প্রতিবেদন

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ষড়যন্ত্রের নীলনকশায় জড়িত বিএনপি!

নিজস্ব প্রতিবেদক
রোহিঙ্গারা প্রথম বাংলাদেশে আসে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলে; ১৯৭৮ সালে। সে সময়ে মিয়ানমার থেকে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে, অবাক করার বিষয় হলো, তাদের অনেকেই এখন বাংলাদেশের নাগরিক। সার্বভৌমত্ব রক্ষার খাতিরে তিনি যেমন কিছু রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছেন, সেই জিয়াউর রহমানই ভোটের রাজনীতির কারণে স্থানীয় প্রতিনিধিদের দিয়ে অনেক রোহিঙ্গাকেই বাংলাদেশি বানিয়েছেন। জিয়াউর রহমান জানতেন, এক একটা রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি বানানো আর ‘জাতীয়তাবাদী ভোট’ বাড়ানো সমান কথা।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়ার ৯১-৯৬ শাসনামলেও কয়েক লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঘটে। খালেদা জিয়াও কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠান। তবে বহু রোহিঙ্গাকে তিনি ও তার দল বাংলাদেশি বানিয়ে ফেলেন জিয়াউর রহমানের শেখানো পথ ধরে। সেসব রোহিঙ্গা এখন কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া ছাড়িয়ে পুরো চট্টগ্রামে জাতীয়তাবাদী তথা বিএনপির রাজনীতির প্রভাবশালী ধারক।
খালেদা জিয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি বানিয়েই ক্ষান্ত হননি, যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত মীর কাশেম আলীকে দায়িত্ব দেন রোহিঙ্গাদের জন্য সংগঠন তৈরির। কথিত আছে, আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস নামের যে সংগঠনটির ব্যানারে গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গারা মহাসমাবেশ করে, ১৯৯৩ সালে সে সংগঠনটির মাদার সংগঠন আরএসও গড়ে দেন মীর কাশেম আলী। আর এ কাজে মীর কাশেম আলীকে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে খালেদা জিয়ার তৎকালীন বিএনপি সরকার। রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাও মীর কাশেম আলীর হাতে গড়া বলে জনশ্রুতি আছে।
গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গারা যে মহাসমাবেশ করে, তাতে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও ইন্ধন দেয়ার অভিযোগের তীর এখন বিএনপির দিকে। পর পর দু’দফায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আটকে যাওয়ার পর রোহিঙ্গারা শক্তি সঞ্চয় করে প্রত্যাবাসনের বিপরীতে ৫ দফা দাবি উত্থাপন করে তা আদায় না হওয়া পর্যন্ত নিজ দেশে ফিরে না যাওয়ার যে ঘোষণা তাদের মহাসমাবেশ থেকে দিয়েছে, এর নেপথ্যে বিএনপির ষড়যন্ত্রের আলামত মিলছে। বলা হচ্ছে, রোহিঙ্গারা যে ৫ দফা দাবি উত্থাপন করেছে, সে দফাগুলোও মুহিবুল্লাকে সরবরাহ করেছে চট্টগ্রাম বিএনপির একটি মহল।
২৫ আগস্ট রোহিঙ্গারা যে শোডাউন করেছে তা সফল করার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক সংস্থা আল খিদমত ফাউন্ডেশন অর্থ যোগান দিয়েছে বলে জানা গেছে। বিএনপি ও জামায়াত বাংলাদেশে এই এনজিওটির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক বলে কথিত আছে।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস নামের সংগঠনের ব্যানারে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশের মূল বক্তা মহিবুল্লাহ মূলত আরাকান বিদ্রোহী একজন ক্যাডার। ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়ার শাসনামলে যখন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ওই সময়ে এই মহিবুল্লাহও সীমান্ত অতিক্রম করে চলে আসে। ওই সময়ে তার সঙ্গে শতাধিক আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন) ক্যাডারও বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে কখনও ুদ্র, কখনও বড় আকারে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সবচেয়ে বড় ঢল নামে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাতের পর। এরপর থেকে এ পর্যন্ত নতুন ও পুরনো এবং আশ্রয় শিবিরে জন্ম নেয়া রোহিঙ্গা শিশুসহ এদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ লাধিক।
