ফিচার

ঘুরে আসুন পর্যটনকেন্দ্র মেঘলা থেকে

স্বদেশ খবর ডেস্ক
সবুজের সমারোহের মাঝে প্রথমেই চোখে পড়ে বাইতুল ইজ্জত পুলিশ ট্রেনিং ক্যাম্প। এটা পেরিয়ে যাওয়ার পর বিচিত্র অভিজ্ঞতা Ñ কখনও গভীর খাদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে গাড়ি, কখনও দীর্ঘ সমতল, সুউচ্চ পাহাড়, ঘন সবুজ বৃক্ষরাজি আর আদিবাসী পাহাড়িদের জীবনযাত্রা।
চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিয়ে বান্দরবানের কাছাকাছি এসে গাড়ি খাড়া চলতে শুরু করলে আপনার হয়তো মনে হবে, এই গাড়ি আর উঠবে না। কারণ গাড়ি তখন শুভলংয়ের পাহাড়ে। গাড়ি না ওঠার ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে দেবে গাড়ির হেলপার। ভয়ার্ত পর্যটককে সে ডাক দেবে ‘মেঘলা আইয়ন, মেঘলা আইয়ন’ বলে।
গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই একটি ছোট পর্যটন গেট Ñ যেখানে লেখা, পর্যটনকেন্দ্র মেঘলা। টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকার পর গেটের পাশেই ১০০ ফুট গভীর খাদ বেয়ে নামতে হবে নিচে। আছে কটেজ, রেস্ট হাউস, শিশু পার্ক ও নয়নাভিরাম একটি লেক। লেকে নানা ধরনের মাছের চাষ হয়। আছে নৌবিহারের ব্যবস্থা। রয়েছে ক্যাবল কারও।
ছাতাঘর ও গোলঘর রয়েছে পুরো এলাকায়। এতে বসে পথের ক্লান্তি ভুলে জিরিয়ে নেয়া যায় আর অবসর উপভোগ করা যায় প্রাণভরে। এই পর্যটনকেন্দ্রের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতু। দু’টি ঝুলন্ত সেতু যেন দু’পাহাড়ের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করেছে।
মেঘলা পর্যটনকেন্দ্রে রয়েছে হরিণ, বানর, সাপ, গয়াল, বনবিড়াল, খরগোশ প্রভৃতি।
মেঘলায় ঘোরার পর গোধূলি বেলায় আপনি যেতে পারেন মূল শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরের একটি পাহাড়ে। স্থানীয়দের কাছে এটি টাইগার হিল নামে পরিচিত হলেও কেতাবী নাম নীলাচল।
পাহাড়ি অন্যসব পথের মতো নীলাচলের পথও রোমাঞ্চে ঠাসা। নানা চড়াই-উৎরাই পেরুতে পেরুতে এক সময় মিতালি হবে মেঘের সঙ্গে। আর তখন এক মুগ্ধ আবেশে ভরে যাবে মন।
একেবারে পাহাড়ের শেষ মাথায় চারপাশকে মনে হবে ছোট্ট একটি জগত। পুরো পৃথিবীকে মনে হবে নাগালের মধ্যে, হাতের মুঠোয়। কারণ নীলাচলের পাহাড়ের চারপাশে আকাশ তার সীমানা টেনেছে।
২০০৬ সালে এই পর্যটন স্পটটি চালু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৬০০ ফুট উচ্চতার নীলাচল যেতে পথের ধারে চোখে পড়বে প্রাচীণ বৌদ্ধ মন্দির ও রতœপ্রিয় বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র।
রাতে বান্দরবান শহরের সাঙ্গু নদীর সেতুতে দাঁড়িয়ে জোছনা উপভোগ করুন। পরদিন আপনার গন্তব্য হতে পারে নীলগিরি। সেখানে বান্দরবান থেকে রিজার্ভ গাড়ি নিয়ে যাওয়াই ভালো। এতে পথে পথে দাঁড়িয়ে খাদ আর স্বচ্ছ নদী দেখা যাবে মনভরে।
বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত নীলগিরি। পাহাড়ের ওপর দিয়ে নির্মিত থানচি-আলীকদম সড়কটি বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক। নীলগিরির পাহাড়ি পথটি অন্যসব পথের চেয়ে আলাদা। কোথাও পথের খেয়ালে পথ হারিয়েছে।
এই পথের শেষ আরেক পথ আদৌ আছে কি না সেটা অজানাই রয়ে যাবে, যদি না রোমাঞ্চ অনুভব করার মন থাকে। হঠাৎ গাড়ি চলে যাবে অনেক নিচে। মনে হবে এই বুঝি পড়ে যাচ্ছেন পাহাড়ি খাদে। আবার সেখান থেকে লড়াকু সৈনিকের মতো জেগে উঠবে ইঞ্জিন।
এই পথেই রয়েছে চিম্বুক পাহাড়। গাড়ি থেকে নেমে এখানে প্রশান্তির ছোঁয়া পেতে পারেন। বাংলার দার্জিলিং বা পাহাড়ের রাণী বলা হয় চিম্বুককে। যেদিকে চোখ পড়বে ঘন জঙ্গল। এ এমন এক দৃশ্য, যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। নাম না জানা নানা পাহাড়ি ফুল দৃশ্যকে আরও সতেজ করে তুলেছে। নীলগিরি পৌঁছে মুগ্ধতা যেন কাটতেই চাইবে না। যেদিকেই তাকাবেন চোখ ফিরিয়ে নিতে পারবেন না। অসাধারণ সুন্দর সবকিছুই। যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্বপ্নরাজ্য। এখানে আকাশ পাহাড়ের সঙ্গে মিতালি করে। মেঘেরা চুমু দিয়ে যায় পাহাড়ের চূড়ায়। হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে দেয়া যায় মেঘের পালক।
মেঘের দল এখানে খেলা করে আপনমনে। সে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। আকাশ, বাতাস, সবুজ আর মেঘের দল লুটোপুটি খায় পদতলে। এ এক শিহরণ জাগানো অনুভূতি, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। অবচেতন মনে হারিয়ে যাবেন ক্ষণিকের জন্য। সবচেয়ে ভালো লাগবে যখন হাত দিয়ে ধরা যাবে মেঘ। মেঘের সঙ্গে ধাক্কা খাবে শরীর। আশপাশের পাহাড়ে কখনও মেঘ কখনও রোদের লুকোচুরি খেলা চোখে পড়বে। এক পাহাড়ে বৃষ্টি তো আরেক পাহাড়ে রোদ। নীলগিরিতে বেশ কয়েকটি কটেজ রয়েছে। কেউ রাত কাটাতে চাইলে আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন।
ফেরার সময় দেখবেন সূয্যি মামা তার দিনান্তের পাঠ শেষে বাড়ি ফিরছে। বিকেলের আবির আলো লাল পাহাড়কে আরও রাঙিয়ে তুলেছে।
বন্ধুর পথে এবার আপনার ফেরার পালা। সেই পথের বাঁকে বাঁকে খেলা করছে রহস্য-রোমাঞ্চের জগৎ। আকাশের তারাগুলো ইশারায় কথা বলছে। শেয়ালের হুক্কা হুয়া রব। ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। জোনাকিরা আলো ছড়াচ্ছে। গাড়ি ছুটছে রাতের নীরবতা ভঙ্গ করে।

কিভাবে যাবেন
যেকোনো জায়গা থেকে বান্দরবান গিয়ে সেখান থেকে রিজার্ভ গাড়িতে করে বান্দরবানের বিভিন্ন জায়গা ঘোরা ভালো। স্বর্ণ মন্দির, জাদিসহ দেখার আছে অনেক কিছু। এছাড়া বিভিন্ন গন্তব্যে পাহাড়ি চান্দের গাড়িও ছাড়ে।

কোথায় থাকবেন
মেঘলা, নীলাচল, নীলগিরিতে বা আশপাশে কটেজ রয়েছে। এছাড়া বান্দরবান শহরে রয়েছে নানা মানের ও দামের আবাসিক হোটেল।