কলাম

বিমসটেক চ্যালেঞ্জ এবং বঙ্গোপসাগর

কমডোর কাজী এমদাদুল হক (অব.)
শত শত বছর ধরে আঞ্চলিক ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক সংযোগের মাধ্যম হিসেবে বঙ্গোপসাগর এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার যুগেও কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল বিবেচনায় বঙ্গোপসাগর অভিন্ন ভূমিকায় রয়েছে। বিমসটেক এক্ষেত্রে বৃহত্তর আঞ্চলিক অখ-তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির কাজ করছে। একইসঙ্গে প্রধান প্রতিযোগীদের কাছেও বঙ্গোপসাগর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেননা তারা এখান থেকে নানাবিধ সুবিধা কাজে লাগিয়ে তার ফসল নিজ গোলায় তুলে নিতে চায়। তাই যতদিন ভারত মহাসাগরে বৃহৎ শক্তিসমূহের বাণিজ্যের প্রসার এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা বজায় থাকবে, ততদিন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বও উজ্জ্বল হবে।
সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, সার্কের বিকল্পস্বরূপ এবং পাকিস্তানকে আঞ্চলিক ফোরামের বাইরে রাখার উদ্দেশ্যেই বিমসটেক (ইওগঝঞঊঈ, ইধু ড়ভ ইবহমধষ ওহরঃরধঃরাব ভড়ৎ ঃযব গঁষঃরংবপঃড়ৎধষ ঞবপযহরপধষ ধহফ ঊপড়হড়সরপ ঈড়ড়ঢ়বৎধঃরড়হ)-এর যাত্রা শুরু। এমনটা হলে বিমসটেকের অর্থনৈতিকভাবে আরও গতিশীল হওয়ারই কথা ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বিগত দিনের সম্মেলনে নেতাদের গালভরা প্রতিশ্রুতির পরেও বিমসটেকের মূল উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে না।
ফোরামে ১৪টি প্রাধিকারভুক্ত বিষয় ছিল। ২০১৮ সালের অক্টোবরে কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত ৪র্থ সামিট থেকে বিমসটেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ‘সমুদ্র অর্থনীতি’কে সহযোগিতার একটি নতুন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। আজ অবধি প্রাধিকারভুক্ত কোনো সেক্টরেই উল্লেখযোগ্য তেমন উন্নতি পরিলক্ষিত হয়নি। বলা যেতে পারে, বিমসটেক অনেক রকমের এবং অনেক সংখ্যক প্রাধিকারভুক্ত সেক্টরের চাপে ভারাক্রান্ত হওয়ায় সুফল মিলেছে অল্প।
বিমসটেকের দীর্ঘ ধীরযাত্রায় ভারতের উদ্যোগে সম্প্রতি, বিশেষ করে ৪র্থ সামিটের পরে আঞ্চলিক যোগাযোগ সহযোগিতার বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্ব নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একক ঘোষণার বিষয়টি যেন অনেকটা ভারতের ‘পুবে তাকাও/সবার আগে পড়শী’ এই নীতিরই একটা বহিঃপ্রকাশ। অবশ্য এই সঙ্গে বিমসটেকের তহবিল বৃদ্ধির অঙ্গীকারও ছিল। এর পরেও বিমসটেকের নেতারা কিন্তু অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে ফোরামকে কার্যকর করার জন্য অনেকটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছে।
বাস্তবিক অর্থে বঙ্গোপসাগরে অন্যান্য মেরিটাইম শক্তির উপস্থিতির কারণে বিমসটেক বরং অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। মেরিটাইম সিল্ক রোডের (এমএসআর) অধীনে মিয়ানমারের সিটউতে একটি পোর্ট নির্মাণ করছে চীন। বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার পাওয়ার উদ্দেশ্যে কুনমিং দ্বীপের রামরির কোয়াকপু থেকে তেল পাইপলাইন বসানো, শ্রীলংকার হামবানটোটায় এবং বাংলাদেশের অনেক প্রকল্পেও জড়িত রয়েছে শক্তিশালী দেশটি। জাপানও ইয়াংগুনের অদূরে ২০০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের একটি নতুন কন্টেইনার পোর্ট এবং ৮০০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের বাজেটে দাউইতে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছে। সিটউতে কালাদান নদী ব্যবহার করে ভারত একটি বন্দর নির্মাণ এবং উত্তরপূর্ব ভারতকে সংযুক্ত করার জন্য একটি সড়ক তৈরির প্রকল্প হাতে নিয়েছে। জাপান বাংলাদেশের মাতারবাড়িতে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও একটি জাতীয় সমুদ্র বন্দর নির্মাণে সহায়তা এবং মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
জাপানের কোস্টগার্ড ভারতীয় কোস্টগার্ডের সঙ্গে ২০০০ সাল থেকে মিলে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্র মহড়া দিয়ে আসছে। বঙ্গোপসাগরে নিরাপত্তা সহায়তা নামের এসব কার্যক্রম জাপানকে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌশক্তিতে পরিণত করবে।
যুক্তরাষ্ট্র ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার অর্থনৈতিক দিক অক্ষুণœ রাখার স্বার্থে মালাক্কা প্রণালিতে নিরাপদ এবং নির্বিঘœ সমুদ্র যোগাযোগ নিশ্চিত করতে সদা সচেষ্ট এবং বদ্ধপরিকর। অন্যান্য কোয়াডভুক্ত (জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত) সহযোগীদের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার উপস্থিতি নিতান্তই নগণ্য। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া বিমসটেকে সম্প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছে। চীনের প্রায় ৮২% তেল মালাক্কা প্রণালি হয়ে ভারত মহাসাগর দিয়ে আমদানি হয়ে থাকে। চীনও অবগত যে এই বাণিজ্যপথ প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে সব সময় একটা চাপের মধ্যে আছে। সঙ্গত কারণে এ ধরনের একটি অনিশ্চিত অবস্থায় চীন চাইবে মিয়ানমার, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, মালদ্বীপ অথবা বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে একটি বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করতে। এ সকল মেরিটাইম কর্মকা-কে জোরালোভাবে এগিয়ে নেয়ায় বিমসটেকের মূল চালকদের জন্য মেরিটাইম স্বার্থ নিশ্চিত করতে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর।
