আন্তর্জাতিক

বরিস জনসনের বিরুদ্ধে যে কারণে ক্ষোভে উত্তাল যুক্তরাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে সংসদ স্থগিত করে ক্ষোভের মুখে পড়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। জনগণ, বিরোধী দল, সংসদ সদস্য, সংসদের স্পিকার থেকে শুরু করে নিজ দলের সদস্যদেরও সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।
আগামী ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন মুলতবি করার প্রধানমন্ত্রীর নেয়া সিদ্ধান্ত ২৮ আগস্ট তারিখে রানির অনুমোদন পেলে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ করে হাজার হাজার মানুষ। এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হলে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটের প্রস্তাব আনার হুমকি দিয়েছে বিরোধীরা।
আগামী ৩১ অক্টোবর যেকোনো মূল্যে ব্রেক্সিট কার্যকর করার পথে কোনোরকম বাধা বরদাস্ত করতে রাজি নন বরিস জনসন।
ব্রিটেনের সংসদে চুক্তিহীন ব্রেক্সিট প্রতিরোধ করতে আইন অনুমোদনের প্রচেষ্টার একদিন পরই বরিস তাই এমন পদক্ষেপ নিলেন, যাতে ব্রেক্সিটের সময় পর্যন্ত সংসদের ক্ষমতা খুবই সীমিত হয়ে পড়ে। অধিবেশনের সময় সংকুচিত করে তিনি সংসদ সদস্যদের পাল্টা পদক্ষেপের পথ কার্যত বন্ধ করে দিলেন।
বরিস জনসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লন্ডন, ম্যানচেস্টার, এডিনবরা ও অন্যান্য শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। লন্ডন শহরে সংসদের সামনে মানুষ ‘গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান বন্ধ করো’ লেখা পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। অনেকের হাতে ছিল ইইউর পতাকা। বিক্ষোভ ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটের দিকেও ছড়িয়ে পড়ে।
সেপ্টেম্বরজুড়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে আরও বিক্ষোভ হবে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন। সরকারি ওয়েবসাইটে সংসদ মুলতবি না করার জন্য দাখিল করা একটি ই-পিটিশনে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ১০ লাখেরও বেশি স্বাক্ষর জমা পড়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অধিবেশন শুরু হওয়ার পর সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংসদ মুলতবি রাখা হবে। ১৪ অক্টোবর রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ভাষণের মাধ্যমে আবার অধিবেশন শুরু হবে।
বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপকে গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ও উদারপন্থি দলের নেতা জো সুইনসন রানিকে চিঠি লিখে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতার কথা জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের সাবেক অর্থমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তার মতে, জাতীয় সংকটের এই সময়ে সরকারের কার্যকলাপের ওপর সংসদ নজর রাখতে না পারলে, তা সংবিধানের অবমাননা হবে। হাউস অব কমন্সের স্পিকার জন বারকাউ এই সিদ্ধান্তকে ‘সাংবিধানিক জুলুম’ বলে বর্ণনা করেছেন।
৭০ জনেরও বেশি সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপকে অবৈধ ঘোষণার আবেদন নিয়ে স্কটল্যান্ডের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। ইংল্যান্ডের আদালতেও একাধিক আবেদন জমা পড়ছে। ব্রেক্সিটবিরোধী আন্দোলনকারী জিনা মিলার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে জুডিশিয়াল রিভিউর আবেদন জানিয়েছেন।
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টার্জন বরিসের ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের কড়া সমালোচনা করে মৌলিক গণতান্ত্রিক নীতির অবমাননার অভিযোগ করেছেন।
স্কটল্যান্ডে বরিসের কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান রুথ ডেভিডসন দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। বরিসের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২৯ আগস্ট এ ঘোষণা দেন তিনি।
বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করে প্রধানমন্ত্রীর বেপরোয়া উদ্যোগ থামানোর চেষ্টা করা হবে।
লেবারসহ পাঁচটি বিরোধী দল এক যৌথ ঘোষণাপত্রে সংসদ মুলতবির পদক্ষেপ নিয়ে ভোটাভুটির উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে।
দলের মধ্যে কট্টর ব্রেক্সিটপন্থিদের সহায়তায় নিজের লক্ষ্য পূরণে অবিচল থাকলেও সংসদে বরিস জনসন কতটা সমর্থন পাবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটসহ অন্যান্য উদ্যোগ শুরু করলে কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে ঐক্যের পরীক্ষা হবে। মাত্র একটি আসনের ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিষয়টি বরিসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে স্কটল্যান্ডে কনজারভেটিভ দলের প্রধান রুথ ডেভিডসন পদত্যাগ করায় বরিসের কর্তৃত্ব কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। তার পথ অনুসরণ করে দলের কিছু সংসদ সদস্যও যদি বরিসের সঙ্গ ত্যাগ করেন, সেক্ষেত্রে তিনি বিপাকে পড়বেন।
বরিসের সংসদ স্থগিতের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে স্কটল্যান্ডের আদালতে একটি আবেদন খারিজ হলেও বাকিগুলোর শুনানি হবে। যুক্তরাজ্যের আদালতেও এ সংক্রান্ত একাধিক আবেদন জমা পড়েছে। ব্রেক্সিটবিরোধী প্রচারক জিনা মিলারের এমন এক আবেদনের সঙ্গী হয়েছেন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কনজারভেটিভ পার্টির নেতা স্যার জন মেজর।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সংসদ মুলতবি রাখার পদক্ষেপ ইউরোপীয় ইউনিয়নেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। জার্মান সংসদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান নর্বার্ট রে‌্যাটগেন বলেছেন, চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের পথে সংসদকে পথের কাঁটা হিসেবে দূর করে ইইউকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে থাকলে এর মুখে নতি স্বীকার করা হবে না। তার মতে, কোনো সরকারপ্রধান সংসদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করলে ইইউ সেই আচরণকে পুরস্কৃত করতে পারে না।
এ অবস্থায় বরিস জনসন জানিয়েছেন, তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ব্রেক্সিটের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্য ব্রাসেলসে বরিসের ব্রেক্সিট বিষয়ক মধ্যস্থতাকারী ডেভিড ফ্রস্ট ও ইইউ কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠকে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেফান ব্লক।
চারদিকে কঠোর সমালোচনার মধ্যেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস তার পাশে পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। বরিসের প্রশংসা করে টুইট করেছেন তিনি। ট্রাম্পের মতে, অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে করবিনের পক্ষে বরিসকে ক্ষমতাচ্যুত করা খুবই কঠিন হবে।
এদিকে সমালোচনার বিরুদ্ধে বরিস জনসনের দাবি, ইইউ শীর্ষ সম্মেলনের আগে ও পরে সংসদ ব্রেক্সিট নিয়ে আলোচনার জন্য যথেষ্ট সময় পাবে। আগামী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর ইইউর শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিটেনের সঙ্গে বিচ্ছেদের বিষয়টি প্রাধান্য পাবে।