ী সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ এবং নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে বস্তুত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাসহ সারাদেশ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলতে থাকে এবং সেনাবাহিনীর বাঙালি অংশ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের অপোয় থাকে।
১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ বাংলার জনগণ ও প্রগতিশীল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের দাবিতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের শাসনভার স্বহস্তে গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর পুনরায় শাসনভার গ্রহণ ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চের ধারাবাহিকতা বলা যেতে পারে।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সর্বত্র ছিল পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর ধ্বংসলীলার তচিহ্ন। দেশের মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের অভাব ছিল প্রকট। কলকারখানায় উৎপাদন শূন্যের কোটায়, যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি চালু রাখা এবং এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনসহ দেশের সমস্যা ছিল ব্যাপক। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ছিল বঙ্গবন্ধুর সামনে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ, যা তিনি সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেন।
স্বাধীনতা-উত্তরকালের বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে বিশ্বজুড়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ৫০ লাখ মানুষ অনাহারে প্রাণ হারাবে, দেখা দেবে দুর্ভি। এমনি এক ভয়াবহ সময়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ শাসনভার গ্রহণ করেছিল। নিঃসন্দেহে তাঁর পরিচালনায় আওয়ামী লীগ সরকার প্রাথমিক অসুবিধা ও সংকটগুলো কাটিয়ে উঠেছিলেন। দেশের প্রথম পাঁচসালা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সে অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রাথমিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে একটি সুনিশ্চিত পদেেপ এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য অর্জন করেছিল।
একনজরে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের উল্লেখযোগ্য কিছু দিক হলো:
মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন: যুদ্ধফেরত মুক্তি বাহিনীর জওয়ানদের কাজে লাগানোর জন্য বঙ্গবন্ধু ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী, মিলিশিয়া, রিজার্ভ বাহিনী সংগঠনের বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। এছাড়া দেশ গড়ার বিভিন্ন কাজে যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ প্রদান করেন।
ত্রাণ কার্যক্রম: রিলিফ ও পুনর্বাসনের জন্য বঙ্গবন্ধু দেশের বিভিন্ন স্থানে জনসংখ্যার ভিত্তিতে মঞ্জুরি দেয়ার ব্যবস্থা করেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ: মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র নিজেদের কাছে না রেখে তা ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সমর্পণের আহ্বান জানান। এতে সব মুক্তিযোদ্ধা সাড়া দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দেন।
স্বাধীন বাংলার প্রশাসনিক পদপে: ঢাকা মুক্ত হওয়ার পর একটা প্রশাসনিক শূন্যতা বিরাজ করছিল রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র। নিরাপত্তার বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু প্রত্যাবর্তনের পর প্রশাসনকে কর্মোপযোগী করে তোলেন।
ভারতীয় বাহিনীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক বিচক্ষণতার কারণে ১২ মার্চ ১৯৭২ ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রত্যাবর্তন করে।
১৯৭২ সালের সংবিধান: ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশ যে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তারই আদর্শ হিসেবে রচিত হলো রক্তে লেখা এক সংবিধান ৪ নভেম্বর ১৯৭২। দেশ স্বাধীন হওয়ার অল্প কিছুদিনের ভেতর একটি লিখিত সংবিধান প্রণয়ন ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের অন্যতম সফলতা। অনেক উন্নত দেশও স্বাধীন হবার এত অল্প সময়ের মধ্যে লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করতে পারেনি।
সাধারণ নির্বাচন: গণতান্ত্রিক ভাবধারা ফিরিয়ে আনতে ১৯৭৩ সালে দেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার।