চীন তার উচ্চাভিলাষী প্রকল্প এমএসআরের কারণে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন স্থানসমূহে বৃহৎ আকারের স্থাপনা নির্মাণের জন্য বিপুল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করবে বলে আশা করছে। ফলে বিমসটেকের নেতারা বিমসটেক থেকে তাদের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে। ভারত বিমসটেকের জন্য একটি বড় সহযোগী এবং অংশীজন হওয়া সত্ত্বেও সময়মতো কার্যব্যবস্থা না নিলে হয়ত এমএসআরের অগ্রগতি শুধু দূর থেকে অবলোকন করে যাবে, নিজেদের উন্নতি করতে পারবে না। ভারত ও ভুটান ব্যতীত অন্যান্য দেশ বিআরআই (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ)-এর সদস্য রাষ্ট্র। বঙ্গোপসাগরে অনান্য বৃহৎ শক্তির সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি বিমসটেককে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান অথবা সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে, যা অন্যান্য আঞ্চলিক জোট গঠন করে আবার ভিন্ন ভিন্ন ধরনের গ্রুপিং করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এ ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ এবং বিমসটেককে অধিকতর কার্যকর করার জন্য ভারত বিমসটেক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারত মহাসাগরে প্রবেশের জন্য যেহেতু বঙ্গোপসাগর হচ্ছে একটি অন্যতম পথ, সেহেতু বিমসটেকের জন্য এটা একটি আন্তঃনির্ভরশীল অর্থনৈতিক অবস্থানে পরিণত হচ্ছে। অন্যান্য বৃহৎ শক্তি যেন বঙ্গোপসাগরে তাদের উপস্থিতি না ঘটাতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা চাই। বিমসটেক সমুদ্র অর্থনীতির সুবিধা আদায়ে সদাসচেষ্ট থাকবে, সেটিই প্রত্যাশা। তাই জরুরি ভিত্তিতে বিমসটেক নীতিমালা প্রণয়ন আবশ্যক, যেখানে নিজেদের মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় এবং বিমসটেকবহির্ভূত অন্যদের সঙ্গেও নিরাপত্তা সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। এতে বিমসটেকের কোনো দেশ আঞ্চলিক ফোরামের সম্পর্ক রয়েছে এমন অন্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যারা ‘বোট পিপল’ বা ‘নৌকায় আসা জনগোষ্ঠী’ হিসেবে অধিকতর পরিচিত, তাদের বর্তমান সমস্যার একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সকল বিমসটেক দেশের জন্য এক বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের অভিন্ন মিত্র হওয়ার কারণে এই অঞ্চলে চীন একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে যেহেতু চীন রাখাইন রাজ্যে বন্দর নির্মাণে বিপুল অর্থবিনিয়োগ করে ফেলেছে, তাই চীন চাইবে বঙ্গোপসাগরের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি একটা সম্পর্ক বজায় রাখতে। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় হোক, চীন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর রাখাইন রাজ্যে অনুপস্থিতির সুবিধা পেতে শুরু করেছে। চীন এই রাজ্যে একটি শিল্প এলাকা এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও বিনির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। তা ছাড়া বিমসটেকের সদস্য না হওয়ার কারণেও চীন অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বড় সুবিধাজনক স্থানে থাকবে। বিমসটেক নেতা, সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বলা যায় বিমসটেকের অথনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করা প্রয়োজন। দুর্বল সমুদ্র ব্যবস্থাপনা, সবার ওপরে রোহিঙ্গা ইস্যু সব মিলে বিমসটেকের ওপর একটা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে, যা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিমসটেকের ৪র্থ সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘সকল ক্ষেত্রে বিশ্ব পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে এর কার্যধারা। পারস্পরিক, আঞ্চলিক এবং বহুমুখী সহযোগিতার মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতি যাচাই করে আমাদের এই নতুন এবং অনাগত পরিস্থিতির সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।’
আঞ্চলিক অখ-তার মাধ্যমে বাংলাদেশের অতিকাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিমসটেক একটি প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্ম। আঞ্চলিক বিষয়ে অধিকতর ভূমিকা পালনের জন্য বাংলাদেশ বলতে গেলে সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে কাজ করে চলেছে। অন্যদিকে ভারত মহাসাগর, সাগরমালা, পূর্ব এবং প্রতিবেশীদের বিষয়টিকে অধিকতর প্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছে। বিমসটেকের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তার বৃহত্তর মেরিটাইম রূপকল্পের একটি অংশ। সুতরাং বিমসটেক যেন সফল হতে পারে সেটা ভারতেরই নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক: নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
এবং সমুদ্র সংক্রান্ত গবেষণা ও
উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান বিমরাডের মহাপরিচালক