প্রতিবেদন

নানা অপরাধে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা: সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার কারণে উদ্বিগ্ন স্থানীয় লোকজন

নিজস্ব প্রতিবেদক
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মুখে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরতে ‘অনিচ্ছুক’ এসব রোহিঙ্গা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে, যা সরকার ও কক্সবাজারের স্থানীয় অধিবাসীদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় দফা প্রচেষ্টা সম্প্রতি ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতির মধ্যেই টেকনাফের যুবলীগ নেতা ওমর ফারুককে গুলি করে হত্যা করে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দু’দফায় থমকে যাওয়া এবং রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ দেখে বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় লোকজন চরম ক্ষুব্ধ।
বাংলাদেশের অব্যাহত চেষ্টা ও প্রভাবশালী কিছু দেশের চাপে বাংলাদেশে আশ্রিত স্বল্পসংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেয় মিয়ানমার সরকার। এরপর গত ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়। সে অনুযায়ী অবকাঠামোগত সুবিধা, নিরাপত্তাসহ আনুষঙ্গিক সব ধরনের প্রস্তুতি নেয় শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনারের কার্যালয় ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা। কিন্তু নিরাপত্তা শঙ্কা ও আস্থা সংকটের কারণে একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি হয়নি। এর আগে গত বছরের ১৫ নভেম্বর একই রকমের একটি প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের কারণেই ভেস্তে যায়।
অভিযোগ উঠেছে, দ্বিতীয় দফায় প্রত্যাবাসন চেষ্টা বন্ধ হওয়ার পর (২২ আগস্ট) রোহিঙ্গাদের কয়েকটি সংগঠন ক্যাম্পে উল্লাস করে। তাদের মধ্যে একটি সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে উল্লাস করতে করতে রোহিঙ্গা শিবির থেকে বাইরে চলে আসে। এ সময় তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুরায় ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুককে অপহরণ করে তারা। পরে তাকে পাহাড়ে রোহিঙ্গাদের টর্চার সেলে নিয়ে ওই রাতেই গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যার শিকার ওমর ফারুক জাদিমুরা এমআর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতিও ছিলেন। যুবলীগের নেতাকে হত্যার পরদিন বিক্ষুব্ধ কয়েক হাজার স্থানীয় বাসিন্দা মহাসড়ক অবরোধ করে। একপর্যায়ে তারা রোহিঙ্গা শিবির ও শিবিরসংলগ্ন কয়েকটি সংস্থার কার্যালয়ে হামলা চালায়। এসব ঘটনা ঘটার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও আনসার সদস্য নিয়োজিত রাখা হয়।
এদিকে ২৩ আগস্ট রাতে জাদিমুরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পঘেঁষা পাহাড়ে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন মোহাম্মদ শাহ ও মো. শুক্কুর নামে দুই রোহিঙ্গা। পুলিশ বলছে, নিহতরা ওমর ফারুক হত্যামামলার আসামি এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসী।
রোহিঙ্গাদের বিপদের সময় কক্সবাজারের বাসিন্দারা আশ্রয়সহ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তারাই এখন উগ্রপন্থি কিছু রোহিঙ্গার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। স্থানীয়রা জানায়, রোহিঙ্গারা ফ্রি স্টাইলে চলছে। দেশি-বিদেশি ত্রাণ সহায়তাসহ বাড়তি আয় রোজগারের সুযোগ পেয়ে তারা এখানে শিকড় গেড়ে বসতে চাইছে। আশ্রয় ক্যাম্পে সন্তান জন্মদানের বিষয়টিও চলছে ফ্রি স্টাইলে। গত দু’বছরে এদের পরিবারে লাধিক নতুন সদস্য এসেছে। রোহিঙ্গারা আশ্রিত হিসেবে ক্যাম্প থেকে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের কোনো ধারও ধারছে না। দিনে দিনে এরা হয়ে উঠেছে বেপরোয়া। রোহিঙ্গাদের কারণে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারা এক রকম আতঙ্কে আছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো রাতের বেলা অরতি থাকায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ডাকাতিসহ অপরাধ কর্মকা-ের সুযোগ পায়। আর রোহিঙ্গাদের দিয়ে মানবপাচার বা ইয়াবা পাচারের মূল হোতা স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তারা জানান, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ওই এলাকাটিতে অপরাধের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০১৫ সালে আল-ইয়াকিন নামধারী একটি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে কর্তব্যরত আনসার কমান্ডারকে হত্যা এবং ২০টি অস্ত্র লুট করেছিল। গত দুই বছরে ওই শিবিরে সন্ত্রাসীদের হামলায় অন্তত ৮ জন স্থানীয় বাসিন্দা নিহত হন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা স্থানীয় ইয়াবা সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েছে। এদের ব্যবহার করা হচ্ছে ইয়াবার বাহক বা সন্ত্রাসী বাহিনী হিসেবে। তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরে আসা রোহিঙ্গারা। ছাগল-মুরগি, মোবাইল ফোন চুরি থেকে শুরু করে এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা রোহিঙ্গারা করছে না। ফসলি জমি, ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি নষ্ট করছে তারা। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী-রোহিঙ্গাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনসহ ছোট-বড় অপরাধ নিত্যনৈমিত্তিক।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্যমতে, বাংলাদেশে এসে প্রায় ১৫ হাজার রোহিঙ্গা নারী ও শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের বয়স ১৩ থেকে ২৫ বছর। তাদের অনেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতেও নির্যাতিত হয়েছিলেন।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট গভীর রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু হলে রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে নানামুখী বর্বরতা। হত্যা, ধর্ষণ, বিভিন্ন সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দেয়, দেয় খাবার ও ত্রাণসামগ্রী। কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা রোহিঙ্গাদের জন্য সামান্য সম্বলটুকু পর্যন্ত নিয়ে এগিয়ে আসেন। সরকারি পর্যায়ে পুলিশ, বিজিবি, বেসরকারি পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিও এসব রোহিঙ্গার প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওই সময়ে একজন রোহিঙ্গাও খাদ্যাভাব বা আশ্রয়ের অভাবে তিগ্রস্ত হয়নি। এর আগে থেকে আরো প্রায় ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছে। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাধিক। সরকারি হিসাব অনুযায়ী বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত হয়েছে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ রোহিঙ্গা। এরা রয়েছে উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি শিবিরে।
২ বছর আগে নামা রোহিঙ্গার সেই ঢল যে এত বড় ও দীর্ঘমেয়াদি হবে সেটা ভাবতে পারেনি স্থানীয় বাসিন্দারা। সেদিন মানবিকতার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টিকরা স্থানীয়রা আজ দুর্দশা ও ভোগান্তির শিকার। অনেকের ফসলি জমি, বাড়ির উঠান পর্যন্ত দখল হয়ে গেছে। কবে নাগাদ রোহিঙ্গারা ফিরবে বা আদৌ তারা ফিরবে কি না, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন তারা। নতুন করে যুক্ত হয়েছে আক্রমণের ভয়। রোহিঙ্গাদের সংখ্যা স্থানীয়দের চেয়ে বেশি হওয়ায় রোহিঙ্গারাই এখন স্থানীয়দের ডমিনেট করছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে রাতের বেলায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আনাগোনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বিভিন্ন সংগঠনের নামে এরা সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ করে। সর্বশেষ ভয়েস অব রোহিঙ্গা নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে এরা প্রত্যাবাসনবিরোধী লিফলেট, প্ল্যাকার্ড প্রচার করেছে। এসব সন্ত্রাসী সাধারণ রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যে ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারে প্রতিনিয়ত ভীতির মধ্যে রাখতে সম হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গারা খুন, ডাকাতি, চুরি, ধর্ষণ, ইয়াবা ও মানবপাচার, নির্যাতন, ফসলি জমি দখলসহ ১৭ ধরনের অপরাধে জড়িত। কিন্তু ক্যাম্পগুলো ঘিঞ্জি হওয়ায় অভিযান পরিচালনায় বেগ পেতে হয়। এ সুযোগে রোহিঙ্গাদের অন্তত ১৪টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যরা ক্যাম্প বদল বা পলায়নের সুযোগসহ অদূরবর্তী পাহাড়ে ঘাপটি মেরে থাকে।
সূত্র জানায়, গত ২ বছরে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর হাতে ক্যাম্পের রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ৪৩ জন খুন হয়েছেন। বেশিরভাগ হত্যা-খুনের নেপথ্যে অপহরণ, ডাকাতি, পাচার, ক্যাম্পের নেতৃত্ব (মাঝি-চেয়ারম্যান) নির্বাচন, প্রভাব বিস্তার থেকে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও ঘটছে। এসব খুনোখুনির ৪৩টি মামলায় ১৩৬ জনকে আসামি করা হয়েছে, যাদের অনেকেই পলাতক।
পুলিশের দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২০ আগস্ট পর্যন্ত ৪৭১ মামলায় আসামি করা হয়েছে ১ হাজার ৮৮ রোহিঙ্গাকে। উখিয়া ও টেকনাফ থানায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে মাদক চোরাচালানের ২০৮টি মামলায় আসামি করা হয় ৩৬৮ জনকে। এসব মামলার বাদি হয়েছে রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী। গত ২ বছরে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩২ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। তারা হত্যাকা- বা মাদক পাচারের মামলার আসামি ছিল।
