রাজনীতি

বিলুপ্তির পথে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট!

সোহরাব আলম
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গঠিত ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ এখন অস্তিত্ব সংকটে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির বিশেষ আগ্রহের কারণে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা শুরু। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস পরাজয়ের ফলে আশাহত হয়েছে বিএনপি। এ কারণে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট এখন আর ঐক্যফ্রন্টের ওপর ভরসা করতে পারছে না। আর বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের অনুপস্থিতি ও অনাগ্রহের কারণে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট কার্যত নেতাকর্মীশূন্য। রাজনৈতিক মাঠে ঐক্যফ্রন্টের এখন আর কোনো কর্মসূচি দেখা যায় না।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ‘আলোড়ন সৃষ্টিকারী’ জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হারিয়ে যেতে পারে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ড. কামাল নন, বরং বিএনপির ভূমিকার ওপরই এখন নির্ভর করছে ঐক্যফ্রন্ট টিকে থাকবে কি না।
উল্লেখ্য, বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গত বছরের ১৩ অক্টোবর গড়ে ওঠে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। পরে এই জোটে যোগ দেয় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। নির্বাচনি ফল অনুকূলে না আসার পাশাপাশি আদর্শগত তথা সাংগঠনিক লাভ-লোকসানের বিষয়টি নির্বাচনের পর দলগুলোর সামনে আসে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি ও গণফোরামের এমপিদের সংসদে যোগ দেয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে গত ৮ জুলাই জোট ছেড়ে চলে যান কাদের সিদ্দিকী। শরিক জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সঙ্গেও এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়। দল দুটি এখনও ফ্রন্ট ছেড়ে না গেলেও তাদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। এমপিদের সংসদে যোগদানে দল দুটির নেতারা মনে করেন, ৩০ ডিসেম্বর ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরও আন্দোলন করার সুযোগ ছিল, যা বিএনপি করেনি। এমনকি ড. কামাল হোসেন তার ওপর অর্পিত দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করেননি বলেও মনে করে জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের গণফোরামের টানাপড়েন চলছে। ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গে বিএনপির সমন্বয় নেই। ফ্রন্ট কোনো বৈঠকে বসছে না। কোনো কর্মসূচি পালন করছে না। এমনকি ঐক্যফ্রন্টের নেয়া রাজনৈতিক কার্যালয়টি ভাড়া দেয়া হয়েছে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে। বর্তমানে ড. কামাল হোসেনের মতিঝিলের চেম্বারই ঐক্যফ্রন্টের অলিখিত ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
জোটের নেতারা জানিয়েছেন, ভোটের পরপরই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান কার্যালয়ের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। ঐক্যফ্রন্টের সদর দপ্তর হিসেবে যে ক ৩টি ব্যবহার করা হতো, সেগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়েছেন ভবন মালিক। ভবনের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নামফলকও। ফ্রন্টের শরিক নেতারা বলছেন, বিএনপির একাংশের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিল। যারা জোট রাজনীতির পে ছিলেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর তারা বেঁকে বসেছেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ফ্রন্টের কর্মকা- এগিয়ে নেয়ার জন্য তেমন তৎপরতা দেখাচ্ছেন না। কামাল হোসেন চলছেন ঢিলেঢালা। কাদের সিদ্দিকীর দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ঘোষণা দিয়েই বেরিয়ে গেছে। অন্য কয়েকটি ছোট দল থাকলেও তারা বিএনপি ও কামাল হোসেনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন কর্মকা- না থাকায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ছোটদলগুলোর নেতারাও হতাশ।
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক আদর্শ তথা নীতিগত কিছু বিষয়ে দ্বিমত হওয়ায় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় সবচেয়ে বেশি দূরত্ব তৈরি হয়েছে ফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে। এসব কারণে নির্বাচনের পরে ঐক্যফ্রন্টের আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠকও হয়নি। তবে ফ্রন্ট ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্ত এখনো নেয়নি বিএনপি। হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া বিএনপির জন্য কঠিনও। কারণ ঐক্যফ্রন্টে থাকা মুক্তিযুদ্ধের পরে তথা উদারপন্থি বলে পরিচিত দলগুলো বিএনপির কাছ থেকে চলে গেলে দু’দিক থেকেই সরকারের লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দিলে একদিকে ওই দলগুলো বিএনপির বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে, অন্যদিকে জামায়াতকে জড়িয়ে বিএনপিকে আবারও ‘জঙ্গিবাদী’ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করবে সরকার।
সূত্র আরও জানায়, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছেন, ফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর নেতাদের ইমেজ কাজে লাগানো জরুরি। অন্যদিকে ওই দলগুলোর কাছ থেকে সাংগঠনিক বা ভোটের রাজনীতিতে বড় ধরনের কিছু পাওয়ার নেই এটাও জানেন বিএনপি নেতারা। অথচ নির্বাচনে তাদের অনেক আসন ছাড়তে হয়। গত নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টকে ২০টি আসন ছেড়েছিল বিএনপি। তাছাড়া ঐক্যফ্রন্ট রা করতে গিয়ে এরই মধ্যে ২০ দলীয় জোট ভাঙনের মুখে পড়েছে। তাই বিএনপির লাভ-তির হিসাবের মধ্যেই আটকে আছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যৎ।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বর্তমানে ঐক্যফ্রন্ট খুঁড়িয়ে চলছে। কিন্তু দৌড়াতে বা জোটকে গতিশীল করতে হলে সঠিক কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে হবে। বিএনপিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কী চায়। তবে আমি মনে করি, যে যে কারণে ঐক্যফ্রন্ট গড়ে উঠেছিল তার প্রয়োজনীয়তা এখনও আছে।
ঐক্যফ্রন্ট গঠনে ভূমিকা পালনকারী বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, ঐক্যফ্রন্টের বিলোপ ঘটেনি, তবে ‘প্রাণহীন’ অবস্থায় টিকে আছে।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই প্রতিষ্ঠাতা স্বদেশ খবরকে বলেন, ঐক্যফ্রন্ট থাকবে কি না এ সিদ্ধান্ত বিএনপিকেই নিতে হবে। তবে আমি মনে করি, রাজনৈতিক আদর্শ তথা অবস্থানগত কারণে বিএনপিরই ফ্রন্টকে বাঁচিয়ে রাখা উচিত। শুধু জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে চললে বিএনপি ভুল করবে।