প্রতিবেদন

যথাযোগ্য মর্যাদায় শান্তিপূর্ণভাবে জন্মাষ্টমী পালিত

নিজস্ব প্রতিবেদক
ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে গত ২৩ আগস্ট পালিত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মহাবতার শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী। এদিন ঢাকাসহ সারাদেশে কড়া নিরাপত্তায় হিন্দু সম্প্রদায় বের করে জন্মাষ্টমীর বর্ণাঢ্য মিছিল। শান্তি, কল্যাণ ও মানবতাবোধের শক্তিতে অনুপ্রাণিত হয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, অসত্য ও অন্যায়ের অবসান সম্ভব Ñ এই পূর্ণ তিথিতে সেই শুভ কামনাই ছিল দিবসটির মূল কথা।
জন্মাষ্টমী উপলে দিনের শুরুতেই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় শ্রী শ্রী গীতাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সংগঠন দিনব্যাপী মঙ্গলাচরণ, নামকীর্তন, শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা পাঠ, কৃষ্ণ পূজা, পদাবলী কীর্তন, দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা সভা, আলোচনা সভা ও ধর্মীয় সংগীতানুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটি পালন করে।
দিবসটি উপলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিন্দু সম্প্রদায়ের কল্যাণ কামনা করে বাণী দেন। পরে ওইদিন ২৩ আগস্ট বিকেলে বঙ্গভবনে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় বিশেষ নিবন্ধ। বেতার-টেলিভিশন ও বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে প্রচারিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। এছাড়া আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) উদ্যোগে ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা ২৩ আগস্ট স্বামীবাগ আশ্রমে শুরু হয়ে ২৫ আগস্ট শেষ হয়।
জন্মাষ্টমীর মিছিল উপলে ২৩ আগস্ট পূণ্যার্থীদের ঢল নামে রাজধানীর পলাশী মোড়ে। জন্মাষ্টমী মিছিল শুরু হওয়ার আগেই পুরো এলাকা লোকে-লোকারণ্য হয়ে পড়ে। জন্মাষ্টমীর মিছিলকে সামনে রেখে নিñিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা বাহিনীর শত শত সদস্য নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেন পুরো এলাকা।
বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্যে দিয়ে জন্মাষ্টমীর মিছিলটি শুরু হয়। বিকেলে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির যৌথ উদ্যোগে রাজধানীর পলাশীর মোড় থেকে জমকালো জন্মাষ্টমীর মিছিল বের হয়। এর আগে সংপ্তি আলোচনা সভার পর মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে মিছিলের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি ওবায়দুল কাদের এবং ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদারের সভাপতিত্বে সংপ্তি আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ পূজা উদাযাপন কমিটির সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত, সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জী, ঢাকা মহানগর পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কিশোর রঞ্জন ম-ল, রমেন ম-ল প্রমুখ। এ সময় সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক, সাবেক এমপি অধ্যাপিকা অপু উকিল, স্থানীয় কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সর্বাগ্রে অশ্বারোহীর হাতে রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা এবং পেছনে হাতি, ঘোড়া, গরুর গাড়ি, রথ, টমটম, বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, ব্যানার ও অসংখ্য ট্রাকের সারি নিয়ে শুরু হয় জন্মাষ্টমীর মিছিল। হাজারো নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধবনিতা অংশ নেন জন্মাষ্টমীর মিছিলে। শুধু দেশেরই নয়, বিভিন্ন দেশ থেকে আগত কৃষ্ণভক্ত বিদেশিরাও নেচে-গেয়ে, সুদীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটেই জন্মাষ্টমীর মিছিলে অংশ নেন।
‘হরে কৃষ্ণ, হরে রাম’ ধ্বনিতে ঢাক, খোল, করতাল, শঙ্খ, উলুধ্বনি দিয়ে চারদিক মুখরিত করে ঐতিহাসিক জন্মাষ্টমীর মিছিল শুরু হয়। কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যান্ডপার্টি, ঢোল, ঢাক ও লাউড স্পিকারের গান-বাজনার তালে তালে হাজার হাজার পুণ্যার্থী নেচে-গেয়ে মহাবতার শ্রীকৃষ্ণের করুণা চেয়ে তাঁর আবাহন সংগীতে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন।
শোভাযাত্রাটি ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে পলাশীর মোড় হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মোড়, প্রেসকাব, পল্টন, জিপিও, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, গুলিস্তান, নবাবপুর রোড হয়ে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হয়। এই দীর্ঘ পথে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষ প্রত্য করেন দৃষ্টিনন্দন জন্মাষ্টমীর মিছিল। তবে কোথাও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
রাজধানী ঢাকায় ৪০৬ বছরের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে জন্মাষ্টমীর মিছিলপূর্ব সমাবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আপনাদের (হিন্দু সম্প্রদায়) শত্রু যারা, তারা বাংলাদেশের শত্রু। এই শত্রুরা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। এই সাম্প্রদায়িক শক্তির বিষবৃক্ষের মূলোৎপাটনে সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে প্রতিরোধ করি।
ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এদেশের মানুষ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের সকল মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ধর্মীয় স্বাধীনতা উপভোগ করছে।

জন্মাষ্টমী উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সাথে রাষ্ট্রপতির শুভেচ্ছা বিনিময়
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। রাষ্ট্রপতি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনে দেশে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কাজে লাগানোর জন্য সব ধর্মের অনুসারীদের প্রতি আহ্বান জানান। একইসঙ্গে তিনি ধর্মীয় উৎসবগুলোকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর আবেদন কল্যাণকামী সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগানোরও আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আবহমানকাল থেকে এ দেশে সকল ধর্মের অনুসারীরা সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের সুমহান ঐতিহ্য। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ঐতিহ্য অব্যাহত রেখে জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি অর্জনে তা কাজে লাগানোর জন্য আমি দেশের সকল ধর্মাবলম্বীর প্রতি আহ্বান জানাই।
অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। পরে রাষ্ট্রপতি দরবার হলে ঘুরে ঘুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, ভারতের হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাশ, রামকৃষ্ণ মিশন মঠের অধ্য স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজ ছাড়াও হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ, সিনিয়র সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পেশার বিশিষ্টজনেরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তারা জন্মাষ্টমী উপলে রাষ্ট্রপতিকে ফুলের তোড়া উপহার দেন।