প্রতিবেদন

ভোগান্তিতে প্রিপেইড গ্রাহকরা: বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদক
বিদ্যুতের অপচয় রোধ, চুরি ঠেকানোসহ নানাবিধ অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করতে পুরো দেশকে প্রিপেইড বৈদ্যুতিক মিটারের আওতায় আনার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বসানো হয়েছে এ মিটার। তবে প্রিপেইড মিটার নিয়ে নানামুখী ভোগান্তির অভিযোগ শুরু থেকেই করে আসছেন গ্রাহকরা। তাদের অভিযোগ, পোস্টপেইড মিটারের চেয়ে প্রিপেইডে বিল বেশি আসছে। সেই সঙ্গে মিটার ভাড়া, ভ্যাট-ট্যাক্সসহ নানা ধরনের চার্জে গ্রাহকদের বেশি টাকা গুনতে হয়। কার্ড রিচার্জ করলে শুরুতেই অনেক টাকা কেটে নেয়া হয় এবং পোস্টপেইড মিটারের তুলনায় প্রিপেইড মিটারে অধিক টাকা খরচ হচ্ছে। এ নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগছেন প্রিপেইড গ্রাহকরা।
এদিকে বেশি বিল খরচ হওয়ার আতঙ্কে প্রিপেইড মিটার নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন অনেক গ্রাহক। প্রিপেইড মিটার প্রত্যাহার চেয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভও হয়েছে। রাজধানীর অদূরে ধামরাইয়ে প্রিপেইড মিটার বন্ধের দাবিতে গত ২২ আগস্ট বিােভ কর্মসূচি ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের পর পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করেন উত্তেজিত এলাকাবাসী। এর আগে চলতি বছরের কয়েক মাসে পিরোজপুর ও গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের ডিজিটাল প্রিপেইড মিটার স্থাপন বন্ধ ও স্থাপন করা মিটার খুলে নিতে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। পুরনো মিটারের পরিবর্তে প্রিপেইড মিটার স্থাপন করতে গিয়ে নানা ধরনের বাধার মুখে পড়ছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা।
জানা গেছে, দেশে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহক ৩ কোটি ৪৫ লাখ। ২০২১ সালের মধ্যে গ্রাহক সংখ্যা আরও বাড়বে। এ বিশাল বিদ্যুৎ গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা বিরাট চ্যালেঞ্জ। এ পর্যন্ত ৬টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি কেবল ১৮ লাখ ৪০ হাজার গ্রাহককে প্রিপেইড মিটার দিতে পেরেছে, যা শতকরা হিসাবে মাত্র ৫ দশমিক ৪১ ভাগ।
রাজধানীর মতিঝিল এলাকার বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম সোহাগ বলেন, শুরু থেকেই প্রিপেইড মিটারে বিল দিতে গিয়ে ভোগান্তি ছিল। এখন সেই ভোগান্তি কিছুটা কমলেও একেবারে শেষ হয়নি।
প্রিপেইড মিটারে বাড়তি অর্থ কাটার অভিযোগ করে সোহাগ বলেন, ১ হাজার টাকা ঢোকালে শুরুতেই ২০০ টাকার মতো কেটে নিচ্ছে। এটা অত্যধিক বলে মনে হচ্ছে।
মতিঝিলের টয়েনবি সার্কুলার রোডের এক প্রেস মালিক জানান, পুরনো মিটারের চেয়ে প্রিপেইড মিটারে বিল বেশি আসছে। কোনো কোনো মাসে তা দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণও আসছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিদ্যুতের অপচয় রোধে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিতরণ কোম্পানিগুলোকে ২০২১ সাল নাগাদ ল্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। তবে এ সময়ে ৬টি বিতরণ কোম্পানি ৬৬ লাখ ৫৬ হাজার ৩০টি প্রিপেইড মিটার স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ২৮ লাখ ৭০ হাজার, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ১৩ লাখ, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ৬ লাখ ৮ হাজার, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ৭ লাখ ৬৭ হাজার, নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) ৫ লাখ এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) তাদের বাকি থাকা ৬২ হাজার গ্রাহকের ঘরে প্রিপেইড মিটার স্থাপন করবে। পাশাপাশি গ্রাহকরা যাতে খোলা মার্কেট থেকে মিটার কিনে স্থাপন করতে পারে, সে উদ্যোগও নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৬টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি পৃথকভাবে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক রয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি)। তাদের গ্রাহক সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখ। এর বিপরীতে বিতরণ কোম্পানিটি এ পর্যন্ত মাত্র ৫ লাখ গ্রাহককে প্রিপেইড মিটার দিতে পেরেছে। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ আরও ৫ লাখ গ্রাহককে এর আওতায় আনার কথা রয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদ আরও ৯ লাখ প্রিপেইড মিটার বসানোর পরিকল্পনা আছে।
এ বিষয়ে বিআরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন (অব.) স্বদেশ খবরকে বলেন, প্রিপেইড মিটার থাকলে গ্রাহকেরই বেশি লাভ। ভুতুড়ে বিল বা বেশি চার্জ করার যে অভিযোগ, সেটা তখন থাকবে না। গ্রাহক যতটুকু ব্যবহার করে ততটুকুর বিলই কেবল পরিশোধ করতে হয়। তবে বিপুল পরিমাণ এ গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় নিয়ে আসা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অবশ্য সেটা অসাধ্য কিছু নয়।
বর্তমানে নতুন সংযোগ এবং প্রিপেইড মিটার দুটো একসঙ্গে করা হচ্ছে জানিয়ে বিআরইবি চেয়ারম্যান বলেন, সামনের দিনগুলোয় এ কাজ আরও দ্রুত গতিতে হবে। বিআরইবিতে এখন ১০ লাখ প্রিপেইড মিটার স্থাপনের একটি প্রকল্প চলছে। এতে ব্যয় হচ্ছে ৩০০ কোটি টাকা। মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ আশপাশের সমিতিগুলোয় ১ লাখ করে মিটার দেয়া হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে এ প্রকল্প শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে রাজধানীতে বিদ্যুৎ বিতরণ করে দুটি কোম্পানি Ñ ডিপিডিসি ও ডেসকো। ডিপিডিসি নিজেদের এলাকাকে ৩৬টি অংশে ভাগ করে বিদ্যুৎ বিতরণ করে আসছে। এর মধ্যে ১১টি এলাকা প্রিপেইড মিটারের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। বাকিগুলোতেও কাজ চলছে। একইভাবে কাজ করছে ডেসকো। ২০২১ সালের মধ্যে সব গ্রাহকের ঘরে প্রিপেইড মিটার পৌঁছে দেয়া দুই কোম্পানির ল্য। এছাড়াও পিডিবি, ওজোপাডিকো, নেসকো নিজ নিজ বিতরণ এলাকায় প্রিপেইড মিটার স্থাপন করবে। যদিও নানা জটিলতায় এটি এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরামর্শক সংস্থা পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন স্বদেশ খবরকে বলেন, গ্রাহক হয়রানিসহ সব ধরনের ঝামেলা এড়াতে প্রিপেইড মিটার একেবারে আধুনিক প্রক্রিয়া। এতে বিদ্যুতের অপচয় হবে না, আবার গ্রাহকদের কোনো ধরনের বাড়তি বিল বা বিল পরিশোধে ঝক্কি-ঝামেলায় পড়তে হবে না।
প্রিপেইড মিটারে বেশি বিল আসার অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, পদ্ধতিটি আমাদের এখানে নতুন হওয়ায় গ্রাহকরা এখনও সহজে মেনে নিতে পারছেন না। ক্রমান্বয়ে মানুষ যখন প্রিপেইড মিটারের সুবিধাটা বুঝতে পারবেন, তখন আর এত জটিল মনে হবে না।