প্রতিবেদন

এবার ভারতে বিদ্যুৎ রপ্তানির প্রস্তাব বাংলাদেশের

নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় বিদ্যুৎ সংকটে ভুগতো বাংলাদেশ। চাহিদা সামাল দিতে পাশের দেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও শুরু হয়। এখন বিদ্যুৎ রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১০ বছরের নানা উদ্যোগে এই সক্ষমতা অর্জন হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারতের কাছে বিদ্যুৎ রপ্তানির প্রস্তাব দেশটিকে দেয়া হয়েছে।
রাজধানী ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গত ২৬ আগস্ট ভারত-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ ভারতকে বিদ্যুত রপ্তানির প্রস্তাব দেয়।
গ্রীষ্ম মৌসুমে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১২ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। তবে উৎপাদনমতা ২২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। আর শীতে বিদ্যুতের চাহিদা কমে দাঁড়ায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। তখন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখলেও তাদেরকে কিছু অর্থ দিতে হয়। এই সময়ে নয়াদিল্লির কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির বিষয়ে আগ্রহ আছে ঢাকার।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শীত মৌসুমে ৬৫ ভাগ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকে আর গ্রীষ্মে বন্ধ থাকে ৪৫ ভাগ। ভারত বড় দেশ হওয়ায় তারা এই বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ করে দিতে পারে। এমন চিন্তা থেকেই এই প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ভারত সম্প্রতি আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের নীতি সংশোধন করেছে। যেখানে বিদ্যুৎ বিনিময়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভারত শুধু বিদ্যুৎ রপ্তানিই নয়, প্রয়োজনে আমদানিও করতে পারবে।
পিডিবির চেয়ারম্যান খালিদ মাহমুদ বলেন, বৈঠকে আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। ভারত বলছে এ বিষয়ে একটি যৌথ কারিগরি দল বিস্তারিত সমীা চালাবে। ভারতের যেসব অঞ্চল বাংলাদেশের নিকটবর্তী ওইসব এলাকায় চাইলে বাংলাদেশ থেকে বিদ্যুৎ নিতে পারে।
বৈঠক সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ করা। দুই দেশের সঞ্চালন একীভূত করা বা সিনক্রোনাস ইন্টারকানেশন দু’ভাবে করা যায়। একটি সরাসরি, অন্যটি হাইভোল্টেজ সাবস্টেশনের মাধ্যমে। কিন্তু একটি ৫০০ মেগাওয়াটের হাইভোল্টেজ সাবস্টেশন নির্মাণে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। এত বেশি ব্যয় করে ভারত বাংলাদেশ থেকে বিদ্যুৎ নিতে আগ্রহী হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। সেেেত্র আরও উন্নত ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বাংলাদেশকে।
বৈঠকে বলা হয়, ভারতের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ফ্রিকোয়েন্সি ৪৯ দশমিক ৯ হার্জ থেকে ৫০ দশমিক ১ হার্জ। সেখানে বাংলাদেশের ফ্রিকোয়েন্সি ৪৯ দশমিক ৫ থেকে ৫০ দশমিক ৫ হার্জ। অর্থাৎ ভারতের ফ্রিকোয়েন্সি দশমিক এক হলেও বাংলাদেশের তা এক। ভারতে বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে হলে ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ করে ভারতের পর্যায়ে উন্নীত হতে হবে।
বৈঠকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের সঞ্চালন লাইন নির্মাণ নিয়ে আলোচনা হয়। এর আগে পার্বতীপুর দিয়ে বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করার চিন্তা করা হলেও এখন সৈয়দপুরের পূর্ব সাদিপুর সাবস্টেশনের মাধ্যমে সংযুক্ত করা যায় কি না সে বিষয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। তবে এজন্য আরও সমীা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে।
বৈঠকে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির েেত্র সব ধরনের সিডি, ট্যাক্স ও ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানানো হলেও প্রতিনিধি দল বলছে বিষয়টি রাজস্ব বিভাগের। এেেত্র তাদের কিছু করণীয় নেই। বিষয়টি তারা রাজস্ব বিভাগকে অবহিত করবে।
আমদানির শুরুতে ভারত সব ধরনের কর অব্যাহতি দিলেও এখন বাংলাদেশকে কর দিয়ে বিদ্যুৎ আনতে হচ্ছে। আইপিপি বিদ্যুতে বাংলাদেশ কর অব্যাহতি দিয়ে থাকে। ফলে একই ধরনের সুবিধা ভারতের কাছ থেকেও চাওয়া হচ্ছে।
বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের বিদ্যুৎ সচিব সুভাস চন্দ্র গার্গ বলেন, দ্রুত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসবে বলে আমরা আশা করছি।
বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, আমরা দুই পই এমন কিছু জায়গা চিহ্নিত করেছি যেখানে কাজ করলে উভয় দেশ লাভবান হবে।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার আগ পর্যন্ত বিদ্যুতের জন্য হাহাকার ছিল। তবে ১০ বছরের ব্যববধানে বাংলাদেশ চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, যা এখন ভারত ও নেপালে রপ্তানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতের চাহিদার কথা চিন্তা করে আরো নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি ভারত থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি করছে সরকার। ২০০৯-এ দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বন্ধুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চায়। দেশটির সরকারি খাত থেকে ওই বিদ্যুৎ দেয়া হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ দেশটির বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে আরও ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে। এখন ভারত থেকে এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে বাংলাদেশ।
আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের বড় দুই কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসছে। এর মধ্যে পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র আগামী ডিসেম্বর থেকে উৎপাদন শুরু করছে। ফলে এক সঙ্গে বিদ্যুতের উৎপাদন অনেকটা বেড়ে যাবে। এতে করে আরও বেশি কেন্দ্রকে অলস বসে থাকতে হবে। সরকারের প্রস্তাবে ভারত সাড়া দিয়ে বিদ্যুৎ কিনতে আগ্রহী হলে তা হবে বাংলাদেশের জন্য নতুন মাইলফলক।
এদিকে চাহিদা না থাকায় বিদ্যুৎ আমদানির জন্য আর কোনো ব্যয়বহুল হাইভোল্টেজ সাবস্টেশন নির্মাণ করতে আগ্রহী নয় বাংলাদেশ। ফলে ত্রিপুরা থেকে আরও ৩৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির প্রকল্পটি বাতিল করে দিয়েছে বাংলাদেশ। এখানে একটি হাইভোল্টেজ সাবস্টেশন নির্মাণে বাংলাদেশের ব্যয় হবে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ত্রিপুরা থেকে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। ভারতের ঝাড়খ-ে আদানি বাংলাদেশের জন্য যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে তা সরাসরি এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে বাংলাদেশে আসবে। ফলে সেখানে নতুন করে কোন সাবস্টেশন নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। ওই বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা বাংলাদেশের আদলেই তৈরি হবে।