প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পর দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের জনগণের দারিদ্র্য দূরীকরণ তথা অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে জাতির জনক প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের মূল লক্ষ ছিল দারিদ্র্য বিমোচন। এ জন্য যারা কর্মহীন বা আংশিক কর্মহীন তাদের সবার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া জাতীয় আয় বৃদ্ধির সঙ্গে এই আয় বণ্টনের জন্য যথাযথ আর্থিক ও মুদ্রানীতি প্রণয়নের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ছিল দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়।
সদ্যস্বাধীন দেশে জনগণের অত্যাবশ্যক পণ্যের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর (খাদ্যদ্রব্য, পোশাক, ভোজ্য তেল, কেরোসিন ও চিনি) উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।
কৃষির প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামোতে যুগোপযোগী রূপান্তর সাধনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন তিনি, যাতে খাদ্যশস্যের উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারে। কৃষিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে এবং শ্রমশক্তির শহরমুখী অভিবাসন বন্ধ হয়।
পররাষ্ট্রনীতি: বঙ্গবন্ধু পররাষ্ট্রনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরী মনোভাব নয়।’ দায়িত্বগ্রহণের প্রথম ৩ মাসের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ ৬৩টি দেশের স্বীকৃতি লাভ করা বঙ্গবন্ধুর দক্ষ পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম সফলতা। ৩ মাস ২১ দিনের মধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তান স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় ২ বছর ২ মাসের মধ্যে। সর্বমোট ১২১টি দেশ স্বীকৃতি প্রদান করে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন গঠন: দেশে ইসলামের যথার্থ শিা ও মর্মবাণী সঠিকভাবে প্রচার-প্রসারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামী আদর্শের যথাযথ প্রকাশ তথা ইসলামের উদার মানবতাবাদী চেতনা বিকাশের ল্েয একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা ছিল জাতির জনকের সুদূরপ্রসারী চিন্তার এক অমিত সম্ভাবনাময় ফসল।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার: বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ কোলাবরেটরস স্পেশাল ট্রাইবুন্যাল অর্ডার’ জারি করে। এতে দালাল, যোগসাজশকারী কিংবা কোলাবরেটরদের সংজ্ঞায়িত করা হয় এভাবে – প্রত্য বা পরোভাবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে বস্তুগত সহযোগিতা প্রদান বা কোনো কথা, চুক্তি ও কার্যাবলির মাধ্যমে হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করা।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা যুদ্ধের চেষ্টা করা। মুক্তিবাহিনীর তৎপরতার বিরুদ্ধে ও মুক্তিকামী জনগণের কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
পাকিস্তানি বাহিনীর অনুকূলে কোনো বিবৃতি প্রদান বা প্রচারে অংশ নেয়া এবং পাকিস্তানি বাহিনীর কোনো প্রতিনিধি দল বা কমিটির সদস্য হওয়া। হানাদারদের আয়োজনে উপনির্বাচনে অংশ নেয়া।
চার ধরনের অপরাধীর বিচার: পরবর্তীকালে একই বছরে এই আইন দুই দফা সংশোধন করা হয়। এই সংশোধনীতেও চার ধরনের অপরাধীকে মা করা হয়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে নেই, তাদের মা করা হয়। কিন্তু যারা লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যা এই চারটি অপরাধ করেছে, তাদের মা করা হয়নি।
১৯৭৩ সালে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩৭ হাজার ৪৭১ জনকে দালাল আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৮১৮টি মামলার সিদ্ধান্ত হয়। এতে একজনের মৃত্যুদ-সহ ৭৫২ দালাল দ-িত হয়। তৎকালীন সরকার আইনগত ব্যবস্থা ত্বরিত করার জন্য ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। বঙ্গবন্ধুর সাধারণ মা ঘোষণার পর লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে ১১ হাজার আটক থাকে।
উপরন্তু বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালের ১৯ জুলাই ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট’ জারি করেন, যা পরবর্তী সময়ে আইন হিসেবে সংবিধানে সংযোজিত হয় এবং অদ্যাবধি তা বহাল রয়েছে। ১৯৭২ সালের ১৮ এপ্রিল গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের ৪ নভেম্বর সংবিধানের ১২ ও ৩৮ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সংবিধানের ৬৬ ও ১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তথাকথিত ধর্ম ব্যবসায়ীদের ভোটাধিকার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার বাতিল করা হয়েছিল।
হজে প্রেরণ: ১৯৭২ সালে সৌদি আরবে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে ৬ সহস্রাধিক বাংলাদেশি মুসলমানকে হজ পালনে প্রেরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক চেষ্টায় স্বাধীনতার পর এত দ্রুত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে সৌদি আরবে হজযাত্রী প্রেরণ সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি: ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘২৫ বছর মেয়াদি’ বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
শিা কমিশন গঠন: কুদরাত-এ-খুদা শিা কমিশন গঠন ও শিানীতি প্রণয়ন।
যমুনা সেতু: ১৯৭৩ সালের ১৮-২৪ অক্টোবর জাপান সফরকালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কাকুই তানাকার সঙ্গে দ্বিপীয় আলোচনার মাধ্যমে যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণের সূচনা করেন।
বিভিন্ন সংস্থার সদস্যপদ গ্রহণ: বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে জাতিসংঘের বেশিরভাগ সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্যপদ গ্রহণ করা হয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পুনর্গঠন: স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি আধুনিক সুসজ্জিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কার্যকর পদপে গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু।
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ: ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাদেশের ১৩৬তম সদস্যপদ লাভ ও ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন।
প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৪-২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন।
ঐতিহাসিক কিছু জনহিতকর পদপে: ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ, ৫ হাজার টাকার ওপরে কৃষিঋণ মওকুফ এবং ধনী-গরিবের ব্যবধান কমিয়ে এনে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ল্েয জমি মালিকানার সিলিং পুনর্র্নির্ধারণ ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের ঐতিহাসিক পদপে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা: বঙ্গবন্ধু সরকার নগর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূরীকরণের পদপে হিসেবে প্রাথমিকভাবে ৫০০ ডাক্তারকে গ্রামে নিয়োগ করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আইজিএমআর শাহবাগ হোটেলে স্থানান্তরিত হয়। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার ল্েয থানা স্বাস্থ্য প্রকল্প গ্রহণ বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদপে হিসেবে আজও স্বীকৃত।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিল্প-সংস্কৃতিঋদ্ধ সৃজনশীল মানবিক বাংলাদেশ গঠন এবং বাঙালির হাজার বছরের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ধরে রেখে আরো সমৃদ্ধ করার ল্েয বাংলাদেশি শিল্পকলা একাডেমি গঠন করেন। এই একাডেমি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান।
বৈদেশিক বাণিজ্য শুরু: বৈদেশিক মুদ্রার শূন্য রিজার্ভ নিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকার যাত্রা শুরু করে। এছাড়া জোটনিরপে আন্দোলন, কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে বঙ্গবন্ধু তাঁর সুদ নেতৃত্বের ছাপ রাখতে সমর্থ হন।
পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধ এবং বিশ্বশান্তির প্রতি ছিল তাঁর দৃঢ় সমর্থন। এ েেত্র ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালে বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তিপদক প্রদান করে।
দুর্নীতির বিরদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা: ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ছেয়ে যাবে। দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চোরাচালানি, মজুদদার, কালোবাজারি ও মুনাফাখোরদের সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু আখ্যায়িত করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এদের শায়েস্তা করে জাতীয় জীবনকে কলুষমুক্ত করতে না পারলে আওয়ামী লীগের দুই যুগের ত্যাগ-তিতিা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দানের গৌরব ম্লান হয়ে যেতে পারে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়তে মাত্র সাড়ে ৩ বছর সময় পেয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নানা সমস্যা ও প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে সদ্যস্বাধীন দেশ পুনর্গঠন করতে তিনি যেভাবে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে আতœনিয়োগ করেছিলেন সেটা আজও অবিস্মরণীয়। তাইতো বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজও মাঝেমধ্যে সভা-সেমিনারে বলেন, বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই দেশ পরিচালনা করছি আমি।