কলাম

জাপানের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে কিছু ভাবনা

মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন
বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন একজন মানুষের মূল ভিত্তি হলো তার প্রাথমিক শিক্ষা। প্রতিটি শিশু তার জন্মলাভের পর থেকে বিদ্যালয়ে ভর্তির আগ পর্যন্ত পরিবারের কাছে বিশেষত মা-বাবার স্নেহ-ছায়ায় জীবনের মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে শেখে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ শিশুদের সে সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করে, যা তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। মূলত এটি নির্ভর করে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি প্রভৃতির ওপর।
সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করেছে। বাস্তবায়িত হতে চলেছে প্রধানমন্ত্রী প্রণিত ‘রূপকল্প-২০২১’। এর পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তার সফল বাস্তবায়নে প্রাথমিক শিক্ষাকে উন্নত দেশের মতো মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নীত করতে হবে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নাম্বার অভীষ্ট হলো ‘সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি’, যার ৯.২ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ছেলে-মেয়ের প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাসহ শৈশবের একেবারে গোড়া থেকে মানসম্মত বিকাশ ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠার নিশ্চয়তা বিধান করা।
পড়াশোনার সুবাদে আমার সুযোগ হয়েছিল দীর্ঘদিন জাপানে থাকার। দুই বছর চার মাস জাপানে অবস্থানকালে খুব কাছে থেকে দেখেছি সেখানকার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার পরিসর কতটা বিস্তৃত। আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা আর জাপানের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে একটি তুলনামূলক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যই মূলত বেশ কয়েক বার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গিয়েছি। দেশটিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি কিন্ডারগার্টেন থাকলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর যে জনপ্রিয়তা এবং মান, তার কাছাকাছিও নেই এসব কিন্ডারগার্টেন। এর মূল কারণ হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকল্পে সে দেশের সরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে নৈতিক শিক্ষা। তাদের বিশ্বাস, আগে নীতিনৈতিকতা, পরে পাঠ্য শিক্ষা।
জাপানে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত অর্থাৎ চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা নেই। স্কুলজীবনের প্রথম তিন বছর মেধা যাচাইয়ের জন্য নয়; বরং ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, দেশপ্রেম ও ন্যায়পরায়ণতা শেখানো হয়। জাপানিরা নম্রতা, ভদ্রতা বা নীতিনৈতিকতায় বিশ্বখ্যাত। আমি দেখেছি, সেখানে স্কুলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য কোনো ঝাড়–দার নেই। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কোনো কোনো সময় অভিভাবকরা মিলে স্কুল ক্যাম্পাস সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন। এ ছাড়া বছরে নির্দিষ্ট একটি দিনকে স্কুল দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ওই দিন সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মিলে পুরো স্কুল ক্যাম্পাস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার বিশেষ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। প্রত্যেক শিক্ষার্থী মাসে অন্তত একবার বাধ্যতামূলক বেসিন ও টয়লেট পরিষ্কার করে থাকে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকরাও একই কাজ করে থাকেন। ফলে শিক্ষার্থীরা আরো বেশি উদ্বুদ্ধ হয়।
স্কুলের প্রতিটি ক্লাসের শেষ সারিতে অভিভাবক-ভিজিটরদের বসার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। যেকোনো অভিভাবক যেকোনো সময় স্কুলে ক্লাসের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট স্থানে রক্ষিত মন্তব্য রেজিস্টারে মন্তব্য লিখতে পারবেন।
শিশুরা প্রতি দুই পিরিয়ড পর ক্লাস থেকে বের হয়ে মাঠে বা জিমে বা পার্কে গিয়ে নিজেদের মতো কিছু সময় কাটায়। সেখান থেকে ফিরে নিজের দেখা চারপাশের যেকোনো বিষয় নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে।
স্কুলে সব শিক্ষার্থীর একটি করে টবে নিজেদের রোপিত গাছ থাকে এবং তারা নিজেরাই সে গাছের যতœ নেয়।
বিদ্যালয়গুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে খাবার পরিবেশন করা হয়। প্রতিটি স্কুলে রয়েছে নিজস্ব রান্নাঘর, যেখানে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় খাবারের গুণগত মান; খাবারের মান নিশ্চিতকরণের জন্য সেখানে থাকেন একজন ডায়েটিশিয়ান।
শিশুদের খাবার গ্রহণ পদ্ধতিটিও চমৎকার। তারা সুশৃঙ্খলভাবে আহার করে। তাদের প্রতিদিন খাবার গ্রহণের আগে জানানো হয় তারা কী খাচ্ছে, কেন খাচ্ছে ইত্যাদি এবং খাবার যিনি রান্না করেছেন, তাকে কিভাবে প্রশংসা করতে হয় তাও শেখানো হয়।
