প্রতিবেদন

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসছে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ অপেক্ষার পর নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসছে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এ জন্য দেশের সরকারি কোম্পানি নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিউপিজিসিএল) ও চীনা কোম্পানি সিএমসির মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি সই হয়েছে। গত ২৭ আগস্ট রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে এ চুক্তি সই হয়। এনডব্লিউপিজিসিএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম খোরশেদুল আলম ও সিএমসির চেয়ারম্যান রোয়ান গুয়ান চুক্তিতে সই করেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এই দুই কোম্পানি ‘বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি রিনিউবল’ নামে একটি কোম্পানি গঠন করবে। ওই কোম্পানিটি ৫০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে। এর মধ্যে ৪৫০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুতের সঙ্গে থাকবে ৫০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ। ইতোমধ্যে পাবনার সুজানগরে ৬০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে সরকার জমি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগকে। বাকি সৌর বিদ্যুৎ হবে সিরাজগঞ্জ ও নীলফামারীতে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের ল্যমাত্রা নিয়েছে। গত ১০ বছরে মাত্র ৩৮ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন করতে পেরেছে সরকার। সে কারণে বর্তমান চুক্তিকে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চুক্তি সই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক ইলাহী চৌধুরী বলেন, সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে অনেক জমির প্রয়োজন হয়। সে কারণে সৌর বিদ্যুতের সঙ্গে একইসঙ্গে মাছ চাষ, পশু খামার ও শস্য উৎপাদন কিভাবে করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। এটি করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির আরও প্রসার হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব আহমেদ কায়কাউস, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান খালিদ মাহমুদ প্রমুখ।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, জীবাশ্ম জ্বালানি ভয়ঙ্কর পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন ল্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ১০ ভাগ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের ল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। এখন দেশে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন মতা রয়েছে। ১০ শতাংশ হারে হিসাব করলে দেশে এখন ২ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎ থাকার কথা। কিন্তু দেশে গ্রিড সংযুক্ত সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন মতা মাত্র ৩৩ মেগাওয়াট। এর বাইরে সোলার হোম সিস্টেম থেকে আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।
সূত্র বলছে, সরকার এসডিজি বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা করে। তবে উদ্যোক্তারা নবায়নযোগ্য খাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি। চীনকে সঙ্গী করে নতুন এই উদ্যোগে বিদ্যুৎ বিভাগ আশার আলো দেখছে। এবার সত্যিকার অর্থেই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গতি আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এম খোরশেদুল আলম বলেন, আমরা পাবনা ৬০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ এবং পায়রা ৫০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ দিয়ে কোম্পানির কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে পাবনা ও পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়ে সম্ভাব্যতা জরিপ চলছে। আগামী মাসের মধ্যে জরিপের কাজ শেষ হবে। এছাড়া সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধায় আরও জমি অধিগ্রহণের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে আগামী ২ বছরের মধ্যে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, সরকার অনেক দিন থেকেই অকৃষি খাস জমিতে সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করলেও সরকারি সংস্থাগুলো জমি সংস্থানে ব্যর্থ হয়। এই প্রথম পাবনাতে ৬০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুতের জন্য ২০৫ একর অকৃষি খাস জমির সংস্থান করা সম্ভব হয়েছে। পাবনার সুজানগরের চররামকান্তপুর মৌজায় কেন্দ্রটির জন্য জমি দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এভাবে চরের অকৃষি জমিতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হলে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।
এনডব্লিউপিজিসিএল-এর নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোহাইমেনুল ইসলাম বলেন, পাবনায় প্রাথমিকভাবে ৬০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও এখানে আরও ১৪০ মেগাওয়াট কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি রয়েছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র নির্মাণের জমি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। আমরা চেষ্টা করছি আগামী বছরের শেষ নাগাদ দুটি কেন্দ্রের বিদ্যুৎ গ্রিডে যোগ করতে। আশা করা যায়, এই সময়ের মধ্যে আমরা অন্তত ২০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দিতে পারব।