কলাম

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষক নিয়োগের বিধানের পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা

বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশ থেকে আসা শিকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হবে। এ েেত্র বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বাংলাদেশি অধ্যাপকরা অগ্রাধিকার পাবেন; বিশেষত রোবটিক্স, অ্যাভিয়েশন ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো অত্যাধুনিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়ে সিনিয়র শিকদের ঘাটতি পূরণে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যাবে।
উল্লিখিত বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে শিা মন্ত্রণালয়।
শিামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে গত ২৫ আগস্ট মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে ওই নীতিমালার খসড়া অনুমোদন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিার উন্নয়নে জাপানের সম্রাট মেইজির পদেেপর উদাহরণ দিয়েছিলেন। মানসম্মত শিা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে শিক আনার কথাও বলেছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সেই বক্তৃতার প্রতিফলন ঘটেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিন্ন শিক নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদোন্নয়নের খসড়া নীতিমালায়।
অর্থমন্ত্রীর অসুস্থতার কারণে বাজেট উপস্থাপনের সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, মেইজির সময়ে জাপান শিায় অনগ্রসর ছিল। তখন তিনি অনুধাবন করেন জাপানে ছাত্রের অভাব নেই, আছে উপযুক্ত শিকের অভাব। তাই তিনি প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিতি কয়েক হাজার শিককে জাপান নিয়ে আসেন। এভাবে জাপান জ্ঞানবিজ্ঞানে অগ্রসর হয় এবং পাশ্চাত্যের দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যায়। আমাদের সময় এসেছে জাপানের সম্রাট মেইজিকে অনুকরণের এবং শিার উন্নয়নে এসব কাজ আমরা কাল থেকেই শুরু করতে চাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা চূড়ান্তকরণ বৈঠকে শিামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ছাড়াও মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন, ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ, অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) আবদুল্লাহ আল হাসান চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সভাসূত্র জানায়, দেশের স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশ থেকে আসা শিকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি খসড়া নীতিমালায় রাখা হয়েছে। এ নিয়োগের েেত্র বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বাংলাদেশি অধ্যাপকরা অগ্রাধিকার পাবেন। অগ্রাধিকার দেয়া হবে রোবটিকস, এভিয়েশন ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো অত্যাধুনিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়ে সিনিয়র শিকের ঘাটতি পূরণ করতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করা যাবে।
জানা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত, মৌখিক ও প্রদর্শনী কাসের মাধ্যমে শিক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে খসড়া নীতিমালায়। তবে এটা বিধিমালা হবে নাকি নীতিমালা হবে সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিধিমালা হলে তা মন্ত্রিসভায় পাস করতে হবে। আর নীতিমালা হলে তা শিা মন্ত্রণালয়ই চূড়ান্ত করে জারি করতে পারবে। তবে সে েেত্রও উচ্চতর অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
এক্ষেত্রে ইউজিসি নীতিমালা দাখিল করলে সেটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে জারি করা হবে।
নীতিমালার বিষয়ে বলা হয়, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমাদের ভবিষ্যৎ জনবলকে প্রস্তুত করতে হবে। সেখানে রোবোটিকসের মতো অনেক বিভাগ হয়ত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে। কিন্তু তাৎণিকভাবে সে বিষয়ে হয়ত বিশেষজ্ঞ পাওয়া যাবে না। এমন েেত্র বিদেশ থেকে বিশেষ করে আমাদের যেসব বিশেষজ্ঞ বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন তাদের কেউ যদি যোগ দিতে চান তাহলে তাদের নিয়োগ দেয়া যাবে। এেেত্র বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে অনুমোদন নিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে। সাধারণত এমন নিয়োগগুলো চুক্তিভিত্তিক বা খ-কালীন হতে পারে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, রোবোটিক্স, অ্যারো স্পেস, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যতের বিষয়। এখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এসব বিভাগ খুললেই শিক পাবে না। কিন্তু এ যুগে এসব বিভাগ খোলা লাগতে পারে। শিক ও বিশেষজ্ঞের সংকট আছে। বিদেশে অনেক বাংলাদেশি আছেন যারা দেশকে অস্থায়ীভাবে সেবা দিতে চান, স্থায়ীভাবে ফিরতে চান না। তাদের সেবা নেয়ার পথ খুলতেই এমন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, আশা রাখছি, দ্রুততম সময়ে কাজটি শেষ করা যাবে; আর মিটিংয়ের প্রয়োজন হবে না।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ নীতিমালা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। পরে ৬ সদস্যের কমিটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক, শিক সমিতি, ফেডারেশনসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা সাপেে নীতিমালার খসড়া তৈরি করে।
