প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় হতাহতদের স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : ১৫ ও ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ড জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করারই ষড়যন্ত্র

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
বাঙালি জাতির শোকের মাস আগস্ট। আজ থেকে ৪৪ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করে। জার্মানিতে থাকার কারণে সে সময় ঘাতকের বুলেট থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। শেখ হাসিনা বেঁচে যাওয়ায় আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরদিন অর্থাৎ ১৬ আগস্ট থেকেই আওয়ামী লীগকে শেখ পরিবার থেকে বের করে আনা এবং শেখ হাসিনাকে হত্যার মাধ্যমে দলকে নেতৃত্বশূন্য করার সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত শুরু হয়।
এই চেষ্টারই ধারাবাহিকতায় আজ থেকে ১৫ বছর আগে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার তখন ক্ষমতায়। তাদেরই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় এ ভয়াবহ হত্যাকা- সংঘটিত হয় বলেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে ২১ আগস্ট ট্র্যাজেডি। এটা এখন স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, গ্রেনেড হামলা ষড়যন্ত্রে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কর্তাব্যক্তিরা কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিল।
গ্রেনেড হামলা চক্রান্ত সফল হলে শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাই হয়ত ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট নিহত হতেন। শেখ হাসিনা না থাকলে যারা লাভবান হবে, তারাই যে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল Ñ এ বিষয়টি এখন দিবালোকের মতোই পরিষ্কার। এর প্রতিফলনও দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে। তিনি একাধিকবার বলেছেন, ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকা-ের সঙ্গে যেমন জিয়াউর রহমান জড়িত, একইভাবে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গেও তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ও পুত্র তারেক রহমান সরাসরি জড়িত।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকেলে ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলায় আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং কয়েক শত মানুষ আহত হন। উচ্চ মতাসম্পন্ন গ্রেনেডের আঘাতে হতাহতদের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আহত অনেকের শরীরে গ্রেনেডের অসংখ্য স্পি­ন্টার এখনও রয়েছে। ভয়াবহ ওই গ্রেনেড হামলার প্রধান টার্গেট ছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অসীম রহমতে অনেকটা অলৌকিকভাবেই ওই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান জাতির পিতার কন্যা, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ভয়াবহ গ্রেনেড-বৃষ্টির মধ্যে নেত্রীকে বাঁচাতে সেদিন দলীয় নেতা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তারীরা অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। চারদিক হতে যখন একটার পর একটা গ্রেনেড বিস্ফোরিত হচ্ছিল, তখন নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে সমাবেশে উপস্থিত নেতারা নেত্রীর চারদিকে মানবঢাল তৈরি করেন। এ সময় কারো হাত, কারো পিঠ, কারো গায়ে গ্রেনেডের স্পি­ন্টার লেগে তাদের কেউ কেউ আহত হন।
প্রত্যদর্শীদের ভাষ্যমতে, প্রথম গ্রেনেডটি ছোড়া হয় শেখ হাসিনাকে ল্য করেই। গ্রেনেডটি তাঁর মাথার পেছন দিক ঘেঁষে ট্রাকের নিচে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। এরপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পর পর আরো কয়েকটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। সাথে সাথে কালো ধোঁয়ার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায় ট্রাকসহ নেতানেত্রীরা। নেত্রীর চারদিকে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও নেত্রীর নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ সময় শেখ হাসিনাকে ট্রাকের উপর থেকে নিচে নামিয়ে আনেন।