রোহিঙ্গা ক্যাডার মহিবুল্লাহ ১৯৯২ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর থেকেই বসবাস করছে টেকনাফ অঞ্চলে। এখন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ইস্যুটি এই মহিবুল্লাহর ইশারাতেই চলছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এদেশীয় ও বিদেশি বিভিন্ন সংগঠন ও এনজিওর নেতিবাচক মনোভাব অর্থাৎ ষড়যন্ত্র। সরকার এখন এই ষড়যন্ত্রের মূলে যে বিএনপি রয়েছে, তা তদন্তে নেমেছে।
গত জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ১৭ দেশের যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ২৭ প্রতিনিধি সাাৎ করে অভিযোগ দেন এই মহিবুল্লাহ তাদের একজন। তখন বাংলাদেশ থেকে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ব্যানারে প্রিয়া সাহা ওই সাাতকার অনুষ্ঠানে থেকে বাংলাদেশ নিয়ে যে নালিশ দেন তা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অথচ, একই সময়ে একই অনুষ্ঠানে এই মহিবুল্লাহ ছিলেন এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু বিষয়টি প্রিয়া সাহার মতো প্রচার মাধ্যমে আসেনি। গত ২২ আগস্ট মহাসমাবেশ করে সেই মহিবুল্লাহ এখন রোহিঙ্গাদের মধ্যমণিতে পরিণত হয়েছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, এই মহিবুল্লাহও বাংলাদেশে আশ্রিত অন্যান্য রোহিঙ্গার মতো। কিন্তু সে কিভাবে বিভিন্ন দেশে আসা-যাওয়া করছে তা নিয়ে এখনও কোনো তথ্য মেলেনি। শুধু তা নয়, মহিবুল্লাহ এত বড় একটি সমাবেশের ডাক দিয়েছে সে বিষয়টিও সরকারের কোনো মহলের জানা ছিল কি নাÑ এমন প্রশ্ন বিভিন্ন মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
জানা গেছে, মহিবুল্লাহসহ পুরনো বহু রোহিঙ্গা নেতা ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ করে থাকে। সেখানে দাতা সংস্থা ছাড়াও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রক্ষা করে।
প্রশ্ন উঠেছে, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ কীভাবে আমেরিকা গেলেন। কোন দেশের ঠিকানায় এবং কোন দেশের পাসপোর্টে তিনি আমেরিকা গেলেন। তাকে পাসপোর্ট প্রদানে কারা সহযোগিতা করেছে? রোহিঙ্গা সমাবেশে এত ডিজিটাল ব্যানার কারা সরবরাহ করেছে? কারা ছাপিয়ে দিয়েছে? রোহিঙ্গাদের হাতে হাতে এত স্মার্ট ফোন এলো কোথা থেকে এবং ওইগুলোর সিমই বা কীভাবে সংগ্রহ করা হলো? এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মাঝে।
স্থানীয়দের অনেকেই মন্তব্য করেছেন, রোহিঙ্গাদের মহাসমাবেশ ঘিরে সেদিন (২৫ আগস্ট) পুরো কক্সবাজার জেলার বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের অসম্ভব তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে টেকনাফ ও উখিয়ায়।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিএনপি যে নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে সে বিষয়ে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা হচ্ছে। এেেত্র দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আছে। সময়মতো ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর বিএনপি আন্দোলন সংগ্রাম ও নির্বাচনে ব্যর্থ। তাই তাদের এখন ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তারা এখন দিশেহারা পথিকের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি দিশেহারা পথিকের মতো নয়, রোহিঙ্গাদের নিয়ে বড় ধরনের ঝামেলা পাকানোর জন্য সুপরিকল্পিতভাবেই এগুচ্ছে। কারণ বিএনপি বিশ্বাস করে প্রতিটি রোহিঙ্গাই এক একজন জাতীয়তাবাদী। আর সেজন্য ১৯৯২ সালে তারা যে মুহিবুল্লাকে তৈরি করেছে, সে এখন বিষফোঁড়ায় পরিণত হতে যাচ্ছে।