প্রতিবেদন

আমাজন ও বাণিজ্য ইস্যুতে উত্তপ্ত ছিল জি-৭ সম্মেলন

স্বদেশ খবর ডেস্ক
বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট ‘জি-৭’। এই জোটের ৩ দিনব্যাপী সম্মেলন ফ্রান্সের দ্বীপশহর বিয়ারিজে গত ২৬ আগস্ট শেষ হয়েছে। ২৪ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া জোটের ৪৫তম এই সম্মেলনে আমাজন বনাঞ্চলে দাবানাল এবং বিশ্ব বাণিজ্য ইস্যুসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর উত্তপ্ত আলোচনা হলেও ব্যাপক মতানৈক্যের কারণে সম্মেলন প্রায় নিষ্ফল হয়েছে বলা চলে।
বিশ্ব গণমাধ্যমগুলোর খবরে জানা যায়, সাম্প্রতিক ইরান সংকট থেকে শুরু করে জি-৭ গ্রুপে পুনরায় রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব এবারের সম্মেলনে আলোচনায় আসে। বিশ্বব্যাপী চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ, ব্রেক্সিট ইস্যু, জলবায়ু সংকট, আমাজনের দাবানলসহ একাধিক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
আমাজনে দাবানল ইস্যুসহ দু-একটি ব্যাপারে কর্মপন্থা নির্ধারণের েেত্র একমত হতে দেখা যায় জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেয়া বিশ্ব নেতাদের। এছাড়া বৈষম্য, বিশেষ করে লিঙ্গ বৈষম্য, জি-৭ ও আফ্রিকার যৌথ অংশীদারিত্ব, জীববৈচিত্র্য ও ডিজিটাল মাধ্যমের মুক্ত, অবাধ ও নিরাপদ রূপান্তরের বিষয়েও একমত হন তারা।
জি-৭ গ্রুপ ‘পৃথিবীর ফুসফুস’খ্যাত আমাজনে চলমান দাবানল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। এ ব্যাপারে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেয়ার বোলসোনারোকে সহায়তার আশ্বাস দেন বিশ্ব নেতারা। আমাজন বনাঞ্চলে পুনরায় বৃরোপণেও তারা সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলে জানান। শর্তসাপেক্ষে বিদেশি অর্থসাহায্য নিতে রাজি হয় ব্রাজিল। সহায়তার ২২ মিলিয়ন ডলার অর্থ কিভাবে ব্যয় হবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ থাকলেই শুধু আমাজন বনাঞ্চলের দাবানলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য পাওয়া বিদেশি ত্রাণ গ্রহণ করবে দেশটি। এর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর করা এক মন্তব্যের জেরে এ সহায়তা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেয়ার বোলসোনারো।
জি-৭ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের আকস্মিক উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, তেহরানের সঙ্গে পশ্চিমাদের পরমাণু চুক্তি ভেস্তে যাওয়া এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউরোপের করণীয় নিয়ে সম্মেলনের ফাঁকে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে ২৫ আগস্ট সম্মেলনে উপস্থিত হন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
জি-৭ সম্মেলনে জাভেদ জারিফের ‘আকস্মিক’ উপস্থিতি ইরানের পরমাণু চুক্তি রা বিষয়ক আলোচনায় নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে। ফ্রান্সের সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ইরান প্রশ্নে প্রধান করণীয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া একমত হয়েছেন অন্য বিশ্ব নেতারা। যুক্তরাষ্ট্র জানায়, এ ব্যাপারে তাদের করণীয় তারাই নির্ধারণ করবে। অন্যদিকে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিলে তাদের পুরোপুরি পরমাণু চুক্তি মেনে চলতে হবে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানান, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি রায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে – এটি নিশ্চিত করার ব্যাপারে কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়েছে।
জি-৭ গ্রুপে পুনরায় রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে প্রস্তাব তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ইউরোপ ও কানাডা এ ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখায়। আপত্তি হিসেবে তারা ‘অবৈধভাবে’ রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের বিষয়টি সামনে আনে, যে কারণে ২০১৫ সালে জি-৭ থেকে বহিষ্কার করা হয় রাশিয়াকে।
এদিকে ব্রেক্সিট ইস্যু ও নতুন বাণিজ্য চুক্তি বিষয়ে যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বরিসকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য খুব দ্রুত অভূতপুর্ব বিশাল এক বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে। এর কারণ হিসেবে ট্রাম্প বলেন, যেহেতু কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে যুক্তরাজ্যের কোনো বাধা নেই, সেজন্য এটি সম্ভব হবে। এ ধরনের বাধা আছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) েেত্র। ট্রাম্পের এ মন্তব্যকে ইইউর সমালোচনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে দহরম মহরম দেখা গেলেও ব্রেক্সিট ইস্যুতে ইউরোপের মিত্র দেশগুলোকে হতাশ করেছেন বরিস জনসন।
বরিস বলেন, আগামী ৩১ অক্টোবর তার দেশ যদি কোনো চুক্তি ছাড়া ইইউ থেকে বেরিয়ে যায়, সেেেত্র তিনি ব্রেক্সিট বিল বাবদ কোনো টাকাপয়সা দিতে পারবেন না। যদিও ইইউ সূত্র জানায়, বৈধভাবেই যুক্তরাজ্যের কাছে ইইউর ৩৯ বিলিয়ন পাউন্ড পাওনা। এ পাওনা মেটাতে ব্যর্থ হলে, এটি ঋণ হিসেবে থেকে যাবে।
এসব ছাড়াও বাণিজ্যযুদ্ধ ও জলবায়ু নিয়ে আলোচনা হয় জি-৭ সম্মেলনে। এসব প্রসঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয় বাকিদের। ডোনাল্ড ট্রাম্প মতায় আসার পর থেকে একের পর এক ইরান, চীন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের ওপর বাণিজ্যকর, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেই চলেছেন। জলবায়ু প্রশ্নেও বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির ব্যাপারটিকে তিনি তেমন বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না বলে নানা সময়ে বলেছেন। এছাড়া ফেসবুক, গুগলের মতো ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে করারোপ করার ব্যাপারে ফ্রান্সের প্রস্তাব থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র সে ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে।
জি-৭ সম্মেলন শুরুর আগে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রধান ডোনাল্ড টাস্ক এবারের সম্মেলনকে অনেক জরুরি বিষয়ে একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার েেত্র গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু প্রত্যাশিত সে সব সাফল্যের মুখ না দেখেই পর্দা নেমেছে ৪৫তম জি-৭ সম্মেলনের।