খাবারের পাশাপাশি যে বিশেষ দিকগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয় তা হলো দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসেবা। যেকোনো কাজ করার পর শিশুদের হাত ধোয়ার জন্য প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
জাপানে পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। স্কুলের প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, রয়েছে শিশুদের উচ্চতা, ওজন পরিমাপসহ শারীরিক, মানসিক ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুব্যবস্থা।
স্কুলে খেলার সামগ্রী খেলাধুলা শেষে আবার যথাস্থানে নিজ হাতে সাজিয়ে রাখা এবং নিজের পোশাক সুন্দরভাবে পরিধান করা শেখানো হয়।
ওখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করেছি তা হলো, কোনো শিশু নিজস্ব গাড়িতে করে সরাসরি স্কুলের কাছাকাছি এসে নামতে পারবে না; বরং স্কুল থেকে বেশ দূরে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে স্কুলে আসবে। ফলে যাদের গাড়ি নেই সেসব শিশুর মনে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না।
শ্রেণিকক্ষে যেসব অভিজ্ঞতা শিশুরা সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না, সেসব বিষয়ে জানানোর জন্য ফিল্ড ট্রিপের আয়োজন করা হয়। ফিল্ড ট্রিপে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা প্রতি বছর অন্য সব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিশেষভাবে কৃষিকাজ শিখে থাকে। যেমন ধান চাষ কিভাবে করা হয়, কিভাবে পরিচর্যা করা হয় ইত্যাদি।
ওখানে রয়েছে মিউজিক অ্যান্ড ড্রামা অ্যাপ্রিসিয়েশন, যা শিশুদের সংগীত ও সুরের মাধ্যমে সুন্দর মনের অধিকারী হতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। শিশুদের রিপোর্ট কার্ড প্রতি টার্মে তাদের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এখানে ক্লাসে শিশুরা কী ধরনের ফল করল, তার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রতিটি কর্মকা-ে তাদের অংশগ্রহণ, নিয়মানুবর্তিতা, শিক্ষক, বন্ধু এবং বিদ্যালয়ের প্রতি তাদের মনোভাব প্রকাশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে রিপোর্ট কার্ডটির বিন্যাস করা হয়। প্রতিটি ক্লাস শেষে শিশুদের থেকেও সরাসরি লেসন টপিক সম্পর্কে ফিডব্যাক নেয়া হয়। নিজেরা কতটুকু বুঝেছে, বন্ধুরা তাদের বিষয়টি বুঝতে কতটুকু সাহায্য করেছে, পাশাপাশি ক্লাসের বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় এবং ক্লাস টিচার সম্পর্কে লিখিত ও মৌখিক ফিডব্যাক গ্রহণ করা হয়।
জাপানে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হেলথ সেন্টার রয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে একটি কাউন্সিলর কক্ষ। সেখানে একজন কাউন্সিলর বসেন এবং শিশুদের স্বাস্থ্য-শিক্ষাসংক্রান্ত পরামর্শ প্রদান করেন। প্রয়োজনে তারা অভিভাবকদের সঙ্গেও কথা বলেন। বছরে একটি নির্দিষ্ট সময়ে শ্রেণি শিক্ষকরা প্রতিটি শিক্ষার্থীর বাড়ি পরিদর্শন করেন এবং স্কুল ও বাড়িতে শিশুটি কী ধরনের আচরণ করছে ইত্যাদি বিষয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন।
আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সামগ্রিকভাবে আমাদের ভাবতে হবে। মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন নীতিনৈতিকতা শিক্ষার ওপর জোর দেয়া। পাঠ্য শিক্ষাকে গুরুগম্ভীর না করে আরো সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপনে প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক। স্কুল অ্যাসেম্বলি থেকে শুরু করে বিদ্যালয় ত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত ভালোভাবে মনিটরিং করলে এবং সে অনুযায়ী শ্রেণিশিক্ষক ব্যবস্থা নিলে একজন শিক্ষার্থীর মানবিক বিকাশ সহজ হবে।
জাপানের আদলে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা রাতারাতি ঢেলে সাজানো সম্ভব না হলেও আমরা তাদের অনুকরণীয় ও সৃজনশীল কাজগুলোকে বিশেষত নৈতিকতা, স্বাস্থ্যজ্ঞান, শৃঙ্খলাবোধ, নিয়মানুবর্তিতা ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করতে পারি। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও প্রয়োজন রয়েছে নিজের দায়িত্বের প্রতি সচেতন থাকা। নৈতিক ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন সময়ানুবর্তী ও দক্ষ শিক্ষকই পারেন একজন শিশুকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে।
একটি আদর্শ দেশ বা জাতি যদি গড়তে চাই, সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষাকে আরো মানসম্পন্ন করে ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ যে সফলতা দেখিয়েছে, একইভাবে এসডিজি অর্জনেও সে সফলতার জন্য প্রয়োজন গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ। বর্তমান সরকার সে লক্ষ্যে নির্বাচনি ইশতেহারে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। সম্প্রতি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা না নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
সার্বজনীন এবং গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য সরকার কাজ শুরু করেছে। আমাদের শিক্ষার একটি সুনির্দিষ্ট এবং সর্বজনগ্রাহ্য মূল লক্ষ্য ঠিক করতে হবে, যা আমাদের নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে আধুনিক যোগ্য বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
লেখক: জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম