আন্তর্জাতিক

আমাজনে আগুন: ব্রাজিলকেই দুষছে বিশ্ব

স্বদেশ খবর ডেস্ক
ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার বনাঞ্চলে সৃষ্ট দাবানলের মতো আগুন আগে কখনো লাগেনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বন আমাজনে। এই আগুনে আমাজন বনাঞ্চলের শাখা-প্রশাখা, গাছপালা ও অন্য সব প্রাণও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই আগুনের কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাজিলের বন উজাড় করে দেয়ার মানসিকতা। রেইন ফরেস্ট হওয়ায় আমাজনে আগুন লাগার কোনো কারণই নেই। ব্রাজিল কৃষি জমি বাড়ানোর এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ নামে খ্যাত আমাজনে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।
আমাজনে এই আগুনের ফলে গাছ কেটে বন উজাড়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। ১৯৭০ সাল থেকে আমাজনে বন উজাড় করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৯০ সালে তা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সর্বশেষ ২০০০ সালে ব্রাজিল উন্নয়নের নামে শুরু করে নতুন করে বন উজাড় করা।
২০০৪ সালে ব্রাজিল একাই আমাজনের ১১ হাজার বর্গমাইল বনাঞ্চল খালি করে দেয়। পরিসংখ্যান মতে, ব্রাজিলের মোট বনাঞ্চলের ৬০ শতাংশই তখন ধ্বংস করে ফেলা হয়। বাকি ৪০ শতাংশ ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে ব্রাজিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বোলসোনারের আমলে।
২০১৪ সাল থেকে উন্নয়নের নামে বন ধ্বংসের পাঁয়তারা নতুন করে শুরু হয়। গত বছর দেশটির অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ বনাঞ্চলের মধ্যে ২ হাজার ৯০০ বর্গমাইল ধ্বংস করা হয় বলে জানিয়েছে ব্রাজিলের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ (আইএনপিই)। চলতি বছরের জুলাই মাসে ৮৭০ বর্গমাইলের বেশি এলাকার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
চলতি বছর রেকর্ড ৭২ হাজারটি অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে আমাজনে। এই মুহূর্তে এই জঙ্গলের বিভিন্ন প্রান্তে ২৫ হাজারেরও বেশি এলাকায় এক সঙ্গে আগুন জ্বলছে। এই আগুন বিপুল পরিমাণ কার্বন ছড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসে।
কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরেও আগুনের কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে গেছে। ব্রাজিলের স্পেস এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, চলতি বছর আমাজনে অগ্নিকা-ের ঘটনা অন্তত ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে আমাজন বন খুব স্যাঁতসেঁতে অবস্থায় থাকে। ফলে প্রাকৃতিক কারণে বড় ধরনের অগ্নিকা- সেখানে খুব কমই ঘটে। রেইনফরেস্ট অ্যালায়েন্স জানায়, শুকনো মৌসুমেও কেউ যদি আমাজনে আগুন লাগিয়ে দেয় তবে তা খুব বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে না। কিন্তু কেউ যদি কোনো এলাকার সব গাছ কেটে ফেলে এবং এগুলো রোদে শুকানোর পর আগুন ধরিয়ে দেয় তবে নিমেষেই বিশাল অগ্নিকা-ের সূত্রপাত হবে এবং বড় ধরনের তি সংঘটিত হবে।
রেইনফরেস্ট অ্যালায়েন্সের মতে, অগ্নিনিয়ন্ত্রক বাস্তু সংস্থান থেকে অগ্নিপ্রবণ বনভূমিতে পরিণত হচ্ছে আমাজন। আমাজনের গাছপালা এবং প্রাণ-প্রকৃতি এ ধরনের আগুনের সঙ্গে পরিচিত নয়। তাই আগুন লাগলে খুব সহজেই এগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। উত্তর আমেরিকা মহাদেশের বনাঞ্চলগুলো এেেত্র ব্যতিক্রম। কারণ, ওসব বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে অহরহই অগ্নিকা- ঘটে। ফলে ওই সব অঞ্চলের গাছপালা এবং পশুপাখিও আগুনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা শিখে গেছে।
রেইনফরেস্ট অ্যালায়েন্স মনে করে, প্রাকৃতিক কারণে আমাজনে বড় ধরনের আগুন আদতে সম্ভব নয়, যদি না গাছ কেটে এগুলোকে পরিকল্পিতভাবে পুড়িয়ে ফেলা হয়।