জানা যায়, নীতিমালায় প্রভাষক পদে যোগ্যতা সিজিপিএ-৩.৫ রাখার প্রস্তাব আছে। এছাড়া লিখিত পরীা এবং প্রদর্শনী কাস (শিার্থীদের সামনে প্রার্থীর লেকচার) নিতে হবে। সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য ন্যূনতম ১০ বছরসহ মোট ২২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এমফিল প্রার্থীর েেত্র ৭ বছরসহ ১৭ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিকতা থাকতে হবে। ছুটির সময়টা বাদ। পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ৫ বছরের অভিজ্ঞতাসহ ন্যূনতম ১২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে কমপে ৭ বছর কাসরুম শিকতাসহ ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এমফিল ডিগ্রিধারীদের ন্যূনতম ৬ বছরসহ ৯ বছরের শিকতায় থাকতে হবে। পিএইডি ডিগ্রিধারীদের ন্যূনতম ৪ বছরসহ ৭ বছর শিকতা করতে হবে।
সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিতে ন্যূনতম ৩ বছরের শিকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। থিসিসসহ এমফিল ডিগ্রিধারীদের জন্য ২ বছর এবং পিএইচডি ডিগ্রি থাকলে ১ বছরের শিকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। একইসঙ্গে স্বীকৃত কোনো জার্নালে অন্তত ৪টি প্রকাশনা থাকতে হবে। খসড়ায় বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, কলা, মানবিক, বিজনেস স্টাডিজ, চারুকলা ও আইন অনুষদভুক্ত বিষয়গুলোর জন্য প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী থেকে সহযোগী এবং সহযোগী থেকে অধ্যাপক পদে নিয়োগের জন্য একটি অভিন্ন শর্তাবলি যোগ করা হয়েছে। একইভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচার, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়, মেডিসিন ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা শর্ত যুক্ত হয়েছে।
অধ্যাপকদের গ্রেড-৩ থেকে গ্রেড-২-তে উন্নীত হওয়ার জন্য অন্তত ৪ বছর চাকরি এবং স্বীকৃত কোনো জার্নালে বিষয়ভিত্তিক দুটি নতুন গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে হবে। দ্বিতীয় গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের চাকরিকাল অন্তত ২০ বছর এবং দ্বিতীয় গ্রেডের সর্বশেষ সীমায় পৌঁছানোর ২ বছর পর জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রথম গ্রেড দেয়ার শর্ত দেয়া হয়েছে। তবে এ সংখ্যা মোট অধ্যাপকের ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।
স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশ থেকে আসা শিকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়ার বিধান রেখে অনুমোদন পাওয়া নীতিমালার পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষাখাতের অধিকাংশ মানুষ এর প্রশংসা করছেন।
চীনে পিএইচডি গবেষণারত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সাহাবুল হক স্বদেশ খবরকে বলেন, বিদেশে শত শত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ আছেন যারা দেশে ছুটিতে এসে পড়াতে চান। শিা মন্ত্রণালয় শিক নিয়োগ নীতিমালায় এসব বিধান যুক্ত করে সরকারি চিন্তা প্রতিফলনের যেমন পদপে নিয়েছে, তেমনি বিদেশে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের মনের বাসনা পূরণের পথ খুলে দিয়েছে। এটা খুবই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
এদিকে দেশের স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক নিয়োগ দেয়ার নীতিমালার বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন কেউ কেউ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়ে বাইরের শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে ঠিক, তবে এই সুযোগের অপব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অন্যান্য বিষয়েও বিদেশি শিক্ষকদের প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এমনটা শুরু হলে একদিকে যেমন দেশের মেধাবী শিক্ষকরা বঞ্চিত হবেন, অন্যদিকে শিক্ষার পরিবেশেও এটা নেতিবাচক ছাপ ফেলতে পারে। কারণ বিদেশি শিক্ষকরা মোটা বেতন নেয়ার পাশাপাশি কর্তৃত্বের জায়গায়ও সামনের সারিতে থাকার চেষ্টা করতে পারে। এমনটা ঘটলে দেশি ও বিদেশি শিক্ষকদের মধ্যে মতবিরোধসহ নানা জটিলতা তৈরি হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করবে।
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে রোবোটিক্স, অ্যারো স্পেস, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো বিষয়গুলো দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যুক্ত করতেই হবে। সে ক্ষেত্রে বিদেশি শিক্ষক নিয়োগও প্রয়োজন পড়বে। তবে এ সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষক নিয়োগকে প্রাধান্য দেয়া শুরু হয় কি না সেটাই আশঙ্কার জায়গা। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের মেধাবী শিক্ষকের চেয়ে বিদেশি শিক্ষক অধিক বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন। এর ফলে দেশি মেধাবী শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা কাজ করবে; যা শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে না।
তাই বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ করার চেয়ে দেশের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে গুরুত্ব দিতে সরকারের প্রতি আহ্বানও জানান এই অধ্যাপক।