উল্লেখ্য, ওই দিন বিকেলে একটি ট্রাকের উপরের সভামঞ্চ থেকে শেখ হাসিনা বক্তৃতা করছিলেন। হামলার পর বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তখন ধোঁয়ার অন্ধকার, গ্রেনেড ও গুলির শব্দ, আহত মানুষের আর্তনাদ, ইতস্তত বিপ্তি পড়ে থাকা রক্তে ভেজা হতাহত মানুষের ধ্বংসস্তূপ মনে করিয়ে দেয় এ যেন আরেক ১৫ আগস্ট। আরো মনে করিয়ে দেয়, জাতির পিতার পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশই ছিল ১৫ ও ২১ আগস্টের হত্যাকা-।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে
হত্যার যত পরিকল্পনা
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে একাধিকবার হত্যার অপচেষ্টা করা হয়েছে। মুফতি হান্নানসহ অনেক জঙ্গিই একাধিকবার এই চেষ্টা চালায়। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে কোটালিপাড়ায় ৩ টন ওজনের বোমা পেতে রাখার ঘটনাও ঘটায় মুফতি হান্নান। সে ঘটনাগুলো ১৯৮১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এতে উল্টো বাংলাদেশের মানুষের কাছে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। তবে শেখ হাসিনার প্রাণনাশে ব্যর্থ হলেও ঘাতকচক্র সেসব ঘটনায় অনেক নেতাকর্মীকে হত্যা করতে পেরেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকা-ের ৩০ বছর পর সেই আগস্ট মাসেই আবারো গণহত্যার ঘটনা ঘটে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট তথা খালেদা-নিজামীর নীলনকশা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উচ্চাশা ও জঙ্গিবাদ উত্থানের ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত। তারেক রহমান ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর হাওয়া ভবনে বসে এই হামলার সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বলে জনশ্রুতি আছে। সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৪০০ নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন; নিহত হন আওয়ামী মহিলা লীগ নেত্রী ও সাবেক রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী আইভী রহমানসহ ২৪ জন। বিশ্বজুড়ে তোলপাড় করা গ্রেনেড হামলার সেই ঘটনার ভয়াবহতা হতবাক করে দিয়েছিল দেশবাসীকে। পরের বছর (২০০৫) ঠিক একই মাসের ১৭ তারিখে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে ৫ শতাধিক বোমা বিস্ফোরণ এবং নিহত মানুষের স্বজনদের আর্তনাদ ও আহতদের কান্নায় সর্বস্তরের মানুষের মনে ােভ ও ঘৃণা আরো তীব্র হয়ে উঠেছিল; কিন্তু বোমা হামলার ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলো শুরু হয়েছিল তারও আগে থেকে। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরের টাউন হল মাঠে উদীচীর সমাবেশে এক বোমা হামলায় নিহত হন ১০ জন। একই বছর ৮ অক্টোবর খুলনার নিরালা এলাকায় অবস্থিত কাদিয়ানিদের উপাসনালয়ে বোমা বিস্ফোরণে ৮ জন নিহত হন। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে সিপিবির মহাসমাবেশে বোমা হামলায় ৬ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হন। একই বছরের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ১১ জন। ৩ জুন বোমা হামলায় গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর গির্জায় সকালে প্রার্থনার সময় নিহত হন ১০ জন, আহত হন ১৫ জন। সিলেটে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া নিহত হন গ্রেনেড হামলায়। ২০০৪ সালের ২১ মে শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে গেলে গ্রেনেড হামলায় আহত হন তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী। এছাড়াও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সমাবেশে, অফিসে, নেতার গাড়িতে, সিনেমা হলে একাধিক বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে বোমা ও গ্রেনেড হামলায় নিহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। অথচ ২০০১ সালে মতায় এসে বিএনপি-জামায়াত জোট এ ধরনের তৎপরতা বন্ধে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। হামলা প্রতিরোধ ও জঙ্গি দমনে তৎকালীন সরকারের নিষ্ক্রিয়তা জঙ্গিবাদ উত্থানে সহায়ক হয়। সবগুলো হামলার পেছনে শেখ হাসিনার হাতকে নির্জীব করাই উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এতে শেখ হাসিনার হাত আরো শক্তিশালী হয়েছে। জঙ্গিবাদের বিষবাষ্প থেকে দেশকে উদ্ধার করে বঙ্গবন্ধুকন্যা ২০০৯ সাল থেকে অদ্যাবধি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন আছেন এবং দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

জোট সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়
২১ আগস্টে ঘাতকচক্র ছিল মরিয়া
২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে নেত্রীকে তুলে দেয়া হয় বুলেটপ্রুফ গাড়িতে। সেই সময় গাড়িকে ল্য করে আবারও গ্রেনেড চার্জ করা হয়। বিস্ফোরিত গ্রেনেডের কয়েকটি স্পিøন্টার তার গাড়ির সামনের দিকের কাচে আঘাত করে। সেই মুহূর্তে নিহত হন শেখ হাসিনার নিরাপত্তাকর্মী মাহবুব। এবার ঘাতকচক্র শেখ হাসিনার গাড়ি ল্য করে গুলিবর্ষণ করে। ঘাতকদের গুলির টার্গেট ছিল গাড়ির চালকের পাশের আসনের মানুষটির প্রতি। শেখ হাসিনা সাধারণত চালকের পাশের আসনেই বসেন। গাড়ির সামনে এবং পেছনের অংশে গুলির চিহ্ন বিদ্যমান ছিল। গ্রেনেডের স্পি­ন্টারের আঘাতে বাম দিকের তৃতীয় জানালার কাচ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। গাড়ির পেছনের বাম দিকের দরজার কাচে ৪টি, পেছনের বাম দিকের কাচে ১টি গুলি করা হয়। বাম পাশে পেছনের দিকে এসে লাগে ২টি গুলি। একটি গুলির আঘাতে গাড়ির কাচ ভেঙে যায়; তবে স্টিলের পাত ভেদ করতে পারেনি। তাই অনেকটা অলৌকিকভাবে অল্পের জন্য প্রাণে রা পান বঙ্গবন্ধুকন্যা। সেই অন্ধকার কালো ধোঁয়ার মাঝে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় মৃত্যুপুরী থেকে বেরিয়ে আসে শেখ হাসিনার গাড়ি।
প্রথমে গ্রেনেড চার্জ, এরপর গুলিবর্ষণ Ñ এতেই প্রমাণিত হয় শেখ হাসিনাকে শেষ করে দেয়ার ব্যাপারে ঘাতকচক্র ছিল মরিয়া। প্রশিণপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ ঘাতকরা সুপরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাক্সার প্রদীপ ও শেখ পরিবারের প্রতিনিধি শেখ হাসিনাকে এই পৃথিবী থেকে একেবারেই নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল।

কে দিয়েছিল গ্রেনেড হামলার নির্দেশ
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার আরো সোয়া ২ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ওই সময়ে জোট সরকার এই নারকীয় হামলার বিচার করা দূরের কথা, একটি গ্রহণযোগ্য তদন্ত পর্যন্ত করেনি। বরং গ্রেনেড হামলা মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে নানা ছলচাতুরী ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। জোট আমলের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং জিয়া পরিবারের খুবই প্রিয়ভাজন লুৎফুজ্জামান বাবর ওয়ান-ইলেভেনের পর গ্রেপ্তার হন। ওই সময় জিজ্ঞাসাবাদে বাবর স্বীকার করেন, ‘ওপর মহলের নির্দেশে তিনি গ্রেনেড হত্যা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন।’
হামলার পরদিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গিয়ে বাবর বলেন ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এমন খেলো কথায় তখন অনেকেই মন্তব্য করেন, জোট সরকার ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের সব চেষ্টাই সম্পন্ন করতে যাচ্ছে। এরপরই শুরু হয় ‘জজ মিয়া’ নাটক। সেই নাটকের পরিণতি কারো কাছেই অজানা নয়।
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ মামলার অধিকতর তদন্ত করে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। তাতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আরো ৩০ জনকে আসামি করা হয়। বর্তমানে মামলার মোট আসামি ৫২ জন। আসামিদের মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৯ জন পলাতক, ৬ জন জামিনে এবং বাবরসহ ২৬ জন রয়েছেন কারাগারে। এই মামলার অন্যতম আসামি নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু ২০১৮ সালে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন।
সম্পূরক অভিযোগপত্রে তারেক রহমান ছাড়াও আসামি হচ্ছেন লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, প্রাক্তন এমপি কায়কোবাদ, বেগম জিয়ার বোনের পুত্র ডিউক, ডিজিএফআই-র সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার (অব.), মেজর জেনারেল এ টি এম আমিন (অব.), লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার (বরখাস্ত), এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুর রহিম (অব.), পুলিশের সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরীসহ আরো অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
জানা যায়, মুফতি হান্নান, ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি সাদিক হাসান রুমি ও লে. কমান্ডার মিজানুর রহমান, র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর আতিকুর রহমান (অব.)-এর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তারেক রহমান, সাবেক উপমন্ত্রী পিন্টু, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ জোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বনানীর হাওয়া ভবনে গিয়ে মুফতি হান্নান, লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, রেজ্জাকুল হায়দার, আবদুর রহিম ও অন্যদের সাথে শলা-পরামর্শ করেন। বৈঠকে শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য হামলায় অংশগ্রহণকারীদের প্রশাসনিক সহায়তা ও নিরাপত্তা দেয়ার আশ্বাস দেন তারেক রহমান ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর।

জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রই ছিল ১৫ ও ২১ আগস্টের হত্যাকা-: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রত্য মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা সম্ভব হতে পারে না। জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রই ছিল ১৫ ও ২১ আগস্টের হত্যাকা-। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা বেগম খালেদা জিয়াও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দায় এড়াতে পারেন না।
গত ২১ আগস্ট রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গ্রেনেড হামলার ১৫তম বার্ষিকী উপলে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, গ্রেনেড হামলা মামলায় খালেদা জিয়াকে আসামি করা হয়নি; কিন্তু এ হামলায় তার সহযোগিতা রয়েছে। ওই সময় খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তাই এই হামলার দায়-দায়িত্ব তিনি এড়াতে পারেন না। বোধ হয় খালেদা জিয়া ওই হামলার সময় শোকবার্তা তৈরি করেই রেখেছিলেন যে, আমি মরলে পরে একটা কন্ডোলেন্স (শোকবার্তা) জানাবেন। সেটাও নাকি প্রস্তুত করা ছিল; কিন্তু আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন, সেটাই বড় কথা।
তিনি বলেন, অনেক পরে মামলা করে আমরা একটা রায় পেয়েছি। হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের আপিলের শুনানির জন্য পেপারবুক তৈরি হচ্ছে। আশা করি, আমরা বিচার পাব; কিন্তু যাদেরকে আমরা হারিয়েছি তাদেরকে তো আর ফিরে পাব না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে তৎকালীন মতাসীনদের ওই গ্রেনেড হামলায় আমার বেঁচে থাকার কথা নয়। ওরা (বিএনপি-জামায়াত জোট) ভাবেনি যে আমি বেঁচে থাকব। অনেক ছোট ছোট ঘটনা আমি জানি। যারা হামলা করেছে তারা এক জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। সেখান থেকে ফোন করেছে যে, আমি মারা গেছি কি না।
শেখ হাসিনা বলেন, শুধু এটুকুই বলব, আমি বেঁচে আছি। মৃত্যুকে ভয় করি না, মৃত্যুভয়ে আমি কখনোই ভীত ছিলাম না, এখনো নই।

শেষ কথা
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরী শেখ হাসিনা তথা এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার নেতৃত্বকে নিঃশেষ করার সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত হয়েছে। সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পরের বছর সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে দেশকে তালেবান রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্রও নস্যাৎ হয়েছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াত যে কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা করেছিল, ঘটনার ১৪ বছর পরও সে কলঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছে এদেশের মানুষ। ২১ আগস্ট ষড়যন্ত্রকারীদের সুষ্ঠু বিচার হলেই কেবল জাতি কলঙ্কমুক্ত হবে। আর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সেই সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার ডেথ রেফারেন্সের রায় বেরুবে যেকোনো দিন। ফলে ষড়যন্ত্রকারীদের গাত্রদাহ আবারো শুরু হয়েছে। দেশপ্রেমিক জনগণ মনে করছে, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার নিরপেক্ষ বিচার হলেই কেবল ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হত্যাকা-ের মতো সহিংস ঘটনা চিরতরে বন্ধ হবে।