প্রতিবেদন

ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাল রপ্তানির উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারের নানামুখী উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাধারণ কৃষকের পরিশ্রমের ফলে দেশে এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু ধানের ভালো দাম না পাওয়ায় কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ নিয়ে তাদের আক্ষেপ ও অভিযোগের শেষ নেই। তাই কৃষকের হাতে ধানের ন্যায্যমূল্য তুলে দেয়ার চেষ্টা হিসেবে এবার চাল রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিগগিরই ফিলিপাইনে ১ লাখ টন চাল রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। গত ২২ আগস্ট রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় কৃষিমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
কৃষক পর্যায়ে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে গত ১১ জুলাই চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে ২ লাখ টন সেদ্ধ চাল রপ্তানি করার বিষয়ে পরিপত্র জারি করে। রপ্তানি উন্মুক্ত করার ঘোষণার পর দেড় মাসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার টন সেদ্ধ চাল রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠানগুলো মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, জাপান, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে চাল রপ্তানি করবে। আরও ৬টি প্রতিষ্ঠান ১৫ হাজার টন চাল রপ্তানির অনুমোদনের আবেদন করেছে। এর মধ্য দিয়ে আবারও চাল রপ্তানিকারক দেশের খেতাব পাচ্ছে বাংলাদেশ।
জুলাইয়ে জারি করা পরিপত্রে বলা হয়, একজন ব্যবসায়ী একবারে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টন চাল রপ্তানি করতে পারবেন। প্রথমবার অনুমোদন নেয়া চালের রপ্তানি শেষ হলে পুনরায় ওই ব্যবসায়ী আবেদন করতে পারবেন। এছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এনবিআরের চেয়ারম্যান, ট্যারিফ কমিশন, ইপিবির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের চাল রপ্তানির এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয়।
জানা গেছে, অভিজাত ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, শামসুল হক অটো রাইস মিলস, কৃষাণ এন্টারপ্রাইজ, এস এম এন্টারপ্রাইজ, মজুমদার রাইস মিল, রশিদ অটো রাইস মিলস, নওশিন অ্যাগ্রো, এম ইসলাম কোম্পানি ও ইন্টার ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ ইতোমধ্যে ৫০ হাজার টন চাল রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে। এ ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠান ৭৪ হাজার টন চাল রপ্তানির অনুমোদন চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে।
রপ্তানি নীতি অনুযায়ী চাল রপ্তানি নিষিদ্ধ। তবে সরকার থেকে সরকার (জি টু জি) পর্যায়ে চাল রপ্তানির সুযোগ আছে। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নিয়ে ২৫ ধরনের সুগন্ধি চাল রপ্তানি করতে পারেন ব্যবসায়ীরা। বাণিজ্য, খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে বেসরকারি খাতে চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে প্রথমবার বাংলাদেশ থেকে চাল রপ্তানি হয়। ওই বছর ৪৫০ ডলার মূল্যে ৫০ হাজার টন চাল শ্রীলংকা সরকারের বরাবরে রপ্তানি করে বাংলাদেশ সরকার। এর আগে ১৯৯৯ সালে প্রথম চাল রপ্তানিকারক দেশের খাতায় নাম লেখায় বাংলাদেশ। কিন্তু ২০০৪ সালেই আবার চাল আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। এরপর থেকে প্রতি বছরই ধারাবাহিকভাবে চাল আমদানি করতে হচ্ছে।
সভায় কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক জানান, এ বছর দেশে ধান গম ও ভুট্টা মিলিয়ে ৪ কোটি ১৩ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে। ধানের পাশাপাশি ভুট্টার উৎপাদনও এবার ল্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ধানে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাল রপ্তানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ধান গম ও ভুট্টা উৎপাদনের ল্যমাত্রা অতিক্রম করায় কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। আগামী বোরো মৌসুমেই সরকার কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, কৃষকের কাছ থেকে সরকার ৪ লাখ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নেয়ার পরই অনেক প্রভাবশালী তৎপর হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য তারা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিষয়টি জানতে পেরে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে মাঠ পর্যায়ে চিঠি দেয়া হয়েছে কোন কোন কৃষকের কাছ থেকে কি পরিমাণ ধান এবং কত দামে ধান কেনা হচ্ছে তার তালিকা পাঠাতে। এই প্রক্রিয়ায় কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর সরকার এখন মানুষের পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করছে। এ ল্েয সরকার কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ, আধুনিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং কৃষিকে টেকসই করতে কৃষিভিত্তিক আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, কৃষকমুখী নেয়া নানা পদেেপর কারণেই বর্তমান সরকারের তিন মেয়াদে খাদ্যে আজ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। অন্যান্য সেক্টরের পাশাপাশি কৃষিতে অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে। বিশ্বেও বাংলাদেশের এই উন্নয়ন প্রশংসিত হচ্ছে। এ বছর ভুট্টার উৎপাদন ৬ গুণ বেড়ে ৪৬ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। দেশে আলুর চাহিদা ৬০ লাখ টন হলেও এবার উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ টন। ল্যমাত্রার চেয়ে ৪৩ লাখ টন আলু বেশি উৎপাদন হয়েছে। কৃষি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও বাজারজাত প্রক্রিয়ায় যে উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। এই সমস্যা সমাধানে সরকার কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ, আধুনিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণ করার পদপে নিয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টন খাদ্যশস্য প্রয়োজন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ৩ কোটি ৭৩ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ কোটি ৭৭ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হওয়ার কথা। সেই হিসাবে দেশে ২৭ লাখ টন খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত থাকবে।
সূত্র জানায়, বোরো উৎপাদনের ল্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ টন। উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ৩ লাখ টন। এমনকি শুধু বোরো নয়, গত মৌসুমে আমন ও আউশের উৎপাদনও অনেক ভালো হয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে আউশ, আমন ও বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।