আমাজনে এবারের আগুনের প্রধান কারণ হতে পারে ফার্মিং ও কৃষিজমি সৃষ্টি করার জন্য বন উজাড়। আমাজনের আগুন পরিকল্পিতও হতে পারে। শুকনো মৌসুম আগুন ছড়াতে বেশি কাজ করে।
ফার্মিং করার জন্য আমাজন বন ধ্বংস করার এই সংস্কৃতি শুরু হয়েছে গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাধারণ কৃষকদের গবাদি পশুপালনের জন্য নতুন জমির প্রয়োজন না হলেও আমাজন অঞ্চলে পশু ফার্মিংয়ের মতো একটি ধারণা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফলে, বন উজাড় করে চারণভূমি সৃষ্টি করলে একসঙ্গে অসংখ্য গবাদি পশুর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। ব্যবসায়িক কারণে একটি নব্য গোষ্ঠির দৃষ্টি আমাজনের মাটিতে পড়েছে। এই অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং এরই মধ্যে সম্মিলিতভাবে আমাজনের বিশাল একটি অঞ্চলের বনভূমি তারা সাবাড় করে দিয়েছে। এেেত্র দেখা গেছে, বন ডাকাতরা কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকাকে বেছে নিয়ে ওই স্থানের সব গাছ কেটে ফেলে। কেটে ফেলা গাছগুলো কিছুদিন পড়ে থাকে জঙ্গলে। এগুলো রোদে শুকায়। পরে এগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এতে নিমেষেই জঙ্গলাকীর্ণ একটি এলাকা বিরানভূমিতে পরিণত হয়। এভাবে, বন ধ্বংসকারীরা বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি কিংবা পশুপালনের জায়গা পেয়ে যায়।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ব্রাজিলের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য অলাভজনক বনভূমির প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তার প্রশাসন আমাজনের বনাঞ্চল সুরার ব্যবস্থা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে মানুষ খুব সহজেই যে যার মতো বনভূমি ধ্বংস করে জায়গা ফাঁকা করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট বলসোনারো এ বছর আমাজনে অগ্নিকা- বাড়ার কারণ হিসেবে কোনো প্রমাণ ছাড়াই এনজিওগুলোকে দায়ী করেছেন। তার মতে, এই সংগঠনগুলো তার সরকারকে বিপদে ফেলার জন্যই এমন কাজ করছে।
বলসোনারো বলেন, সম্ভবত, আমি নিশ্চিত নই যদিও ওই মানুষগুলো (এনজিও কর্মী) আমাকে এবং ব্রাজিল সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য কিছু দুষ্কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন বলসোনারো। এনজিওদের অবৈধ কর্মকা- সম্পর্কে কোনো প্রমাণ দিতে না পারলেও তিনি বলেন, পৃথিবীজুড়ে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তিনি এই যুদ্ধকে তথ্যযুদ্ধ হিসেবেও অভিহিত করেন।
২০১৪ সাল থেকে ব্রাজিলে যে হারে আমাজন বন ধ্বংস হয়েছে এবার তার হার অন্তত ৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এর কারণ অর্থনৈতিক সংকট এবং ব্রাজিল সরকারের এ সংক্রান্ত নিয়মনীতির লঙ্ঘন। এই লঙ্ঘনের শুরুটা হয়েছে ২০১৮ সালে ব্রাজিলের জাতীয় নির্বাচনে জাইর বলসোনারোর বিজয়ের পর থেকেই।
বিজয়ী হওয়ার পর বলসোনারো বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন। সমালোচকরা বলেন, এসব সিদ্ধান্ত মানবাধিকার এবং পরিবেশ রায় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজয়ের পরপরই মন্ত্রিপরিষদ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে বেশ দুর্বল করে দেন বলসোনারো। ফলে বন সুরায় বিভিন্ন নীতিমালা এবং সংরণবাদী গোষ্ঠীগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে। গত মাসজুড়ে বনভূমি সুরায় বিভিন্ন তহবিলে অর্থায়ন কমানো এবং এ সংক্রান্ত বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিলুপ্তির ঘোষণা দেয় ব্রাজিল সরকার। এমনকি বন ধ্বংস এবং অগ্নিকা- রোধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত কয়েকটি কমিশনকেও বিলুপ্ত করা হয়েছে। আর এসব কারণে আমাজনে আগুনের জন্য এককভাবে ব্রাজিলকে দুষছে পুরো বিশ্ব।