প্রতিবেদন

ফুলেল শ্রদ্ধায় চির বিদায় নিলেন অধ্যাপক মোজাফফর: রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদক
মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, প্রগতিশীল আন্দোলনের পথিকৃৎ, বাম রাজনীতির পুরোধা ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৩ আগস্ট তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম সরকার তথা তাজউদ্দীন সরকারের সব উপদেষ্টাই পরলোকে চলে গেলেন। ২৪ আগস্ট শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বাংলাদেশের অন্যতম এই রাজনীতিককে শেষ বিদায় জানায় দেশের সর্বস্তরের মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের পে আন্তর্জাতিক প্রচারণায় অন্যতম দায়িত্ব পালনকারী এ নেতার জানাজায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দলের নেতারাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
দেশ স্বাধীন করতে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নকে নিয়ে গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলা মোজাফফর আহমদ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পে বিশ্বজনমত গঠনে ভূমিকা পালন করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মন্ত্রিত্ব নিতে অস্বীকার করেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারও নেননি।
দীর্ঘদিন রোগে ভোগার পর রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা যান মোজাফফর আহমদ, যিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯২২ সালে ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবিদ্বারে জন্ম নেন এই প্রবীণ রাজনীতিক। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপনা ছেড়ে রাজনীতিতে নিজেকে যুক্ত করেন। সামাজিক নানা বাস্তবতার কারণে জীবনের প্রায় শেষ সময়ে অনেকটা একাই কাটিয়েছেন তিনি। তবে সমাজ উন্নয়ন ও মানুষের মুক্তির চিন্তা থেকে কখনও দূরে সরে যাননি ৯৭ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ।
জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে ২৪ আগস্ট সকালে প্রথম জানাজা হয় সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের। সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের দণি প্লাজায় জাতীয় পতাকা মোড়ানো কফিনে সরাসরি পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রদ্ধা জানান। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের প থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজা শেষে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এ সংগঠককে গার্ড অব অনার ও রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদান করা হয়। এ সময় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা মরদেহে শ্রদ্ধা জানান।
সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে জানাজার পর অধ্যাপক মোজাফফরের মরদেহ ধানমন্ডিতে ন্যাপের কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখানে দলীয় নেতাকর্মীদের প থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হয়। দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষবারের মতো মোজাফফর আহমেদের মরদেহ রাখা হলে মুহূর্তেই ফুলে ফুলে ভরে ওঠে কফিনের ডালা। ফুলেল শ্রদ্ধা জানায় তাঁর অসংখ্য শুভাকাক্সক্ষী, রাজনীতিবিদসহ সর্বস্তরের জনগণ।
শহীদ মিনারে নির্লোভ ও সৎ রাজনীতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত মোজাফফর আহমেদকে শ্রদ্ধা জানায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, কেন্দ্রীয় খেলাঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাম গণতান্ত্রিক জোট, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি), জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ কবিতা পরিষদ, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য ও সর্বস্তরের মানুষ।
আওয়ামী লীগের পে শ্রদ্ধা জানান দলের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও পূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। তিনি বলেন, রাজনীতিতে কিভাবে আত্মোৎসর্গ করতে হয়, কিভাবে সততার দৃষ্টান্ত রাখতে হয়, লোভ-লালসা পরিহার করতে হয়, অনন্তকাল এর অনুপ্রেরণা জোগাবেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ।
শ্রদ্ধা জানিয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান সাংবাদিকদের বলেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ জীবনে কোনো সম্মাননার পেছনে ছোটেননি। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, শুধু পদ-পদবির পেছনে ছোটাই রাজনীতি নয়, আদর্শের রাজনীতিই হলো প্রকৃত রাজনীতি।
সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, অধ্যাপক মোজাফফর সমাজতন্ত্রের জন্য আত্মনিয়োজিত একজন নেতা ছিলেন। তিনি ন্যাপ নেতা ছিলেন, কিন্তু রাজনীতির শুরুতে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিরও একজন সদস্য ছিলেন।
শহীদ মিনার থেকে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মরদেহ দ্বিতীয় জানাজার উদ্দেশ্যে বায়তুল মোকাররম মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন ২৫ আগস্ট কুমিল্লার টাউন হল ময়দানে তাঁর তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর নিজ গ্রাম দেবীদ্বারের এলাহাবাদে বাদ জোহর চতুর্থ জানাজা শেষে মোজাফফর আহমদকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।