উখিয়া থানার ওসি আবুল মনসুর বলেন, ছোটখাটো অপরাধের ঘটনা ক্যাম্পেই মাঝি (রোহিঙ্গা নেতা) বা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সমাধান হয়ে যায়। তবে ফৌজদারি অপরাধের যেসব অভিযোগ থানায় করা হয় সবকটিতে পুলিশ তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে।
টেকনাফ মডেল থানা সূত্রে জানা যায়, সীমান্তে ইয়াবা পরিস্থিতি সামাল দিতে না দিতেই হঠাৎ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কর্মকা- বেড়ে গেছে। সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে তারা স্থানীয় এক যুবলীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় জনতা উত্তেজিত হলে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হওয়ার আগেই পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
জানা যায়, এর আগেও বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও ইয়াবা কারবারি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এখন ক্যাম্পের ভেতরে সশস্ত্র রোহিঙ্গা সংগঠন এবং উগ্রবাদী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই সেখানে অভিযান চালানো হবে।

স্থানীয়রা নানাভাবেই ক্ষতির মুখে
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে কক্সবাজারের বাসিন্দা; বিশেষত উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বাসিন্দারা নানাভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত। রোহিঙ্গাদের কারণে শান্তি বিনষ্টসহ দারিদ্র্য বেড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
গত জুলাই মাসে বেসরকারি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারে আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের দারিদ্র্য ৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রায় আড়াই হাজার পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এর বাইরে আরো ১ হাজার ৩০০ পরিবার ঝুঁকিতে পড়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে গিয়ে সেখানে ৪৬৪ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের বনজসম্পদ ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়েছে। রোহিঙ্গাদের চাপে স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তাছাড়া উখিয়া ও টেকনাফের সবুজ পাহাড়ে রোহিঙ্গাদের বসবাসের ঘর তৈরির জন্য কেটে ফেলা হয়েছে অসংখ্য গাছপালা। একসময়ের সবুজ পাহাড় এখন বৃশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে সেখানে পরিবেশ, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে। পাহাড়ে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন করতে গিয়ে হাতির আবাসস্থল ও বিচরণত্রেও বিনষ্ট হয়েছে। এছাড়া প্রতি মাসে রোহিঙ্গাদের রান্নাবান্নার কাজে ৬ হাজার ৮০০ টন জ্বালানি কাঠ প্রয়োজন, যা স্থানীয় বনাঞ্চল থেকেই সংগ্রহ করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের দণি বন বিভাগের জুলাই মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, বালুখালী ঢালা, ময়নারঘোনা, থাইংখালী তাজনিমার খোলা, হাকিমপাড়া, জামতলি বাঘঘোনা, শফিউল্লাহ কাটা এবং টেকনাফের চাকমারকুল, উনচিপ্রাং, লেদা, মৌচনী, জাদিমুরা ও কেরানতলী এলাকাসহ বন বিভাগের গেজেটভুক্ত প্রায় ৬ হাজার ১৬০ একর বনভূমিতে বসতি স্থাপন করেছে। বনভূমিতে রোহিঙ্গাদের এভাবে বসতি স্থাপনের কারণে টাকার হিসাবে সৃজিত এবং প্রাকৃতিক বনের তি হয়েছে ৪৫৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। একইভাবে জীববৈচিত্র্যের তির পরিমাণ ১ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। সে হিসাবে বনজ ও জীববৈচিত্র্যের তির পরিমাণ অন্তত ১ হাজার ৮৬৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
রোহিঙ্গারা যাতে আশ্রয়শিবির ছেড়ে পালাতে না পারে সে জন্য টেকনাফ-কক্সবাজার প্রধান সড়ক ও মেরিন ড্রাইভ সড়কে অন্তত ৭টি তল্লাশি চৌকি স্থাপন করেছে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী। সেগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হয়। বলা চলে, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায় সার্বণিক নজরদারি ও পথেঘাটে তল্লাশির শিকার হতে হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় শ্রমবাজারেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। রোহিঙ্গারা স্বল্প মজুরিতে শ্রম দিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাজের সুযোগ সংকুচিত করছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও নিবন্ধন কার্যক্রমের কারণেও অনেক শিাপ্রতিষ্ঠানে শিা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।