রাজনীতি

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপি নেতাদের অঙ্গীকার: রাজপথেই ফয়সালা হবে খালেদা জিয়ার মুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যেদিন জেলে যান, সেদিন থেকেই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও অন্য কেন্দ্রীয় নেতারা বলে আসছিলেন, আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনা হবে। কিন্তু গত প্রায় দুই বছর ধরে খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে বিএনপি ন্যূনতম আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। এমন কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেনি, যাতে সরকারকে নড়েচড়ে বসতে হয়। মির্জা ফখরুল স্বীকারও করেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে তারা জনগণের সিমপ্যাথি অর্জন করতে পারেননি। জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া আন্দোলন করা যায় না বলেও তিনি একাধিকবার স্বীকার করেছেন।
এ অবস্থায় গত ২ সেপ্টেম্বর বিএনপি তাদের ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপি নেতারা রাজপথেই খালেদা জিয়ার মুক্তির ফায়সালা হবে বলে অঙ্গীকার করেন। কিন্তু রাজপথে আন্দোলনের ধরণ কী হবে, তারা কবে থেকে হার্ড লাইনে যাবেন, সে বিষয়ে কোনো কথাই বলেননি। সে হিসেবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও বিএনপির আন্দোলনের অঙ্গীকারটি ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, আন্দোলন করার জন্য যে সাহস ও যোগ্যতা লাগে, নীতি-নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে সে যোগ্যতা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছেন বিএনপি নেতারা।
৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রাজপথে আন্দোলন করার শপথ নিয়ে বিএনপি নেতারা বলেছেন, সরকার খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করে অলিখিত বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই গণতন্ত্র বাঁচাতে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার আন্দোলনের বিকল্প নেই। রাজপথের আন্দোলনে এর ফয়সালা করতে হবে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা-পূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এ কথা বলেন।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত এবং তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চাইলে সবাইকে অবশ্যই ত্যাগ স্বীকার করে রাজপথে এসে এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে।
২ সেপ্টেম্বর নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়ে নাইটিঙ্গেল মোড় দিয়ে শান্তিনগরে এসে শেষ হয়। দলীয় ও জাতীয় পতাকা, রঙ-বেরঙের ব্যানার-ফেস্টুন, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতিকৃতিসহ নানা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।
শোভাযাত্রায় দক্ষিণের নেতাকর্মীরা এডিস মশা প্রতিরোধে জনসচেতনতার বিষয়টি তুলে ধরেন। বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে ফকিরাপুল থেকে নাইটিঙ্গেল রেস্তোরাঁ পর্যন্ত গোটা সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। শোভাযাত্রার সম্মুখভাগ যখন নাইটিঙ্গেল মোড়ে তখন মিছিলের শেষ ভাগ ছিল ফকিরাপুল বাজারে।
শোভাযাত্রা শুরুর আগে ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই সরকার জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। জনগণ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন। খালেদা জিয়াকে কারান্তরীণ রেখে জনগণের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্যাতন ও হত্যা করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। পৃথিবীর কোনো স্বৈরশাসক এভাবে টিকে থাকতে পারেনি। তাই আজকে বাংলাদেশের সব মানুষকে জাগ্রত করতে হবে। বিএনপির দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের নেত্রীকে কারাগারে রেখে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করে অলিখিত বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, সরকার আর আমাদের স্তব্ধ করে রাখতে পারবে না। অনেকে প্রশ্ন করেন, দেশনেত্রীর মুক্তি আন্দোলন কখন শুরু হবে? আমি বলতে চাই, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। আর কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, সরকারের পতন ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে না। আসুন, আমরা সরকার পতন আন্দোলনের দিকে যাই।
প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর পরিচালনায় আবদুল্লাহ আল নোমান, বরকতউল্লাহ বুলু, মো. শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, এজেডএম জাহিদ হোসেন, জয়নুল আবদিন ফারুক, মশিউর রহমান, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, আবদুল হাই, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন নবী খান সোহেল, শামা ওবায়েদ, মাহবুবের রহমান শামীম, মীর শরাফত আলী সপু, শিরিন সুলতানা, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, সেলিম রেজা হাবিব, ইশরাক হোসেন, খন্দকার মারুফ হোসেন, সাইফুল ইসলাম নিরব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, আফরোজা আব্বাস, জেবা খান, হেলেন জেরিন খান প্রমুখ শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
র‌্যালি উপলক্ষে নয়াপল্টনসহ শান্তিনগর পর্যন্ত ব্যাপক পুলিশ ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য মোতায়েন ছিল। দুপুর থেকে নয়াপল্টনের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির এই শোভাযাত্রা নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেউ কেউ বলেন, বিএনপি শোভাযাত্রা করেছে ঠিকই, কিন্তু শোভাযাত্রাপূর্ব সমাবেশ থেকে বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারেননি। অনেকে বলেন, আন্দোলন করার জন্য যে ধরনের বক্তৃতা দিয়ে জনগণকে জাগিয়ে তুলতে হয়, সে ধরণের বক্তৃতা দেয়াও ভুলে গেছেন বিএনপি নেতারা।
শোভাযাত্রায় আসা বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের কেউ কেউ মন্তব্য করেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের দেখে মনে হয়, তারাই যেন সরকারে আছে আর সরকারে যারা আছে তারা বিরোধীদলে।
বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা মন্তব্য করেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে আন্দোলন করতে হলে বিএনপি নেতাদের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। বিএনপির ঢাকা মহানগরের অনেক নেতাই নিজের ব্যবসাবাণিজ্য ঠিক রাখতে সরকারি দলের নেতাদের ম্যানেজ করে চলেন। ফিনফিনে পাঞ্জাবি পরে আর চুলে জেল মেখে আর যা-ই হোক জনগণের সিমপ্যাথি অর্জন করা যায় না, আন্দোলনও করা যায় না। জনগণকে নিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন করতে হলে বিএনপি নেতাদের জনগণের কাতারে সামিল হতে হবে। নেতার তকমা বাদ দিয়ে নিজেদের আমজনতায় পরিণত করতে পারলেই খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নে সঠিক আন্দোলন গড়ে উঠবে।