রাজনীতি

কারা হচ্ছেন ঢাকা সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রার্থী

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। মেয়াদপূর্তির কারণে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসাবে মাস দুয়েক এগিয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বরের নির্বাচন সম্পন্ন করার কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন।
ইসির সিটি নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রস্তুতির কারণে এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক নেতা মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করেছেন। বিএনপি অবশ্য বলছে, বর্তমান সরকারের অধীনে তারা কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে না, কিন্তু তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা দেখে মনে হয়, দুই সিটির মেয়র নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে তারা বরাবরের মতো নির্বাচনি মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে তারা হয়তো সরকারকে ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ না দেয়ার পুরনো কেচ্ছাই বয়ান করবে।
জানা গেছে, মেয়র নির্বাচনে ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলামই আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকবেন। দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের পরিবর্তে ভাবা হচ্ছে শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস বা ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীকে। তবে ঢাকার প্রয়াত সফল মেয়র মোহাম্মদ হানিফের পুত্র ও ঢাকা দক্ষিণের বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনও পুনরায় মনোনয়ন পেতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলে দৌড়ঝাঁপ করছেন বলে জানা যায়।
অপরদিকে ঢাকা উত্তরের মেয়র পদে তাবিথ আউয়াল মিন্টুই বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে এগিয়ে রয়েছেন। আর দক্ষিণের মেয়র পদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের পরিবর্তে দলের ভাইস চেয়ারম্যান অবিভক্ত ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনের সম্ভাবনাই এখন পর্যন্ত বেশি।
আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব আতিকুল ইসলামকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে দ্বিতীয় দফায়ও তাকেই মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগ। কারণ খুব কম সময়ের জন্য তিনি মেয়র হয়েছেন। কর্মদক্ষতা প্রমাণে তাই তাকে আরো সময় দিতে চান আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাছাড়া ঢাকা উত্তরে বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষ উচ্চবিত্ত হওয়ায় এবং আতিকুল নিজেও উচ্চবিত্ত শ্রেণিভুক্ত হওয়ার কারণে সেখানে তিনি ভালো করতে পারবেন বলে মনে করে আওয়ামী লীগ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের হিসাবনিকাশ অবশ্য ভিন্ন। বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন মনোনয়ন পাচ্ছেন না এটা অনেকটা নিশ্চিত। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ায় তার ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনা। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ে অনেকেই মেয়রের ব্যর্থতার কথা বলছেন। পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম অপসারণেও সাঈদ খোকন সাফল্য দেখাতে পারেননি।
দক্ষিণের ক্ষেত্রে সাবের বা তাপসের মতো পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক নিয়েই এগিয়ে যেতে চায় আওয়ামী লীগ। এ দু’জনের রাজনীতির বাইরেও দুটি পরিচয় আছে। সাবের ব্যবসায়ী এবং আন্তর্জাতিকভাবে তার পরিচিতি রয়েছে। আর তাপস বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও ১৫ আগস্ট বাবা-মা হারিয়ে এতিম হয়ে বড় হয়েছেন। এর ফলে তাপস নাগরিক সিমপ্যাথি পাবেন বলে মনে করা হয়।
উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অনেকটা চূড়ান্ত হয়ে গেলেও বিএনপি এখনো প্রার্থী নির্দিষ্ট করতে পারেনি। জানা গেছে, ইশরাক ছাড়াও সাবেক কমিশনার দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল বাশার, যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেলসহ আরও কয়েকজন দক্ষিণের মেয়র পদে প্রার্থী হতে আগ্রহী। শামা ওবায়েদ, মাহবুবে রহমান শামীম, মীর শরাফত আলী সপু, শিরিন সুলতানাও আছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীর দৌড়ে। ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রার্থী হিসেবে তাবিথ ছাড়াও ঢাকা মহানগর উত্তরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বজলুল বাসিত আঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসানসহ আরও কয়েকজন মেয়র প্রার্থী হতে আগ্রহী।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য স্বদেশ খবরকে বলেন, বিএনপি এখন তরুণ নেতৃত্ব চায়। সম্ভাবনাময় তরুণ নেতাদের লাইমলাইটে আনতে চায়। সে হিসেবে ঢাকা উত্তরে তাবিথ, দক্ষিণে ইশরাককে প্রার্থী করার সম্ভাবনা বেশি। তাছাড়া লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতোমধ্যে এই দুই জনকে সাংগঠনিক কাজ শুরু করতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে স্থায়ী কমিটির ওই সদস্য ইঙ্গিত দেন।
ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির সম্ভাব্য মেয়রপ্রার্থী ইশরাক স্বদেশ খবরকে বলেন, গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি নির্বাচনমুখী দল। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে এবং আমাকে দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিলে প্রার্থী হবো। বাবার মতো ঢাকাবাসীর পাশে থেকে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার সমুন্নত রাখতে কাজ করে যাব।
ইশরাক হোসেনের জন্ম ১৯৮৭ সালে। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে বিএনপির হয়ে লড়াই করে পরাজিত হন তিনি।
উত্তরের মেয়র পদে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল মিন্টু। সর্বশেষ ২৮ এপ্রিল ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন তিনি। তিনি স্বদেশ খবরকে বলেন, মনোনয়নের বিষয়টি নির্ভর করে দলের ওপর। দল চাইলে বিগত নির্বাচনের মতো এবারও নির্বাচন করার ইচ্ছা আমার আছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী হিসেবে ফজলে নূর তাপস ও সাবের হোসেন চৌধুরী Ñ এ দু’জনকেই এগিয়ে রাখা হয়েছে। এ দুই নেতার রাজনৈতিক পরিচয়ও আছে, সুশীল ভাবও আছে। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে দল তাদেরই উপযুক্ত মনে করছে। আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর একজন সদস্য স্বদেশ খবরকে জানান, শেখ ফজলে নূর তাপস নিজেও প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে মেয়র নির্বাচন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতা স্বদেশ খবরকে বলেন, আগামী বছর জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ঘোষিত ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনের সুবিধার্থে আগেভাগে সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠান জরুরি। জাতির পিতার জন্মদিন ১৭ মার্চ থেকে শুরু করে পরের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত মুজিববর্ষ উদযাপিত হবে। যার ফলে চলতি বছরের ডিসেম্বরই উত্তম সময় সিটি নির্বাচনের। গত দুটি জাতীয় নির্বাচনও ডিসেম্বর টার্গেট করে করা হয়েছে। এসব কারণে ডিসেম্বরে সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করছে আওয়ামী লীগ।