রাজনীতি

দীর্ঘায়িত হচ্ছে খালেদা জিয়ার কারাবাস: অনিশ্চিত গন্তব্যে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি আবারও ঝুলে গেছে। সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ চলে যাবেন Ñ কিছুদিন আগে বিষয়টি বেশ আলোচনায় থাকলেও এ নিয়ে এখন আর আওয়ামী লীগ-বিএনপি কারোরই কোনো কথাবার্তা নেই। বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত ৭ এমপির সংসদে যোগ দেয়া না দেয়া প্রশ্নে খালেদা জিয়ার জামিন বা প্যারোলে মুক্তির যে সম্ভাবনা জেগে উঠেছিল তা এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। বিএনপি নেতারাই স্বীকার করেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে তারা জনগণের সম্পৃক্ততা অর্জন করতে পারেননি। আইনি প্রক্রিয়ায়ও জামিনের সম্ভাবনা দেখছেন না খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। দেখেশুনে মনে হচ্ছে খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে খালেদাবিহীন বিএনপি এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকেই হাঁটছে। তাছাড়া দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করার কারণে বিদেশ থেকে দলীয় কর্মকা- সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করাটা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমতাবস্থায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে বিএনপির অন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে সমন্বয়হীনতা ও ভুল বুঝাবুঝি এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা; অর্থাৎ দলে কেউ কাউকে মানতে না চাওয়ার সংস্কৃতি চলছে। ফলে সারাদেশের তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা ও দলীয় কর্মকা-ে নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তাই দলের এমন দুরবস্থার কারণে বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীই এখন যেকোনো কিছুর বিনিময়ে খালেদা জিয়ার কারমুক্তির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা এখন আইনিভাবে না হলে সরকারের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে হলেও দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি চাইছে। এ প্রসঙ্গে নোয়াখালী জেলার বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা মো. জয়নাল আবেদীন স্বদেশ খবরকে বলেন, দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে যেকোনো কিছুর বিনিময়ে চেয়ারপারসনের কারামুক্তি প্রয়োজন; অন্যথায় বর্তমান নেতৃত্ব দলকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না।
দলের নেতাকর্মীদের মনোভাবের কথা ভেবে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির বিষয়ে কিছুদিন আগেও বিএনপির প্রভাবশালী দুই নেতা ও সরকারের এক উপদেষ্টার মধ্যে গোপন আলোচনা হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে ওই আলোচনার বিষয়বস্তু আজ পর্যন্ত খোলাসা না হলেও সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্যে প্যারোল এবং বিএনপি নেতাদের কথায় জামিনে মুক্তির দাবির বিষয়টি দৃশ্যমান হয়। তবে রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমান সরকারের অধীনে দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সংসদে যোগদানের মাধ্যমে সংসদকে বৈধতা দানের পরবর্তী সময়ে এসে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি নিয়ে সরকারের সাথে বিএনপির দরকষাকষির সুযোগ অনেক কমে যায়। বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সুলতান মোহাম্মদ মনসুর এবং মো. জাহিদুর রহমানের সংসদে যোগ দেয়ার ঘটনায় উল্টো বিএনপিই সংসদে যোগদানের জন্য চাপের মুখে পড়ে যায়।
তাছাড়া সরকারের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে ভূমিকা পালনকারী বিএনপি নেতারা বিষয়টি কিভাবে হ্যান্ডল করেছেন তা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। কারণ খালেদা জিয়া জামিনে, নাকি প্যারোলে মুক্তি নেবেন Ñ সে বিষয়টি সরকারের সঙ্গে আলোচনার আগেই ঠিক করা উচিত ছিল। বিশেষ করে খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি চান এ কথা বিএনপির ভেতরে ও বাইরে কেউ বিশ্বাস করে না। আবার বিএনপি নেতারা প্যারোলের কথা তাদের বক্তব্যে প্রকাশ্যে কখনও বলেননি। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রীসহ সরকারের একাধিক নেতা বলেছেন, প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে তাদের আপত্তি নেই। তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘কাউকে তো জোর করে প্যারোল দেয়া যায় না।’ এতে বোঝা যায়, সরকার ও বিএনপির চাওয়ার মধ্যে বেশ ফারাক ছিল।
এখন এটা স্পষ্ট যে, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তির বিষয়টি বেশ কিছুদিন আলোচনা ও গুঞ্জনের পর আবারও ইস্যুটি চাপা পড়ে গেছে। ফলে বিএনপির ভেতরে ও বাইরে প্রশ্ন উঠেছে, এবারও কী খালেদার মুক্তির বিষয়টি সঠিকভাবে হ্যান্ডল করতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি, নাকি তারা সরকারের ফাঁদে পা দিয়েছে?
বিএনপির ৭ সদস্য সংসদে যোগ দেবে কী দেবে না Ñ এমন সন্ধিক্ষণে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি খুব ভালোভাবেই সামনে চলে আসে। ওই সময় সরকারি দল এবং বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের সূত্র ধরে জনমনে এমন ধারণা জন্মে যে, সংসদে যোগদানের সঙ্গে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির যোগসূত্র রয়েছে। অথচ বিএনপি সংসদে যোগদান করলেও খালেদা জিয়ার কারামুক্তি ঘটেনি। বিষয়টি নিয়ে এখন তেমন আলোচনাও নেই।
খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কথা বলতে বিএনপি বহু আশা নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি বানিয়ে সংসদে পাঠায়। কিন্তু বিএনপির আশায় গুড়ে বালি ছিটিয়ে দেন রুমিন। খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কথা বলার চেয়ে ক্ষমতার হালুয়া রুটির ভাগ নেয়ার জন্য তিনি লালায়িত হয়ে ওঠেন। এমপি হিসেবে শপথ নেয়ার পরপরই সরকারকে অবৈধ বলে মাত্র দুই মাসের মাথায় তিনি সেই ‘অবৈধ’ সরকারের কাছেই প্লট চেয়ে বসেন। তথ্যটি ফাঁস হয়ে গেলে বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে রুমিন ফারহানার মায়াকান্না স্রেফ লোকদেখানো। হালুয়া রুটির ভাগ প্রশ্নে বিএনপি অন্যান্য নেতার সঙ্গে রুমিন ফারহানার কোনো পার্থক্যই নেই।
রুমিন ফারহানা যা-ই করুক, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সরকারের সঙ্গে দর কষাকষিতে বিএনপির নেতারা যে ব্যক্তিগত লাভালাভের বিষয়কে প্রাধান্য দেন তা স্পষ্ট বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবীদের কথাবার্তায়ও।
তাদের অনেকেই বলছেন, বিএনপির পে সরকারের সঙ্গে ডিল কখনোই পরিকল্পিতভাবে হয়নি। সুনির্দিষ্টভাবে আলোচনা বা সমঝোতা করতে বিএনপি নেতারা গত দেড় বছর ধরে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে বিএনপি নেতারা আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে, এমনকি জনগণের সিমপ্যাথি অর্জনেও দলটির নেতারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে বিএনপি নেতাদের কার্যক্রমে সবসময়ই একটা ফাঁক যেন থেকেই যাচ্ছে। আর সেই ফাঁক দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে নেতাদের ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের বিষয়টি। ফলে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি হয়ে যাচ্ছে দীর্ঘায়িত।